নির্বাচনের কর্মযজ্ঞ রাজনীতি ও টানাপড়েন এসেছে সিনেমায়ও

আধুনিক রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইভেন্ট ‘ইলেকশন’ তথা জনপ্রতিনিধি নির্বাচন। জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে জনপ্রতিনিধি বাছাই করতে আয়োজিত হয় একাধিক নির্বাচন।

আধুনিক রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইভেন্ট ‘ইলেকশন’ তথা জনপ্রতিনিধি নির্বাচন। জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে জনপ্রতিনিধি বাছাই করতে আয়োজিত হয় একাধিক নির্বাচন। এক এক দেশে এক এক পদ্ধতিতে নির্বাচন হয়। এর মধ্যে গোপন ব্যালটে নির্বাচন সবচেয়ে জনপ্রিয় ও বেশির ভাগ স্থানে এভাবেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচন ঘিরে থাকে নানা কর্মযজ্ঞ, রাজনীতি, কৌশল ও টানাপড়েন। সেই বিষয়গুলো নানা সময় উঠে এসেছে সিনেমায়ও। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ রকম সিনেমা নির্মিত হয়েছে। তার কয়েকটি নিয়ে পাঠকের জন্য তুলে ধরা হচ্ছে।

দ্য মাঞ্চুরিয়ান ক্যান্ডিডেট (১৯৬২)

১৯৬২ সাল। কোল্ড ওয়ারের সবচেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ সময়ে মুক্তি পায় দ্য মাঞ্চুরিয়ান ক্যান্ডিডেট। লরেন্স হার্ভে এখানে এক সাবেক সৈনিকের ভূমিকায় অভিনয় করেন। তিনি কোরিয়ান যুদ্ধে বন্দি হওয়ার পর চীনা কমিউনিস্টদের দ্বারা মগজধোলাইয়ের শিকার হন এবং পরে রাজনীতিবিদে পরিণত হন। এরপর তিনি অজান্তেই পরিণত হন এক ‘স্লিপার এজেন্ট’-এ।

সিনেমাটি দক্ষতার সঙ্গে সেই সময়ের কোল্ড ওয়ারের আতঙ্ককে তুলে ধরেছিল (এবং ‘ব্রেনওয়াশিং’ বা মগজধোলাই শব্দটিকেও জনপ্রিয় করে তোলে)। কিউবান মিসাইল সংকটের মাঝামাঝি সময়ে এটি মুক্তি পাওয়ায় এর প্রভাব আরো বেড়ে যায়। সিনেমাটিতে রাজনীতি ও নির্বাচনের বিষয় উঠে এসেছে।

দি আইডস অব মার্চ (২০১১)

প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে নির্মিত এই সিনেমা। পরিচালনার পাশাপাশি অভিনয় করেছেন জর্জ ক্লুনি। এতে রায়ান গসলিং অভিনয় করেছেন স্টিফেন মেয়ার্স চরিত্রে। তিনি এক আদর্শবাদী তরুণ প্রেস সেক্রেটারি, যিনি পেনসিলভানিয়ার গভর্নর এবং ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী মাইক মরিসের (ক্লুনি) হয়ে কাজ করেন।

প্রচারণা এগোতে থাকলে মেয়ার্স বুঝতে পারেন যে যাকে তিনি প্রথমে শ্রদ্ধা করতেন, সেই প্রার্থীর অতীতে বেশকিছু গোপন কেলেঙ্কারি রয়েছে। শেষ পর্যন্ত তাকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়—তার নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ বেশি গুরুত্বপূর্ণ, নাকি তার নেতার। এসব নিয়েই সিনেমার গল্প এগোতে থাকে।

দি আমেরিকান প্রেসিডেন্ট (১৯৯৫)

নির্বাচন নিয়ে নির্মিত বেশির ভাগ চলচ্চিত্রেই প্রচারণার নাটকীয় দিকটি বেশি গুরুত্ব পায়। ১৯৯৫ সালে রব রেইনার পরিচালিত দি আমেরিকান প্রেসিডেন্টে সেই দিকটি থাকলেও এটি একই সঙ্গে একটি রোমান্টিক গল্পও। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে রাজনীতিবিদরাও নির্বাচনের সময় মানুষ হিসেবেই থাকেন।

মাইকেল ডগলাস অভিনয় করেছেন প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড্রু শেফার্ডের ভূমিকায়। পরিবেশবাদী কর্মী সিডনি ওয়েডের (অ্যানেট বেনিং) সঙ্গে পরিচয়ের পর তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। কিন্তু এ নতুন সম্পর্ক তার প্রতিদ্বন্দ্বী সিনেটর বব রামসনের (রিচার্ড ড্রেফাস) রাজনৈতিক আক্রমণের সুযোগ তৈরি করে দেয়। ব্যক্তিগত সুখের জন্য কি শেফার্ড তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ঝুঁকিতে ফেলবেন?

