বাংলা সিনেমার (পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ) আলাপে উত্তম কুমার প্রসঙ্গ অবধারিত। বাংলাদেশের সিনেমার সঙ্গে তার সরাসরি যোগ নেই কিন্তু উত্তম কুমার বাংলাদেশের দর্শকের কাছেও জনপ্রিয় ছিলেন এবং এখনো আছেন। মূলত তার যে প্রতিভা ও প্রভাব তা বাংলাদেশ তো বটেই, বলিউডও এড়াতে পারেনি। উত্তমকে বলিউড গ্রহণ করেনি সাদরে তবে ফেলেও দিতে পারেনি। আর বাংলাদেশের সেকালের দর্শক তো বটেই, একালের দর্শকও উত্তম-অভিনয়ে মুগ্ধ হন। পশ্চিমবঙ্গে উত্তম বন্দনা হয়। তার অভিনীত সিনেমা রিমেক করে কেউ সময়ের সেরা পরিচালক হয়ে যান। নানা অনুষ্ঠানে উত্তম কুমারকে মহানায়ক বলে বলে মুখে ফেনা তোলা হয়। তাকে বলা হয় ‘মহানায়ক’। কিন্তু আদতে এ তকমার আড়ালে পড়ে গেছে তার অভিনেতা সত্তা।
উত্তম কুমার বিষয়ক আলোচনায় তার পরবর্তী প্রজন্মের অভিনেতা, পরিচালকরা ভক্তিগদগদ ও তার সমসাময়িকরা আবেগী কিছু কথা ও স্মৃতি উচ্চারণ করেন। এর বাইরে উত্তম কুমারের জীবদ্দশায়ই তাকে নিয়ে তৈরি হয়েছিল বহু কিংবদন্তি। সেসবও নতুন করে চলে আসে বা তা খণ্ডন করার সময় চলে যায়। কিন্তু সেসবের মধ্যে ‘অভিনেতা’ উত্তম কুমার অনুপস্থিত। অথচ উত্তম কুমারকে আবিষ্কার করতে হয় মূলত তার সিনেমার মাধ্যমে।
তরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায় সিনেমায় এসে হলেন উত্তম কুমার। প্রথম অভিনীত সিনেমা ‘মায়াডোর’। হিন্দিতে করা এ সিনেমাটি মুক্তি পায়নি। সে হিসেবে উত্তমের অভিষেক হয় ১৯৪৮ সালে, ‘দৃষ্টিদান’ দিয়ে। ১৯৫২ পর্যন্ত তার অভিনীত সাতটি সিনেমার কেনোটিই সাফল্যের মুখ দেখেনি। ১৯৫২ সালে নির্মল দে পরিচালিত ‘বসু পরিবার’ সাফল্য পায়। পরের বছর ‘সাড়ে চুয়াত্তর’। মূলত নির্মল দে’র এ সিনেমাতেই উত্তম-সুচিত্রা জুটির সূচনা এবং তারপর ইতিহাস।
চল্লিশের দশকে পশ্চিমবঙ্গ এমনকি বলিউডের সিনেমাও ছিল স্টুডিওভিত্তিক। সংলাপ থাকত বইয়ের ভাষায়। সেকালের সিনেমা আজকে দেখলে বোঝা যায় যে পাত্র-পাত্রীরা অভিনয় গৎবাঁধা করছেন। কিন্তু সময়ের হিসাবে উত্তম কুমারের মধ্যে এ বিষয়টি ছিল কম। ‘ন্যাচারাল অভিনয়’ বলতে যা বোঝায় তা পঞ্চাশের দশকেই উত্তম কুমারের মধ্যে দেখা গেছে। অন্য অভিনেতারা যখন প্রচলিত ধারার মধ্যেই অভিনয় করে যাচ্ছেন, উত্তম কুমার তখন চিত্রনাট্য ও চরিত্রের সঙ্গে মিলিয়ে নিজেকে নতুন করে তৈরি করতেন স্বল্প সময়ে।
