জায়েদ খান, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির টানা দুবারের সাধারণ সম্পাদক। প্রতিভা অন্বেষণের অনুষ্ঠান ‘নতুন মুখ’-এর মাধ্যমে চলচ্চিত্রে আসেন। এখন পর্যন্ত অভিনয় করেছেন প্রায় ২০টি সিনেমায়। শিল্পী সমিতির শীর্ষ নেতা হিসেবে দেশের শিল্প ও শিল্পীদের সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে কাজ করতে হয় তাকে। বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলছিলেন চলচ্চিত্রের ভবিষ্যৎ ও বিবিধ প্রসঙ্গে। সাক্ষাত্কার নিয়েছেন মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ
আপনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। অনেক দিকেই ক্যারিয়ার গড়তে পারতেন? কোন ভাবনাটা আপনাকে চলচ্চিত্রে নিয়ে এল?
আমি ছোটবেলা থেকেই সিনেমাপাগল ছিলাম। স্কুল পালিয়ে সিনেমা দেখতাম। ঈদের সময় টাকা জমিয়ে সিনেমা হলে দৌড়াতাম। সিনেমা আমার রক্তে। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কীভাবে ভর্তি হলাম তাও জানি না। আমার কিন্তু ডাবল ফার্স্ট ডিভিশন। ঢাকা ভার্সিটির সব বন্ধু বিসিএসে মনোযোগ দিল। আমার বন্ধুদের কেউ অ্যাডিশনাল এসপি, ম্যাজিস্ট্রেট হয়ে গেছে। আমি বিসিএসের ফর্মও পূরণ করিনি। আমার স্বপ্ন ছিল নায়ক হব। সেই ভাবনা থেকে নতুন মুখে আবেদন করলাম। চিঠি এল। ২০০৭ সালে চ্যাম্পিয়ন হলাম। সেখান থেকেই পথচলা। আমি রুবেল ভাইয়ের ভক্ত, মান্না ভাইয়ের ভক্ত। ছোটবেলা থেকে নিজেকে বড় পর্দায় দেখার স্বপ্ন ছিল। সেই স্বপ্নই আমাকে চলচ্চিত্রে নিয়ে এসেছে।
ওটিটি প্লাটফর্মের একটা জোয়ার লক্ষ করা যাচ্ছে। এ সময়ে বাংলা সিনেমার ভবিষ্যৎ কী?
সিনেমার ভবিষ্যৎ নষ্ট হয়ে গেছে করোনার প্রভাবে। ওটিটি প্লাটফর্ম কোনো বিষয় না। সবাই প্রযুক্তি ব্যবহার করবে। কিন্তু সিনেমা হলে সিনেমা দেখার যে মজা, সেটা তো ওটিটি পূরণ করতে পারবে না। মানুষ বড় পর্দায় সিনেমা দেখতে চায়। বন্ধুবান্ধব নিয়ে হইচই করে, করতালি দিয়ে সিনেমা দেখতে চায়। বড় পর্দায় সিনেমার দেখার যে মজা, তা তো মোবাইলে পাবে না। ওটিটির সিনেমা দেখা আর ইউটিউব দেখা একই কথা। ওটিটি সিনেমার জন্য মোটেও ক্ষতিকর নয়।
সিনেমা হল সংস্কারের কথা শোনা যাচ্ছে। এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নিয়েছেন?
হলগুলো সংস্কারের কাজ চলছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী হল মালিকদের প্রণোদনা দিয়েছেন। স্বল্প সুদে ঋণ দিয়েছেন। সারা দেশে আধুনিক হল নির্মিত হবে। বর্তমানে যেগুলো আছে সেগুলোকে আধুনিকায়ন করা হবে। এ কাজগুলো হয়ে গেলে আর কারোনা চলে গেলে আশা করি সব ঠিক হয়ে যাবে। ওটিটির পাশাপাশি সিনেমা হলও জমজমাট হয়ে উঠবে।
দীর্ঘদিন হল বন্ধ। দর্শক সিনেমা হলে যাওয়া ভুলেই গেছে বলা যায়। এ অবস্থায় দর্শককে হলে ফেরানো একটা চ্যালেঞ্জ হবে কিনা?
অবশ্যই চ্যালেঞ্জের হবে। এজন্য হল ঠিক করতে হবে। করোনার এ সময়ে উচিত ছিল সিনেমা হলগুলো ভেঙে পুরোপুরি আধুনিকায়ন করা। দর্শক যেন দেখে, করোনার পর নতুন সিনেমা হলে যাচ্ছি। এখন মানুষ মান্ধাতা আমলের হলে আর যাবে না। করোনার পর মফস্বলগুলোয়ও যদি আধুনিক হল চালু হয় তাহলে দর্শকদের মধ্যে নতুন করে উন্মাদনা তৈরি হবে। সুন্দর পরিবেশ হলেই মানুষকে আবার হলমুখী করা সম্ভব।
এ পদক্ষেপ বাস্তবায়নে চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির ভূমিকা কী?
