এসবের উত্তর খুঁজতে গিয়ে উঠে আসে জ্ঞান বা সত্যের অনুসন্ধান নিয়ে তাওবাদী দর্শনের একেবারে গোড়ার সতর্কবার্তা—The Tao that can be spoken is not the eternal Tao. The name that can be named is not the eternal name…
অর্থাৎ জগতের কোনো পথই ধ্রুব নয়, কোনো নামই (সংজ্ঞা) ধ্রুব নয়। শুধু ভাষা বা সংজ্ঞা দিয়ে কোনো কিছুর পূর্ণ ব্যাখ্যা দেয়া যায় না। এখানেই মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় দর্শন, সম্ভাবনার গণিত ও ব্যক্তির অস্তিত্বের প্রশ্ন।
সম্ভবত এটিই বেলজিয়ান পরিচালক জ্যাকো ভ্যান ডরমেলের মাস্টারপিস মি. নোবডির সবচেয়ে সরলতম ব্যাখ্যা।
হালকা চালে পপকর্ন খেতে খেতে দেখার মতো কোনো সিনেমা এটি নয়। সিনেমাজুড়ে গণিত-পদার্থবিদ্যার নানা সূত্রের প্রয়োগ আর গভীরতম সব দার্শনিক প্রশ্নের ছড়াছড়ি। আবার বিষয়বস্তুও একেবারে অবোধ্য কিছু নয়। প্রতিটি মানুষের জীবনের একেবারে সরলতম দার্শনিক প্রশ্নগুলোকেই তুলে আনা হয়েছে সিনেমায়। কোনো এক ‘আমি কেউ না’ (Mr. Nobody), নিমোর (লাতিন ভাষায় নিমো শব্দের অর্থও নোবডিই দাঁড়ায়) সম্ভাব্য কয়েকটি জীবনের সমান্তরালে চলা অথবা সমান্তরাল কয়েকটি জীবনের সম্ভাবনার গল্প দিয়ে এ সিনেমা। সহজ কথায়, সিনেমাটি দর্শককে ভাবাবে। ভাবতে বাধ্য করবে।
গল্পের শুরুই হয় মানুষসহ পৃথিবীর তাবৎ প্রাণিকূলের মধ্যে ‘পিজিয়ন সুপারস্টিশন’ ধারণার উৎপত্তি ও এ-সংক্রান্ত এক মনোবিদের বর্ণনা দিয়ে। যেখানে জীবনের ছোট-বড় যেকোনো প্রাপ্তি মনে প্রশ্ন তোলে, ‘What did I Do to Deserve This?’ যেখানে আদতে কোনো সম্পর্ক না থাকলেও কার্যকারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে প্রাপ্তির সঙ্গে জুড়ে দেয়া হয় অপ্রাসঙ্গিক বিষয়গুলোকে। অনেকটা ফুটবল খেলার সেসব ভক্ত দর্শকের মতো, যারা প্রিয় দলের জয়-পরাজয়ের সঙ্গে নিজের খেলা দেখার প্রভাবকে জুড়ে দেয়। অনেকটা ‘মনে হয় আমি খেলা দেখলেই দল হারে।’ যদিও সেই দর্শকের খেলা দেখাটা সুদূর স্টেডিয়ামে খেলতে থাকা দলের হারার কোনো কারণ নয়। বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অন্য অনেক বিষয়, অনেক বাস্তব সম্ভাবনার অংক। পরাবাস্তবতার কোনো জায়গা নেই এখানে। গোটা সিনেমায় নিমো নোবডির এক্সপ্রেশনে এই একটা প্রশ্নই বারবার নিঃশব্দে ফুটে উঠতে দেখা গেছে, ‘হোয়াট ডিড আই ডু টু ডিজার্ভ দিস?’ এ অনুসন্ধানই সিনেমাটিকে নিছক এক সায়েন্স ফিকশনের গণ্ডিতে আটকে রাখেনি। সিনেমাটি হয়ে উঠেছে মানুষের অস্তিত্ব ও সিদ্ধান্তের দর্শন নিয়ে গভীর এক বৌদ্ধিক অনুসন্ধান।
