মাস পেরোয়নি ‘কল্কি-২৮৯৮ এডি’ মুক্তির। সিনেমাটি এরই মধ্যে বক্স অফিস থেকে আয় করে নিয়েছে রেকর্ড পরিমাণ অর্থ। নাগ অশ্বিন এরই মধ্যে সিনেমাটি দিয়ে নিজের জাত চিনিয়েছেন। বেশ অনেকগুলো কারণে এটি ভারতীয় সিনেমাকে নতুন পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। এর মধ্যে আছে ডিস্টোপিয়ার উপস্থাপন, সায়েন্স ফিকশনের ধারা, সিনেমার সেট ডিজাইন, পুরাণের সঙ্গে ডিস্টোপিয়ার যোগ ও নতুন ধারার খল চরিত্র তৈরি করা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অভিনয় ও পরিচালনার গুণ। সব মিলিয়ে কল্কি একটি দারুণ সিনেমাটিক এক্সপেরিয়েন্স দিয়েছে।
প্রথমেই আসতে হয় এ সিনেমার গল্পে। গল্প লিখেছেন নাগ অশ্বিন, রুথম সমর ও সাই মাধব বুররা। ডিস্টোপিয়ার সাধারণ নিয়ম অনুসারে, এর গল্প দূর ভবিষ্যতের, মূলত ২৮৯৮ সালের। সে সময় দুনিয়া অন্য রকম। এখনকার কোনো বাস্তব অবস্থা নেই। পুরোটাই অদ্ভুত। সেখানে কেউ কাউকে পানি দেয় না। অর্থের বিনিময়ে চলে সব ধরনের লেনদেন। সিনেমার গল্প যে স্থানটি দেখায় তার নাম কাশী। তবে বর্তমান তীর্থস্থান কাশীর সঙ্গে এর মিল নেই। পুরোটাই ধূসর ও মরুভূমির মতো। সেখানেই বাস এ গল্পের নায়ক ভৈরবের। সে একজন বাউন্টি হান্টার।
বাউন্টি কী? মূলত ২৮৯৮ সালের কাশী চলে কমপ্লেক্স নামে একটি কেন্দ্রের শাসনে। সেখানকার সুপ্রিমের নাম ইয়াসকিন। তাকে কেউ দেখেনি। কেবল তার কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাই তাকে চেনে। কমপ্লেক্সের বাইরে থাকে সাধারণ মানুষ। তার মধ্যে আছে কিছু বিদ্রোহী। বিশেষত, শাম্ভালা নামক স্থানে আছে বিদ্রোহী গ্রুপ। তাদেরই কাউকে ধরে দিতে পারলে কমপ্লেক্স থেকে পাওয়া যায় ‘ইউনিট’। নতুন সময়ের টাকা, ইউনিট। ভৈরব সে ইউনিটই সংগ্রহ করে বিদ্রোহীদের ধরে। কেননা তার ইচ্ছা কমেপ্লেক্সের জীবন।
এদিকে শাপগ্রস্ত অশ্বত্থামা অপেক্ষায় আছেন কিছুর। কৃষ্ণ তাকে শাপ দিয়েছিলেন তিনি অমর থাকবেন, কিন্তু একটা জীবন বাঁচানোর সুযোগ পাবেন। সেটি করে শাপ মোচন হবে তার। ইয়াসকিন চায় অমরত্ব। ভ্রুণ থেকে নির্যাস নিয়ে শক্তি সঞ্চয় করে সে। এজন্য প্রয়োজন গর্ভবতীদের। ইয়াসকিন তাদের আটকে রেখে এ নির্যাস সংগ্রহ করে। কিন্তু কোনোটিই তাকে উপযুক্ত শক্তি দিতে পারে না। এরই মধ্যে পালিয়ে যায় সুমতি। তার গর্ভের শিশুটি বিশেষ। তাকে তাই পাহারা দেয় অশ্বত্থামা। কিন্তু ভৈরব চেষ্টা করে সুমতিকে ধরে কমপ্লেক্সের হাতে সোপর্দ করতে।