অল দ্য কিংস মেন (১৯৪৯)

যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পাশাপাশি ‘গভর্নর’ নির্বাচনও হয়। এগুলো হলো পৃথক অঙ্গরাজ্যের গভর্নর নির্বাচনের প্রক্রিয়া এবং সেগুলোও প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মতোই নাটক, চক্রান্ত ও উচ্চাকাঙ্ক্ষায় ভরপুর।

১৯৪৯ সালে নির্মিত অল দ্য কিংস মেন গভর্নর নির্বাচন নিয়ে তৈরি অন্যতম বিখ্যাত চলচ্চিত্র। এতে ব্রডেরিক ক্রফোর্ড অভিনয় করেছেন উচ্চাকাঙ্ক্ষী রাজনীতিবিদ উইলি স্টার্কের চরিত্রে, যার গল্পটি আংশিকভাবে লুইজিয়ানার বাস্তব রাজনীতিবিদ হিউই লংয়ের জীবন থেকে অনুপ্রাণিত।

কেবল এই সিনেমাগুলোই নয়, ‘দ্য বেস্ট ম্যান’ (১৯৬৪), ‘দ্য ক্যান্ডিডেট’ (১৯৭২), ‘অল দ্য প্রেসিডেন্টস ম্যান’ (১৯৭৬) ও ‘ইলেকশন’ (১৯৯৯)-এর মতো সিনেমাগুলোও উল্লেখযোগ্য।

ভারতের অনেক সিনেমায় নির্বাচনের বিষয়টি এসেছে। বহু সিনেমায় রাজনৈতিক নেতাদের দেখা যায় এবং তারা নির্বাচনের রাজনীতি নিয়ে কথা বলেন। এর মধ্যে কয়েকটি সিনেমার নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায়।

রাজনীতি (২০১০)

প্রকাশ ঝার পরিচালনায় ২০১০ সালে মুক্তি পায় সিনেমাটি। এতে অভিনয় করেন নাসিরউদ্দিন শাহ, নানা পাটেকর, মনোজ বাজপেয়ী, অজয় দেবগন, অর্জুন রামপাল, রণবীর কাপুর, ক্যাটরিনা কাইফ প্রমুখ। সিনেমাটি একদিকে মহাভারতের ‘এক পরিবারের দুই ভাগ’ ও অন্যদিকে ‘দ্য গডফাদার’কে (রাজনীতির গতিপথ) অনুসরণ করে। সিনেমাটির শুরু থেকে শেষ অবধি একটি বৃহৎ পরিবারের রাজনীতির গল্প বলা হয়েছে। সেখানে থাকে প্রতিপক্ষকে হেয়প্রতিপন্ন ও পরাজিত করার কৌশল। কেউ সরাসরি রাজনীতি করেন তো কেউ আড়াল থেকে আঘাত। ভারতীয় রাজনীতির কুটিলতা ও পরিবারতন্ত্র সবই সিনেমায় উঠে এসেছে। সেই সঙ্গে আছে নির্বাচনী কৌশল, প্রচার, ভোট ইত্যাদিও।

লুসিফার (২০১৯)

অভিনেতা পৃথ্বীরাজ সুকুমার পরিচালিত সিনেমা লুসিফার। এই সিনেমাটিও একটি পরিবারের রাজনীতির উত্থান-পতনের গল্প বলে। কেরালার মুখ্যমন্ত্রী পিকে রামদাসের মৃত্যুর পর তার পরিবারের মধ্যে চলমান টানাপড়েন এবং কেরালার রাজনীতি নিয়ে এ সিনেমা। তবে স্থানীয় রাজনীতির পাশাপাশি এখানে উঠে এসেছে। আন্তর্জাতিক গুপ্ত মহলের প্রভাবের ইঙ্গিত। মোহনলাল অভিনীত স্টিফেন চরিত্রটি তা-ই ইঙ্গিত করে। পিকে রামদাসের পালিত পুত্র হলেও স্টিফেন কার জন্য কাজ করে বা তার ক্ষমতার উৎস প্রকাশ করা হয় না। তবে তার কাজকর্ম ও আন্তর্জাতিক যোগসূত্র বুঝিয়ে দেয় যে ইলুমিনাতি বা আন্তর্জাতিক কোনো শক্তিশালী গোষ্ঠীর সঙ্গে সে যুক্ত। এ কারণেই সিনেমার নাম লুসিফার। নির্বাচন মানে কেবল ব্যালট ও ভোটদান নয়। এর নেপথ্যে থাকে প্রচারণা, প্রার্থীর সুনাম-বদনাম, যা চাইলে ইচ্ছানুসারে পরিবর্তন করা যায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় নানা গোষ্ঠী, গণমাধ্যম এমনকি রাজনৈতিক নেতাদের পরিবারও। লুসিফার এসব গল্পই বলে।

নিউটন (২০১৭)

