ইতালিতে বাঁধনের ওপর হামলায় ক্ষুব্ধ দেশের শিল্পীরা

৭ সেপ্টেম্বর রাতে স্থানীয় একটি পার্কে ভাই ও তার পরিবারের সঙ্গে ঘুরতে গেলে একদল বাঙালি তার ওপর চড়াও হয় বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।

ইতালির মেস্ত্রে শহরে গত সোমবার রাতে আক্রমণ ও হেনস্তার শিকার হয়েছেন অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধন। ৭ সেপ্টেম্বর রাতে স্থানীয় একটি পার্কে ভাই ও তার পরিবারের সঙ্গে ঘুরতে গেলে একদল বাঙালি তার ওপর চড়াও হয় বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। তার দিকে পানি, কোমল পানীয় ও ডিম ছুড়ে মারার পাশাপাশি শারীরিকভাবেও লাঞ্ছিত করা হয়েছে বলে জানান বাঁধন। ঘটনার পর স্থানীয় থানায় লিখিত অভিযোগও করেছেন এ অভিনেত্রী।

বাঁধনের অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখার কারণেই পরিকল্পিতভাবে তাকে লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়েছে। জোর করে জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু বলানোর চেষ্টা করা হয় বলেও অভিযোগ করেন বাঁধন। পুরো ঘটনা ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচার ও প্রকাশেরও চেষ্টা চালান হামলাকারীরা।

৮৩তম ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে রুবাইয়াত হোসেন পরিচালিত ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ সিনেমার প্রদর্শনীতে অংশ নিতে ইতালি গিয়েছিলেন বাঁধন। বর্তমানে মেস্ত্রে শহরে অবস্থান করছেন তিনি।

ঘটনার পর পরই ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে লাইভে এসে পুরো বিষয়টি জানান বাঁধন। ফেসবুক লাইভে বাঁধন বলেন, ‘এখানে আমি আমার ভাইয়ের পরিবারের সঙ্গে পার্কে গিয়েছিলাম। সেখানে আমাদের অনেক বাঙালি ভাই এসে আমাকে ফিজিক্যালি হ্যারাস করেছে। আমার শরীরে পানি, কোক ছুড়ে মেরেছে। এতে আমি একদম ভিজে যাই।’

তিনি বলেন, ‘তারা আমার শরীরে হাত তুলেছে, আমার ফোন ফেলে দিয়েছে। আমার কানের পাশে আঘাত করেছে। তারা বলেছে, আমি জুলাই যোদ্ধা। ইয়েস, আই অ্যাম। আমি অবশ্যই জুলাইয়ের আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছি। একজন আজমেরী হক বাঁধনকে দমানো এত সহজ হবে না। আপনারা আজ সারা বিশ্বের মানুষকে দেখালেন, বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বকারী একজন অভিনেত্রীকে হেনস্তা করা হলো।’

এদিকে বাঁধনের ওপর হামলার ঘটনায় দেশের বিনোদন অঙ্গনের শিল্পীরা তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।

ঘটনার নিন্দা জানিয়ে অভিনেতা মামুনুর রশীদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শিল্পী কিংবা সাধারণ মানুষ—পাবলিক প্লেসে কারো ওপর এমন অতর্কিত হামলা করা অত্যন্ত অন্যায় ও অপরাধমূলক কাজ। কারো বিরুদ্ধে ক্ষোভ বা ভিন্নমত থাকলে তা প্রকাশের অনেক মাধ্যম রয়েছে। আলোচনা করা যেতে পারে, কথা বলা যেতে পারে। কিন্তু তা না করে গায়ে হাত তোলা বা হামলা চালানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। শিল্পীদের ক্ষেত্রে তো বটেই।’

বাঁধনের ওপর এমন ন্যক্কারজনক হামলার প্রতিবাদ জানিয়েছেন নির্মাতা অমিতাভ রেজা। বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তির জন্য ঘটনাটিকে উদ্বেগজনক উল্লেখ করে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এ ধরনের আচরণ অত্যন্ত জঘন্য ও চরম নিন্দনীয়। যেকোনো মানুষের ওপর এমন হামলা বা বাজে আচরণ করা সম্পূর্ণ অনুচিত। এর পেছনে কোনো যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা বা অজুহাত থাকতে পারে না। বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হওয়ার জন্য এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এ অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা যেকোনো রাষ্ট্রের জন্যই একটি নেতিবাচক বার্তা দেয়। বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে ইতালিতে বাংলাদেশের দূতাবাসের দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া উচিত।’

সহকর্মী হিসেবে বাঁধনের পাশে দাঁড়িয়ে ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করেছেন চলচ্চিত্র সমালোচক সাদিয়া খালিদ রিতি। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাঁধন আপুর ওপর যে হামলা হয়েছে, তা অবশ্যই খুবই নিন্দনীয়। দেশের মাটিতেও তারা আমাদের নিরাপদে থাকতে দেয় না, আবার দেশের বাইরে গেলেও হামলা করছে—বিষয়টি আসলে খুবই চিন্তার। আশা করি, এ ঘটনা নিয়ে যথাযথ তদন্ত করা হবে। কারণ হামলাকারীদের ভিডিও বাঁধন আপু রেকর্ড করে রেখেছেন এবং সেখানে তাদের চেহারা খুব পরিষ্কারভাবেই দেখা যাচ্ছে।’ এ জঘন্য ঘটনার একটি সুষ্ঠু বিচার ও সুরাহা হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।

হামলাকারীদের মানসিকতা কাপুরুষোচিত ও অত্যন্ত নিচু মানসিকতার মনে করছেন নির্মাতা আশফাক নিপুন। ভেনিসে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক প্রতিনিধিত্বের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘‌এটি অত্যন্ত নিচু মানসিকতার ও কাপুরুষোচিত একটি কাজ। বিশ্বের অন্যতম সম্মানজনক ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের কোনো চলচ্চিত্র অফিশিয়ালি মনোনীত হয়েছে। যেখানে দেশের একজন শিল্পী আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করছেন, সেখানে তার ওপর এ হামলা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না।’

ব্যক্তি প্রতিক্রিয়ার বাইরে গিয়ে গোটা ঘটনাকে বৃহত্তর সামাজিক প্রবণতার সঙ্গে যুক্ত করেছেন চলচ্চিত্র বিশ্লেষক বিধান রিবেরু। মব কালচার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘রাজনীতি বা মতাদর্শিক ভিন্নতার কারণে কারো ওপর হামলা চালানোকে কখনই সমর্থন করি না। এ মব কালচার বা দঙ্গল সংস্কৃতি অত্যন্ত বিপজ্জনক। পরিচয়হীন একদল মানুষ যখন সমাজে প্রতিষ্ঠিত ও অবদান রাখা ব্যক্তিদের ওপর চড়াও হয়, লাঞ্ছিত করে এবং অপদস্থ করার চেষ্টা করে, তা কোনো সুস্থ সমাজের লক্ষণ হতে পারে না।’

আরও