নিমো নোবডির জীবনালেখ্যের বর্ণনা শুরু হয় ২০৯২ সাল থেকে। যেখানে বছরের পর বছর কোমায় থেকে অবশেষে চৈতন্যে ফিরে আসে শেষ মরণশীল মানুষ নিমো নোবডি। সেল রিনিউয়াল প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে মানবজাতি অমরত্ব অর্জন করে ফেলেছে। কিন্তু হারিয়ে ফেলেছে তার প্রেম আর যৌন তাড়নার অনুভূতি। নিমো নোবডিকে নিয়ে তাই জনপরিসরে আগ্রহের শেষ নেই। সাংবাদিকেরা চায় নিমোর একটি সাক্ষাৎকার। যদিও সুযোগ নেই। কারণ সম্প্রচার স্বত্ব। এর মধ্যেই এক তরুণ সাংবাদিক লুকিয়ে ক্যামেরা নিয়ে চলে আসে নিমোর কাছে। জানতে চায় পুরনো জীবনের কথা।
মৃত্যুশয্যায় বসে নিজের অতীত বর্ণনা করতে থাকে নিমো নোবডি। কিন্তু সমস্যা হলো, তার কোনো একক অতীত নেই। সে একই সঙ্গে বহু জীবন বেঁচেছে। কোনো জীবনে নিমো অ্যানার স্বামী, কোথাও তার স্ত্রী এলিস, কখনো তার স্ত্রীর নাম জিন। আবার এর মধ্যেও কারো কারো সঙ্গে রয়েছে তার একাধিক জীবনের গল্প। প্রতিটিই একটি থেকে আলাদা কিন্তু সমান্তরাল। প্রতিটিরই ঘটনাপ্রবাহ ও পরিণতি সম্পূর্ণ ভিন্ন স্বতন্ত্র। ভাবুক দর্শক ধীরে ধীরে ধরতে পারবেন, সিনেমাটি আসলে কোনো একক ঘটনা নয়, বরং বহু সম্ভাব্য ঘটনার সম্ভাবনাকেন্দ্রিক। অর্থাৎ ‘কী ঘটেছে বা ঘটছে’ নয়, বরং ‘কী কী ঘটতে পারত’—এ প্রশ্নকে ঘিরে আবর্তিত।
সে বর্ণনায় উঠে আসে শিশু নিমোর জন্মের আগে এক পরাবাস্তব জগতে বসবাসের গল্পও। যেখানে বসবাসকারী শিশুরা জানে তাদের জন্মের পর ভবিষ্যতে কখন কী ঘটবে। জন্মের আগে ঠোঁটে আঙুল দিয়ে কোনো এক অ্যাঞ্জেল তাকে সেসব ভুলিয়ে দেয়। কিন্তু নিমোর ক্ষেত্রে অ্যাঞ্জেল তা ভুলে যায়। ফলে নিমো তার অসীম সম্ভাবনার স্মৃতি ধরে রাখে। সে জানে তার কো সিদ্ধান্তের প্রভাব ভবিষ্যতে তাকে কোথায় ঠেলে দেবে। এ জ্ঞানই তাকে ঠেলে দেয় এক গভীর অস্তিত্বসংকটে।
মি. নোবডি আসলে সেলুলয়েডে উপস্থাপিত পদার্থবিদ্যার মেনি-ওয়ার্ল্ডস ইন্টারপ্রেটেশন, বিশৃঙ্খলার তত্ত্ব (ক্যাওস থিওরি) ও সম্ভাবনার গণিত দিয়ে প্রভাবিত এক গল্প। কোয়ান্টাম স্তরে কোনো ঘটনার একাধিক সম্ভাব্য ফলাফল থাকলে বাস্তবতা একটিকে বেছে নেয় না; বরং বহু শাখায় বিভক্ত হয়ে সব সম্ভাবনাকে বাস্তব করে তোলে। ফলে শৈশবে নেয়া নেমোর প্রতিটি সিদ্ধান্ত—সে মায়ের সঙ্গে থাকবে না বাবার সঙ্গে, অ্যানার হাত ধরবে নাকি এলিস বা জিনের, নাকি কারো হাত না ধরে চলে যাবে—প্রতিটিই তৈরি করে একেকটি সম্ভাবনার একটি নতুন মহাবিশ্ব।