নির্বাচন বলতে যদি ভোট, ব্যালটের বিষয়কেই বোঝা হয়, তাহলে সেই বিষয়টি স্পষ্ট করে তুলেছে বলিউডের সিনেমা ‘নিউটন’। ২০১৭ সালে মুক্তি পায় অমিত মসুরকার পরিচালিত ‘নিউটন’। সিনেমায় অভিনয় করেন রাজকুমার রাও। তিনি একটি ভোট কেন্দ্রে প্রিজাইডিং অফিসারের দায়িত্ব নিয়ে যান দুর্গম এক এলাকায়। সিনেমার গল্পে দেখা যায় নিউটন কুমার এক আদর্শবাদী তরুণ। নিয়মকানুনে কঠোরভাবে বিশ্বাসী এক তরুণ সরকারি কর্মকর্তা। রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করা তার জন্য পেশাগত দায়িত্বের পাশাপাশি আদর্শিকও। তাকে যেতে হয় ভারতের দুর্গম অঞ্চলে এক ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর কাছে। এরপর সিনেমা আমাদের দেখায় যে আদর্শ ও বাস্তবতার মধ্যে ফারাক অনেক বেশি। এই সবকিছুর মধ্য দিয়েই স্যাটায়ারের মাধ্যমে উঠে এসেছে ভারতের নির্বাচনের প্রকৃত অবস্থা।

আরো অনেক বলিউড সিনেমার নাম করা যায়, যাতে নির্বাচনের প্রসঙ্গ এসেছে। এর মধ্যে সুভাষ কাপুরের ‘ম্যাডাম প্রাইম মিনিস্টার’ ও ‘থালাইভি’কে এগিয়ে রাখতে হবে। থালাইভি নির্মিত হয়েছে জয়াললিতার জীবন ও রাজনৈতিক ক্যারিয়ারকে উপজীব্য করে। এছাড়া অ্যামাজন প্রাইমের সিরিজ ‘তাণ্ডব’ও সরাসরি নির্বাচনের রাজনীতিকে কেন্দ্র করে নির্মিত।

বাংলাদেশেও নির্বাচনকেন্দ্রিক সিনেমা নির্মিত হয়েছে। খুব বড় পরিসরে না হলেও সিনেমাগুলো নির্বাচনকে উদ্দেশ্য ও ইঙ্গিত করে। এর মধ্যে ১৯৯৬ সালের ‘বিশ্বনেত্রী’ ও ২০১৭ সালে মুক্তি পাওয়া ‘রাজনীতি’ উল্লেখযোগ্য।

বিশ্বনেত্রী (১৯৯৬)

বাদল খন্দকার পরিচালনা করেছেন ‘বিশ্বনেত্রী- লিডার অব ইউনিভার্স’। সিনেমায় দেখা যায়, এমন এক ব্যক্তি এমপি পদপ্রার্থী, মুক্তিযুদ্ধে তার ভূমিকা ছিল দেশবিরোধী। কিন্তু কলেজের প্রিন্সিপাল, পুলিশ তাকে সমর্থন দেয়। সেখানেই তার বিরুদ্ধে উঠে আসে এক নারীর সংগ্রাম। এই সবের মধ্য দিয়ে নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনীতি ও নির্বাচনের নানা বিষয় উঠে আসে সিনেমায়। অভিনয় করেছেন শাবানা, জসিম, হুমায়ুন ফরীদি, আমিন খান, শাহনাজ, দিলদার, কাবিলা ও নাদের চৌধুরী।

রাজনীতি (২০১৭)

বাংলাদেশের সিনেমা মানে তাতে প্রেম থাকবে। শাকিব খান ও অপু বিশ্বাস অভিনীত ‘রাজনীতি’ তার ব্যতিক্রম নয়। তবে বুলবুল বিশ্বাসের অভিষেক সিনেমা ‘রাজনীতি’ দেখায় নির্বাচন নিয়ে বাংলাদেশের একসময়ের প্রকৃত পরিবেশ কেমন ছিল। ২০১৭ সালে মুক্তি পাওয়া এ সিনেমায় দলীয় সরকার, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও নির্বাচনের বিষয় উঠে এসেছে।

৮৪০ (২০২৪)

মোস্তফা সরয়ার ফারুকী পরিচালিত ৮৪০। এতে সরাসরি এবং ইঙ্গিতে এসেছে নির্বাচনের প্রসঙ্গ। সিনেমায় দেখা যায়, একজন নেতা কী কী উপায়ে নির্বাচনের জন্য তার রাজনীতি প্রস্তুত করেন। আপাতদৃষ্টিতে বিষয়গুলো ছোট বা মূল ঘটনার সঙ্গে যুক্ত মনে না হলেও এমন ছোট ছোট বিষয়ই তার নির্বাচনী রাজনীতির অংশ এবং এগুলোই তাকে ভোটে এগিয়ে রাখতে সাহায্য করে।

আরও