আমরা সরকারের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছি। হল মালিকদের বলছি। আমরা লেগে আছি। প্রতিনিয়ত হলমালিকদের বলছি। তারা যেন উদ্যোগী হন। হলগুলো দ্রুত আধুনিকায়ন করতে হবে।
আপনি একটা প্রতিভা অন্বেষণ আয়োজনের (নতুন মুখ) মাধ্যমে চলচ্চিত্রে এসেছেন। এমন আয়োজন এখন আর দেখা যায় না।
সিনেমা কমে গেছে এ কারণে আর দেখা যায় না। যদি সিনেমার অবস্থা রমরমা থাকত, বিনিয়োগকারী বেশি থাকত তাহলে এ ধররের আয়োজনও চলত। একটা তো আরেকটার সঙ্গে সম্পর্কিত। এখন যদি কেউ নায়ক-নায়িকা নিয়ে আসে, কাজে লাগাবে কোথায়? যারা আছে তাদেরকেই তো কাজে লাগাতে পারছে না। যার কারণে এগুলো পিছিয়ে গেছে। হলগুলো যদি আধুনিকায়ন হয়, সিনেমা বানানো শুরু হয়, তখন দেখবেন এগুলো আবার দরকার হবে।
বিশ্বায়নের এ যুগে দেশের নির্মাতা, শিল্পী ও টেকনিশিয়ানদের দক্ষতা বাড়ানোর প্রয়োজন আছে কিনা?
অবশ্যই আছে। সময় দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। এখন সবার হাতে স্মার্টফোন। সবাই বিশ্বের সব কাজ দেখছে। এ অবস্থায় আমাদেরও বিশ্বমানের হতে হবে। যতই শিখবে ততই অভিজ্ঞতা বাড়বে। এফডিসি যদি বিদেশ থেকে কিছু পরিচালক, ক্যামেরাম্যান, লাইটিং, কালার গ্রেডিং, এডিটিংসহ টেকনিক্যালি দক্ষদের নিয়ে এসে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে, সেটা খুবই ভালো হয়। আবার দেশের টেকনিশিয়ানদের যদি বাইরে থেকে দক্ষতা বৃদ্ধি করে নিয়ে আসা হয়, অবশ্যই সিনেমার মান বাড়বে বলে আমি মনে করি।
তামিল, তেলেগু, মালয়ালম ইন্ডাস্ট্রির চেয়ে বাংলা ভাষার চলচ্চিত্রের দর্শক বেশি। তার পরও ওরা এত এগিয়ে, আমরা পিছিয়ে কেন?
প্রযুক্তিগত পার্থক্যই ওদের এগিয়ে দিয়েছে। ওদের নায়ক-নায়িকারা কিন্তু আহামরি সুন্দর না। আমাদের প্রযুক্তিগত উন্নতি করতে হবে। কমপক্ষে ৫০০ সিনেমা হল আধুনিকায়ন করতে হবে। শুধু সিনেমা হল থাকলেই হবে না, ভালো কনটেন্টও দিতে হবে। তাহলেই সিনেমা ঘুরে দাঁড়াবে বলে আমার বিশ্বাস।
দেশে-বিদেশে আপনার প্রিয় অভিনেতা কে?
আমার দেশের সব অভিনেতাই আমার কাছে প্রিয়। বলিউডে প্রিয় সালমান খান। আমার একমাত্র আইডল। তার সবকিছু আমার ভালো লাগে। শুধু পর্দার সালমান খান নন, তিনি মানুষের কল্যাণে কাজ করেন, বিয়িং হিউম্যান ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে প্রচুর টাকা খরচ করেন মানুষের জন্য। আমি তাকে ফলো করে অনেক কাজ করার চেষ্টা করি। মানুষের প্রতি তার ভালোবাসা আমাকে মুগ্ধ করে।
সালমান খানের সঙ্গে দেখা বা কথা হয়েছে?
ঢাকায় যখন এসেছিলেন তখন দেখা হয়েছে। তখন খুব একটা সময় পাইনি। এবার বোম্বে গিয়েছিলাম। তার ম্যানেজার আমাকে টাইম দিয়েছিলেন। দেখা হয়ে যেত। কিন্তু করোনার কারণে সালমান খান বের হচ্ছেন না। এজন্যই দেখা হয়নি। তবে করোনা গেলেই দেখা করব।
আপনি খুবই স্টাইলিশ। প্রিয় ব্র্যান্ড কোনটা?
নির্দিষ্ট কোনো ব্র্যান্ড নেই। কখনো আরমানি পরি, কখনো লুই ভিতোঁ পরি, ভার্সেচির পারফিউম ভালো লাগে। বিং হিউম্যানের টি-শার্টগুলো পরতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। জিন্সের ক্ষেত্রে লিভাইস, ভার্সেচি পরা হয়। আমার জুতাগুলো খুবই আনকমন হয়। ইতালি, সিঙ্গাপুর কিংবা আমেরিকা গেলে বিভিন্ন জায়গা ঘুরে ঘুরে আনকমন জুতা সংগ্রহ করি।