অস্কারজয়ী ‘ওপেনহাইমার’-এর পর আগামী মাসে নতুন ছবি ‘দ্য ওডিসি’ নিয়ে বড়পর্দায় ফিরছেন পরিচালক ক্রিস্টোফার নোলান। এটি চলতি বছরের সবচেয়ে প্রতীক্ষিত চলচ্চিত্রগুলোর একটি। তবে মুক্তির আগেই এটি বছরের সবচেয়ে বিতর্কিত ছবিতেও পরিণত হয়েছে। প্রাচীন গ্রিক কবি হোমারের মহাকাব্য অবলম্বনে নির্মিত এ চলচ্চিত্রকে ঘিরে কাস্টিং, ঐতিহাসিক নির্ভুলতা, ভাষা ও রাজনৈতিক বিতর্ক—সব মিলিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুমুল আলোচনা চলছে।
কাস্টিং নিয়ে তর্ক
রক্ষণশীলদের একাংশের অভিযোগ, নোলান ছবিটিকে অতিরিক্ত ‘উদারপন্থী’ করে তুলেছেন। তারা ট্রান্সজেন্ডার অভিনেতা এলিয়ট পেজ ও র্যাপার ট্রাভিস স্কটকে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে নেয়ার সমালোচনা করেছেন।
সবচেয়ে বেশি বিতর্ক হয়েছে কেনীয় বংশোদ্ভূত কৃষ্ণাঙ্গ অভিনেত্রী লুপিটা নিয়ংও-কে ট্রয়ের হেলেন চরিত্রে নেয়া প্রসঙ্গে। হেলেনকে ‘সাদা বাহুবিশিষ্ট’ বলে বর্ণনা করেছিলেন হোমার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে দাবি করেন, ২০০৪ সালের ‘ট্রয়’ ছবিতে ডায়ান ক্রুগারের কাস্টিং এ দিক থেকে বেশি উপযুক্ত ছিল।
ডানপন্থী ভাষ্যকার ম্যাট ওয়ালশ অভিযোগ করেন, বর্ণবাদের অভিযোগ এড়াতেই নোলান নিয়ংও-কে নিয়েছেন, যদিও এ দাবির পক্ষে তিনি কোনো প্রমাণ দেননি। টেসলা ও এক্সের প্রধান ইলন মাস্কও তার সঙ্গে একমত হন। এর জবাবে অনেকে ওয়ালশ ও মাস্ককে পক্ষপাতদুষ্ট বলে সমালোচনা করেন।
অন্যদিকে, হোমারের ‘দ্য ওডিসি’–এর সাম্প্রতিক অনুবাদক অধ্যাপক ড্যানিয়েল মেন্ডেলসোন বলেন, হেলেনের চরিত্রটি এই কাহিনিতে খুবই ছোট, তাই এ বিতর্ক ‘বিশেষভাবে হাস্যকর’। তবে তার মতে, নিয়ংও-র মতো সুন্দরী আফ্রিকান অভিনেত্রীকে নেয়া সৌন্দর্যের ধারণা নিয়ে প্রাচীন বিতর্ককেই নতুনভাবে সামনে আনে।
লুপিটা নিয়ংও বলেন, ‘এটি পৌরাণিক কাহিনি। আমাদের অভিনেতাদল পুরো বিশ্বের প্রতিনিধিত্ব করে।’
তবে সমালোচনা শুধু রক্ষণশীলদের কাছ থেকেই আসেনি। গ্রিক-ব্রিটিশ সাংবাদিক ক্রিস কটোনু লিখেছেন, হলিউড আবারো গ্রিকদের তাদের পুরাণভিত্তিক গল্প থেকে কার্যত বাদ দিয়েছে। তার প্রশ্ন, যদি বিশ্বকে প্রতিনিধিত্বই করতে হয়, তবে গ্রিক অভিনেতাদের জন্যও জায়গা থাকা উচিত ছিল।
ছবি: ইউনিভার্সেল পিকচার্স
ঐতিহাসিক নির্ভুলতা বনাম পৌরাণিক কল্পনা
প্রথম ট্রেলার প্রকাশের পর অনেকে অভিযোগ করেন, আগামেমননের কালো বর্ম দেখতে ব্যাটম্যানের পোশাকের মতো, আর ওডিসিউসের জাহাজ ‘ভাইকিং জাহাজ’-এর মতো লাগছে।
কিন্তু ‘দ্য গ্রিক গডস অ্যান্ড দেয়ার ওয়ার্ল্ডস’–এর লেখক অধ্যাপক সুসান ডেসি বলেন, মানুষ এখন পৌরাণিক কাহিনিকেও যেন ইতিহাসের মতো বিচার করছে। অথচ ‘দ্য ওডিসি’ যুগে যুগে নতুনভাবে কল্পনা ও ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