এখানেই এসে যুক্ত হয় ক্যাওস থিওরি বা বিশৃঙ্খলার তত্ত্ব। ব্রাজিলে এক ভবঘুরের কুটিরে বসে ডিম সেদ্ধ করার সময় সৃষ্ট বাষ্প থেকে শুরু হওয়া বায়ুমণ্ডলের পরিবর্তন ঘটিয়ে কিভাবে এক বছর পরে সুদূর নিউইয়র্কে বৃষ্টিপাতের কারণ হয়, সে বৃষ্টির পানিতে কাগজে লেখা ফোন নম্বর মুছে গিয়ে নিমোর অ্যানাকে হারিয়ে ফেলা, সব মিলিয়ে ঘটনার যে প্রবাহ তৈরি হয়, তা আসলে কার্যকারণ সম্পর্কের এক অনন্ত জালের রূপক। সে হিসেবে এখানে একক কোনো মূল কারণ নেই; গোটা বিষয়টিই অসংখ্য বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে জুড়ে দেয়া এক মহাজাগতিক বিশৃঙ্খলা।
এ জটিলতার ভেতরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো পরিচয়ের। নিমো বারবার নিজের অস্তিত্বকে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করে, কিন্তু প্রতিটি জীবন তাকে নতুনভাবে গড়ে তোলে। এখানেই প্রবেশ ঘটে অস্তিত্ববাদী দর্শনের। জ্যাঁ পল সার্ত্রের ব্যাখ্যায় মানুষ পূর্বনির্ধারিত কোনো ডেস্টিনি বা গন্তব্য নিয়ে জন্মায় না। বরং সে নিজের জীবনের অর্থকে নির্মাণ করে নিজের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে। কিন্তু মি. নোবডি এ ধারণাকে আরো জটিল করে তোলে।
এ জায়গার ব্যাখ্যায় উঠে আসে নিহিলিজম বা অর্থহীনতার দার্শনিক প্রশ্নও। যদি কোনো জীবনই ‘সঠিক’ না হয়, তবে জীবনের অর্থ কোথায়? কিন্তু শেষ পর্যন্ত সিনেমাটি অর্থহীনতার অন্ধকারে থেমে যায় না। বরং এটি ইঙ্গিত করে যে অর্থ কোনো পূর্বনির্ধারিত সত্য নয়; বরং সম্ভাবনা ও সিদ্ধান্তের মধ্যেই নির্মাণ হয় জীবনের অর্থ।
এই দার্শনিক, বৈজ্ঞানিক ও আধ্যাত্মিক জটিলতার মধ্যে গল্পের সূত্রধর হয়ে দাঁড়ায় সম্ভাবনার গণিত। যেখানে দেখা যায় প্রতিটি সিদ্ধান্ত বা বেছে নেয়ার সঙ্গে সঙ্গে সম্ভাব্য ভবিষ্যতের সংখ্যাও বেড়ে যায় গুণোত্তর মাত্রা। সাধারণ একটি বাইনারি সিদ্ধান্তও তৈরি করতে পারে অসংখ্য জীবন। আসলে নিমোর জীবন একক কোনো বাস্তবতা নয়, বরং সম্ভাবনার এক বিশাল সমীকরণ।