সিনেমায় জুটির বিষয়টি সবসময়ই গুরুত্ব পেয়েছে। সে কারণে এক সময় বলিউডে যেমন তৈরি হয়েছিল রাজ কাপুর-নার্গিস জুটি, ঋষি কাপুর-নীতু সিং জুটি, অমিতাভ-রেখা, শাহরুখ-কাজল, তেমনি পশ্চিমবঙ্গে তৈরি হয়েছিল উত্তম-সুচিত্রা জুটি। কিন্তু যে জুটিগুলোর নাম নেয়া হলো তার মধ্যে উত্তম-সুচিত্রাকে তুলনা করা যায় রাজ-নার্গিসের সঙ্গে। বস্তুত রাজ-নার্গিসের তুলনায়ও জনপ্রিয় ছিলেন উত্তম-সুচিত্রা। কিন্তু এ জুটির মধ্যে আটকে থাকেননি উত্তম। তিনি যেমন সুচিত্রার সঙ্গে সফল সিনেমা দিয়েছেন, তেমনি সুপ্রিয়া দেবী, সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গেও সফল সিনেমা দিয়েছেন ইন্ডাস্ট্রিকে।
পশ্চিমবঙ্গের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিকে উত্তম কুমার ব্যবসাসফল সিনেমা যেমন দিয়েছেন, তেমনি ‘বন পলাশীর পদাবলী’র মতো সাহিত্যভিত্তিক সিনেমাও নির্মাণ করেছেন। ১৯৭৩ সালে যখন সিনেমাটি মুক্তি পায় তখন সেটি ফর্মুলা সিনেমার যুগ। কিন্তু উত্তম কুমার সেই সময়েই চাইলেন গ্রামবাংলার একটা চিত্র তুলে ধরতে। বন পলাশীর পদাবলী বাংলা সিনেমার ইতিহাসে আজও প্রশংসিত।
বলিউডে তার সিনেমা রিমেক হয়েছে। বসু পরিবার মুক্তির আট বছর পর বলিউডে রিমেক হয়েছিল ‘হাম হিন্দুস্তানি’ নামে। শক্তি সামন্ত পরিচালিত ১৯৭৬ সালের সিনেমা ‘অমানুষ’ বাংলার পাশাপাশি হিন্দিতেও শুট হয়ে মুক্তি পেয়েছিল। পরের বছর সিনেমাটি তেলেগুতে রিমেক হয়। অভিনয় করেন এনটি রামা রাও। এর পরের বছর মালয়ালম ও তামিলেও রিমেক হয়। তামিল ‘ত্যাগম’-এ অভিনয় করেন শিবাজী গণেশ। ১৯৭০ সালে মুক্তি পাওয়া ‘নিশিপদ্ম’র রিমেক রাজেশ-শর্মিলা অভিনীত ‘অমর প্রেম’ তো কাল্ট ক্ল্যাসিক।
বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের নানা অনুষ্ঠানে দেখা যায় উত্তম কুমারকে নিয়ে নানা আলাপ। তার অভিনীত নায়ককে ভেঙে সৃজিত মুখার্জি নির্মাণ করেছেন ‘অটোগ্রাফ’। তিনিই আবার ‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’ ভেঙে করলেন ‘জাতিস্মর’। ‘সন্ন্যাসী রাজা’ ভেঙে তৈরি হলো ‘এক যে ছিল রাজা’। এমনকি সর্বশেষ উত্তম কুমারের সিনেমার ফুটেজ কেটে বানিয়েছিলেন ‘অতি উত্তম’।
এ সবকিছুই হয়েছে উত্তম কুমারের লিগ্যাসি হিসেবে। কিন্তু লিগ্যাসি প্রচারে ব্যবহার করা হয়েছে ভক্তি আর জমকালো আয়োজন। সেসব পার করে অভিনেতা উত্তমকে খুঁজে বের করলে সিনেমারই উন্নতি হবে।