অনেক দর্শক দ্য ওডিসিকে এমনভাবে বিচার করছেন, যেন এটি একটি ঐতিহাসিক দলিল। কিন্তু বাস্তবে এটি একটি পৌরাণিক মহাকাব্য, যার বিভিন্ন যুগে বিভিন্নভাবে পুনর্কল্পনা করা হয়েছে।
বর্তমানে অনেকে প্রশ্ন তুলছেন—ওডিসিউসের জাহাজ দেখতে ঠিক কেমন ছিল, আগামেমননের বর্ম ঐতিহাসিকভাবে সঠিক কিনা, বা অভিনেতাদের চেহারা ও পোশাক কতটা বাস্তবসম্মত। কিন্তু এসব সমালোচনা এমন একটি কাহিনিকে কেন্দ্র করে করা হচ্ছে, যেখানে একচোখা দৈত্য (সাইক্লোপস), সমুদ্রদেবতা, জাদুকরী, সাইরেন ওদেবতাদের হস্তক্ষেপের মতো অলৌকিক উপাদান রয়েছে। তাই এটিকে পুরোপুরি ঐতিহাসিক নির্ভুলতার মানদণ্ডে বিচার করা যৌক্তিক নয়।
ডেসির মতে, দ্য ওডিসি কখনোই একটিমাত্র নির্দিষ্ট রূপে সীমাবদ্ধ ছিল না। প্রায় প্রতিটি যুগই নিজেদের সংস্কৃতি, দৃষ্টিভঙ্গি ও শিল্পরুচি অনুযায়ী হোমারের এই কাহিনিকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করেছে। ফলে ক্রিস্টোফার নোলানের সংস্করণও সেই দীর্ঘ ঐতিহ্যেরই অংশ। অর্থাৎ, এটি মূল কাহিনির আরেকটি সৃজনশীল পুনর্ব্যাখ্যা, কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক পুনর্নির্মাণ নয়।
এ কারণেই ডেসির মতে, পৌরাণিক কাহিনিকে ইতিহাসের মতো শতভাগ বাস্তব ও নির্ভুল হওয়ার দাবি করা ঠিক নয়; বরং এগুলোর শক্তি হলো, প্রতিটি প্রজন্ম এগুলোকে নিজেদের সময় ও দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে নতুনভাবে উপস্থাপন করতে পারে।
উচ্চারণ ও সংলাপ নিয়েও বিতর্ক
আরেকটি বিতর্কের বিষয় ছিল অভিনেতাদের উচ্চারণ। ট্রেলারে ব্রিটিশ অভিনেতারাও আমেরিকান উচ্চারণে কথা বলেছেন। টম হল্যান্ডের ‘মাই ড্যাডি ইজ কামিং হোম’ সংলাপ শুনে কেউ কেউ মন্তব্য করেন, এটি যেন ‘স্টারবাকসের সামনে দাঁড়িয়ে মহাকাব্যিক আলাপ করার চেষ্টা’।
তবে ডেসির মতে, ব্রিটিশ উচ্চারণ ব্যবহার করলেও তা প্রাচীন গ্রিক ভাষার কাছাকাছি হতো না। বরং ‘দ্য ওডিসি’ যেহেতু মৌখিকভাবে পরিবেশিত জনপ্রিয় কাহিনি ছিল, তাই তুলনামূলক কথ্য ভাষা তার চেতনার সঙ্গেই বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে।
সুসান ডেসির ভাষ্য থেকে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ওঠে আসে। প্রথমত, প্রাচীন গ্রিকরা ইংরেজিতে কথা বলতেন না। তাই অভিনেতারা ব্রিটিশ উচ্চারণে কথা বলুন বা আমেরিকান উচ্চারণে—কোনোটিই প্রাচীন গ্রিক ভাষার কাছাকাছি নয়। হলিউডে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রচলিত রীতি রয়েছে যে, প্রাচীন গ্রিস, রোম, মধ্যযুগ বা শেক্সপিয়রীয় গল্পের চরিত্রদের ব্রিটিশ উচ্চারণে কথা বলতে শোনালে তা দর্শকের কাছে বেশি ‘রাজকীয়’ বা ‘ঐতিহাসিক’ মনে হয়। কিন্তু এটি কেবল একটি সিনেমাটিক ঐতিহ্য, ইতিহাসভিত্তিক সত্য নয়।