নিমো নোবডিকে ব্যাখ্যা করা যায় তাওবাদী দৃষ্টিকোণ থেকেও। সে কোনো জীবনে অ্যানার স্বামী। কোথাও এলিসের প্রেমিক। আবার কোথাও অন্য কেউ। যখনই তার কোনো একটি জীবনকে একক একটি ধ্রুব সত্য ধরে নেয়া হয়, তখনই তার অস্তিত্বের অসীম সম্ভাবনাগুলো সংকুচিত হয়ে যায়। এখানেই প্রবেশ করে জেন দর্শন ও বৌদ্ধ অনাত্মবাদের কাছাকাছি এক সিদ্ধান্ত। ‘আমি আসলে কে?’ খুঁজতে খুঁজতে নিমোর জীবনের শেষ পর্যায়ের উত্তর দাঁড়ায় ‘আমি আসলে কেউ না’। এ বক্তব্য সিনেমার শেষার্ধে এসে নিমোর অসংখ্য জীবন ভাঙন ধরায় না। বরং হয়ে দাঁড়ায় নিজের পরিচয়ের অনুপস্থিতির উপলব্ধির বহিঃপ্রকাশ মাত্র। এখানে ‘আই এম নোবডি’ মানে কোনো আত্মপরিচয়ের সংকট নয়; বরং স্থির পরিচয়ের ধারণা থেকে মুক্তির ঘোষণা।
নির্মাণের দিক থেকে মি. নোবডি সিনেমাটি ভিজুয়াল স্টোরিটেলিংয়ের এক অনন্য নিদর্শন। গল্পের বর্ণনায় জাক্সটাপোজিশন ও মন্তাজ ব্যবহারে অসাধারণ মুনশিয়ানা দেখিয়েছেন জ্যাকো ভ্যান ডরমেল। কখনো কখনো তার মেকিং কেবল অলংকার থাকেনি, গল্পের মূল কাঠামোও হয়ে উঠেছে। পরিচালক নিমোর ভিন্ন ভিন্ন জীবনকে বারবার পাশাপাশি বসিয়েছেন। বয়স ও সময়ের বৈপরীত্যের উপস্থাপনও অসাধারণ। সিনেমাটোগ্রাফার জোয়াকিম ফিলিপ্পি সিনেমার প্রতিটি বাস্তবতাকে আলাদা করার জন্য ভিন্ন ভিন্ন ‘কালার প্যালেট’ বা রঙের বিন্যাসে ব্যাপক বৈচিত্র্য এনেছেন। যেমন নিমোর বুড়ো বয়সের দৃশ্যগুলোয় নীল ও ধূসর রঙের ব্যবহার করা হয়েছে, যা বিষাদ ও শূন্যতার প্রতীক। আবার যৌবনের দিনগুলোয় উজ্জ্বল ও উষ্ণ রঙের ব্যবহার করা হয়েছে, যা স্বপ্ন ও সম্ভাবনার রূপক।
ক্যামেরার কাজও বেশ সাবলীল ও দ্রুত। বিশেষ করে মহাকাশ বা পানির নিচের দৃশ্য উপস্থাপনে ক্যামেরার অ্যাঙ্গেল ধরায় বেশ দক্ষতা দেখিয়েছেন জোয়াকিম। নিমো চরিত্রে জারেড লেটোর অভিনয় প্রশংসার দাবিদার। এমন বৈচিত্র্যপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করাটা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ অভিনেতার জন্যও অনেক কঠিন। কিন্তু প্রতিটি বৈপরীত্য ও বৈচিত্র্যেই ভ্যান ডরমেল নিঃসন্দেহে তার কাছ থেকে সেরাটা বের করে আনতে পেরেছেন। নিমোর পিতামাতার চরিত্রে রায়েস ইফান্স ও নাতাশা লিটলের অভিনয়ও ছিল প্রাণবন্ত। অ্যানা চরিত্রে ডিয়ানে ক্রুগার ও জিন চরিত্রে লিন দান পাম উৎরে গেছেন। তবে এলিস চরিত্রে সারাহ পলির অভিনয়েও আরো সাবলীলতার সুযোগ ছিল।
সিনেমা: মি. নোবডি
পরিচালক: জ্যাকো ভ্যান ডরমেলে
আইএমডিবি রেটিং: ৭.৭