সিনেমায় ভৈরব চরিত্রে অভিনয় করেছেন প্রভাস। অশ্বত্থামা চরিত্রে অমিতাভ বচ্চন। দীপিকার চরিত্র সুমতি। এছাড়া ইয়াসকিন চরিত্রে অল্প সময় ছিলেন কমল হাসান। অভিনয় করেছেন শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়, দিশা পাটানি, রাজেন্দ্র প্রসাদ ও আরো অনেকে।
সিনেমার প্রথম ভালো দিক ভিন্ন এক পৃথিবী নির্মাণ। ২৮৯৮ সালে পৃথিবী কেমন হবে, তা নিয়ে অনেক জল্পনা-কল্পনা আছে। তবে পানির সংকট হবে তা অনেকেই জানেন। সে চিন্তা থেকেই এক ধূসর পৃথিবী নির্মাণ করেছেন নাগ অশ্বিন। তার সিনেমার সেট নির্মাণ বরাবরই ভালো। এর মধ্যে তিনি ‘মহানটী’ সিনেমায় দক্ষিণ ভারতের সিনেমার পুরনো দিনের একটি চিত্র উপস্থাপন করেছিলেন। এবারো সে ধারায় দারুণ একটি সেট নির্মাণ করেছেন। সেট মূলত একটা হয় সিনেমায়, কিন্তু এখানে অনেকগুলো সেট আছে। সে হিসেবে বলতে হয় সেট নয়, তিনি নির্মাণ করেছেন একটা দুনিয়া। ভেঙে পড়া শহর, সেখানকার অরাজকতা, কমপ্লেক্সের সুখ-শান্তি মিলিয়ে পুরো সিনেমায় তিনি নির্মাণ করেছেন ডিস্টোপিয়ান ধারণা। সেটি এ সিনেমার প্রথম প্লাস পয়েন্ট।
এরপর আসে অভিনেতাদের প্রসঙ্গ। মূলত প্রভাসকে হাইলাইট করা হলেও এ সিনেমার প্রাণ অমিতাভ বচ্চন। তিনি অশ্বত্থামা চরিত্রে একাই সিনেমার ফেস হয়ে উঠেছেন। ৮০ পার করা অমিতাভ যেন তরুণ অভিনেতার মতো অভিনয় করেছেন। প্রভাসের সঙ্গে তার একাধিক মুখোমুখি লড়াইয়ের দৃশ্য আছে। অমিতাভ অভিনয় করেছেন ভারী মেকআপ নিয়ে, কিন্তু তার মধ্যেও শুধু অভিব্যক্তি দিয়ে প্রভাসকে আড়ালে ফেলে দিয়েছেন তিনি। অমিতাভ বচ্চন ছাড়া এ সিনেমায় দারুণ অভিনয় করেছেন শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়। তার চরিত্রের নাম কমান্ডার ম্যানাস। তিনি ছোট একটি চরিত্র করলেও এর প্রভাব ছিল বেশি। বিশেষত শেষ একটি দৃশ্যে তার অভিব্যক্তি ছিল দারুণ।
দীপিকা পাড়ুকোন এ সিনেমার প্রায় শোপিস। তবে তার মধ্যেও তিনি টুকটাক ভালো অভিনয়ই করেছেন। আরো স্ক্রিন টাইম প্রয়োজন ছিল তার। আর অমিতাভের পর ভেলকি দেখিয়েছেন কমল হাসান। সামান্য সময়ে তিনি হয়ে উঠেছেন খতরনাক এক খল চরিত্র। সিনেমায় বেশকিছু ক্যামিও ছিল। এর মধ্যে রাজামৌলির ক্যামিওটি ছিল সবচেয়ে ভালো।
পুরাণের সঙ্গে মিলের বিষয়টি প্রথম পর্বে পুরোপুরি আসেনি। দ্বিতীয় পর্বের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। তবে এ সিনেমা দেখার সময় স্ক্রিন থেকে চোখ সরানো কঠিন। সে কারণেই কল্কি হয়ে উঠেছে বছরের অন্যতম সেরা ভারতীয় সিনেমা। আয় করেছে হাজার কোটি রুপির বেশি।