দ্বিতীয়ত, দ্য ওডিসিকে আমরা আজ যেভাবে একটি ‘ক্লাসিক সাহিত্য’ হিসেবে দেখি, শুরুতে তা সে রকম ছিল না। এটি ছিল মৌখিকভাবে পরিবেশিত জনপ্রিয় কাহিনি। কবি বা গায়ক জনসমাগমে বসে মানুষের বিনোদনের জন্য এই গল্প আবৃত্তি বা গেয়ে শোনাতেন। ফলে এর ভাষা এমন হওয়া স্বাভাবিক ছিল, যা সাধারণ মানুষ সহজে বুঝতে পারে এবং শুনে উপভোগ করতে পারে।
এ কারণেই ডেসির যুক্তি হলো, আধুনিক দর্শকের কাছে স্বাভাবিক ও কথ্য শোনায়—এমন সংলাপ ব্যবহার করলে তা দ্য ওডিসির মূল চেতনার সঙ্গেই বরং বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে। কারণ হোমারের কাহিনি ছিল জীবন্ত, শ্রুতিনির্ভর ও সাধারণ মানুষের জন্য নির্মিত; পরে এটিকে অতিরিক্ত আনুষ্ঠানিক ও গম্ভীর ভাষার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
কেন এত সমালোচনার লক্ষ্য?
বিশ্লেষকদের মতে, নোলানের প্রতিটি চলচ্চিত্রই বড় সাংস্কৃতিক ঘটনা। তাই তার কাজ নিয়ে সমালোচনা করলে তা সহজেই আলোচনার কেন্দ্রে আসে। তাছাড়া বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যকর্মকে অবলম্বন করে নির্মিত হওয়ায় প্রায় সবারই এ নিয়ে মতামত দেয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
২০১৭ সালে ‘দ্য ওডিসি’–এর নতুন অনুবাদ প্রকাশের পর অনুবাদক এমিলি উইলসনও আধুনিক ভাষা ব্যবহারের কারণে নারীবিদ্বেষী ট্রলের শিকার হয়েছিলেন। তার মতে, অনেক সমালোচকের আসলে কবিতাটির প্রতি আগ্রহ নেই; তারা সংস্কৃতি-যুদ্ধের অংশ হিসেবেই ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
নোলান–বিশেষজ্ঞ লেখক টম শোনের মতে, নোলানের চলচ্চিত্র এমন যে, একই ছবিতে বাম ও ডান—উভয় রাজনৈতিক পক্ষই নিজেদের মতের সমর্থন খুঁজে পায়। ‘ব্যাটম্যান’ ট্রিলজির নানা প্রতীক ডানপন্থীরা নিজেদের মতো ব্যবহার করেছে। তাই ‘দ্য ওডিসি’ তুলনামূলক প্রগতিশীল মনে হওয়ায় রক্ষণশীলদের একাংশ বেশি হতাশ হয়েছে।
তার মতে, নোলান কখনো প্রচলিত নিয়ম মেনে ছবি বানান না। আর হোমারের মহাকাব্যকে নিজের স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গিতে উপস্থাপন করাই অনেকের কাছে ‘অপবিত্র’ বলে মনে হচ্ছে।
তবে সমালোচকরাই শেষ পর্যন্ত ছবির সবচেয়ে বড় প্রচারক হয়ে উঠতে পারেন। বিশাল পরিসর, জটিল কাহিনি, সাহিত্যিক মর্যাদা এবং নোলানের স্বতন্ত্র নির্মাণশৈলী—এই সব কারণেই ‘দ্য ওডিসি’ নিয়ে যেমন বিতর্ক হচ্ছে, তেমনি দর্শকদের আগ্রহও বাড়ছে।
আগামী ১৭ জুলাই বিশ্বব্যাপী মুক্তি পাবে ‘দ্য ওডিসি’। এতে অভিনয় করেছেন ম্যাট ডেমন, টম হল্যান্ড, জেনডায়া, অ্যান হ্যাথাওয়ে, লুপিটা নিয়ংও, শার্লিজ থেরন, রবার্ট প্যাটিনসন, বেনি সাফদি, জন লেগুইজামো, এলিয়ট পেজ, ট্রাভিস স্কট, মিয়া গথ, কসমো জার্ভিস, হিমেশ প্যাটেল, সামান্থা মর্টন, উইল ইউন লি, জেসি গার্সিয়া, কোরি হকিন্স ও নিক ই তারাবে।
বিবিসি অবলম্বনে