একসময় মেয়েটিকে তার মোটাসোটা শরীরের জন্য ডাকা হতো ‘ব্লাবার’। স্কুলের অন্য মেয়েরা তাকে নিয়ে হাসাহাসি করত। কখনো তাকে আলমারির ভেতর আটকে রেখে বাইরে থেকে বলত— ব্লাবারস ব্লাবিং ইন দ্য কাপবোর্ড। বাড়ি ফিরে মেয়েটি কাঁদত। পরদিন স্কুলে যেতে ইচ্ছে করত না। কিন্তু একটা জেদ ছিল— সে অভিনেত্রী হবে। তার কথাই জানব আজকের টকিজে।
মেয়েটিকে আপনারা সবাই চেনেন। সেই টাইটানিকের ‘রোজ’। আজ তিনি পৃথিবীর অন্যতম পরিচিত মুখ। একসময় তাকেই বলা হয়েছিল— অভিনেত্রী হতে চাইলে হয়তো তাকে শুধু ‘মোটা মেয়ের’ চরিত্রই দেয়া হবে। যথেষ্ট সুন্দরী না হওয়ায় অডিশনে বারবার প্রত্যাখ্যান পেয়েছেন তিনি।
১৬ বছর বয়সে স্কুল ছাড়ার পর ট্রেনে করে অডিশনে যেতেন। অর্থের অভাব ছিল পরিবারের। বাবা অভিনেতা ছিলেন, কিন্তু সংসার চালাতে অভিনয়ের পাশাপাশি নানা কাজ করতে হয়েছে। কেটও একসময় ক্যাফেতে কাজ করেছেন, লন্ডনে অডিশনে যাওয়ার ট্রেনভাড়াটুকুও সব সময় সহজে জুটত না। তারপর একদিন, রেস্টুরেন্টে স্যান্ডউইচ বানানোর সময় ফোন বেজে উঠল। ওপাশ থেকে জানানো হলো, তিনি ‘হ্যাভেনলি ক্রিয়েচারস'-এ অভিনয়ের সুযোগ পেয়েছেন। স্যান্ডউইচ ফেলে বাসে করে বাড়ি ফিরে গিয়েছিলেন খবরটি পরিবারকে জানাতে। সেখান থেকে তার অভিনয় জীবনের শুরু।
তারপর এলো ‘টাইটানিক’। পৃথিবী তাকে চিনল রোজ হিসেবে। রাতারাতি তিনি হয়ে গেলেন আন্তর্জাতিক তারকা। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, পৃথিবী যখন তার সৌন্দর্যে বিমোহিত কেট তখনও নিজের শরীর নিয়ে নানা কটূক্তি থেকে মুক্তি পাননি। টাইটানিক তাকে খ্যাতি দিয়েছিল, কিন্তু সেই খ্যাতির সঙ্গে এসেছিল শরীর নিয়ে নির্মম নজরদারি। সংবাদপত্রে তার ওজন নিয়ে লেখা হয়েছে, চেহারা নিয়ে মন্তব্য করা হয়েছে, এমনকি ওজন কতটুকু ‘বেশি’ দেখাচ্ছে— তার হিসাবও ছাপা হয়েছে। অনেক বছর পরে পুরনো সেই প্রতিবেদনগুলো আবার পড়তে গিয়ে কেট নিজেই বিস্মিত হয়েছিলেন, কী ভয়াবহ নিষ্ঠুরতার মধ্য দিয়ে তাকে যেতে হয়েছিল।
একসময় যে মেয়েটিকে স্কুলে নিজের শরীরের জন্য অপমান সহ্য করতে হয়েছিল, এবার সেই একই শরীরকে নিয়ে মন্তব্য করছিল গোটা পৃথিবী। সিনেমাটি মুক্তির সময় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে তার জীবনে। তার সাবেক প্রেমিক ও অভিনেতা স্টিফেন ট্রেডর ক্যান্সারে মারা যান। কেট যুক্তরাষ্ট্রে টাইটানিক-এর প্রিমিয়ারে যাননি, ছিলেন প্রেমিকের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায়। পরে তিনি স্মরণ করেছেন, হলিউডের কেউ কেউ তখনো তাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন যে সিনেমার প্রিমিয়ারে থাকা উচিত। কিন্তু কেটের উত্তর ছিল সরল— স্টিফেনের শেষকৃত্যেই তার থাকা উচিত। পৃথিবী তখন টাইটানিকের রোজকে উদ্যাপন করছিল। কেট তখন শোক করছিলেন।
এর পর কেটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ছিল, তিনি রোজ হয়ে থাকতে চাননি। তিনি এমন চরিত্র বেছে নিতে শুরু করলেন, যেগুলো তাকে তথাকথিত সুন্দরী নায়িকা হিসেবে তুলে ধরবে না। এটারনাল সানশাইন অব দ্য স্পটলেস মাইন্ড, লিটল চিলড্রেন, দ্য রিডার— একেকটি চরিত্রে তিনি নিজেকে তারকাখ্যাতির আরাম থেকে দূরে সরে গেলেন। এ যেন নিজের বিরুদ্ধে নিজের এক নীরব বিদ্রোহ।
তবে এরই সঙ্গে লড়তে হচ্ছিল ব্যক্তিগত জীবনের নানা সমালোচনার সাথেও। ডিক্যাপ্রিওর সঙ্গে সিনেমার দৃশ্যগুলো দর্শকের কাছে এতই বাস্তব লেগেছিল যে, রোজ আর জ্যাকের বাস্তব জীবনের প্রেমের গুঞ্জন উঠেছে বারবার। কেট নিজেই একাধিকবার স্পষ্ট করেছেন, তাদের মধ্যে কোনো রোমান্টিক সম্পর্ক ছিল না। যে পৃথিবী তাকে সুন্দর হতে বলেছিল, তিনি অভিনয় দিয়ে তার উত্তর দিলেন। যে পৃথিবী তাকে শরীরের মাপে বিচার করেছিল, তিনি সেই শরীর নিয়েই পর্দায় এমন নারীদের তৈরি করলেন, যাদের সৌন্দর্য কোনো নির্দিষ্ট মাপে আটকে থাকে না। কেটের এই লড়াই শুধু শরীরের বিরুদ্ধে ছিল না। ছিল নিজের সম্পর্কে অন্যের লেখা গল্পের বিরুদ্ধেও।
আজ কেট উইন্সলেটের দিকে তাকালে তাই শুধু রোজকে দেখা যায় না। দেখা যায় একজন নারীকে, যিনি শেষ পর্যন্ত নিজেই নিজের সৌন্দর্যের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন।