ঈদের সিনেমা মানে কী? বড় বাজেট, ধুমধারাক্কা মারামারি, নায়ক-নায়িকার কিছু হিট গান আর কয়েকটা জমাট ডায়ালগে ভরা দৃশ্য। এ ফর্মুলা এখন অতীত। দর্শক এখন অনেক সচেতন। তাদের আবেগ নিয়ে খেলতে হলে দরকার ভালো গল্প ও চিত্রনাট্য। সঙ্গে দরকার নায়ক-নায়িকার সেরা পারফরম্যান্স। নয়তো গরমে ঘেমে সিঙ্গেল স্ক্রিন কিংবা শুধু এসির বাতাস খেতে পাঁচশ হাজার টাকা খরচায় সিনেমায় কেন যাবে দর্শক। সেখান থেকেই বলা যায়, ‘জংলি’ দর্শককে সিনেমা হলে এনে প্রতারণা করেনি। আবেগ নিয়েই খেলেছে। প্রযোজক থেকে চিত্রনাট্যকার, জংলির টিমে অনেক কিছুই প্রথম। তাই কিছু খামতি থাকলেও পিতৃত্বের এক আবেগঘন গল্প পর্দায় আনতে সফল এম রাহিমের টিম।
জংলি মুক্তি পাওয়ার কথা ছিল ২০২৪-এর কোরবানির ঈদে। তবে সেবার নানা কারণে সিনেমা মুক্তি থেকে পিছিয়ে আসেন নির্মাতারা। জংলি মানবিক গল্পের হৃদয়স্পর্শী সিনেমা, ঈদে পুরো পরিবারের সব বয়সীদের নিয়ে দেখার সিনেমা। আড়াই কোটির কিছু বেশি বাজেটের সিনেমার স্ক্রিনপ্লে ও নির্মাণশৈলীতে কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। সিনেমার গতিও অনেক জায়গায় শ্লথ, লজিক্যাল ঝামেলাও আছে। এগুলো একপাশে সরিয়ে রাখলে বলা যায়, জংলি দেখার জন্য খুব ভালো একটি দেশী গল্পের সিনেমা। এটি আপনাকে অজান্তেই কাঁদানোর ক্ষমতা রাখে, নিজের ভেতর প্রশ্নের জন্ম দিয়ে যায়। ‘গুড অ্যান্ড ব্যাড প্যারেন্টিং’ এ সময়ের খুব জরুরি দুটি টার্ম। সিনেমায়ও তার যোগ আছে। ‘কিছু সত্য ঘটনা থেকে অনুপ্রাণিত’ এ গল্পে দর্শকের মনে গেঁথে রাখার অনেক উপাদান দিয়ে দেয় হল থেকে বের হওয়ার সময়।
ঝড়-ঝঞ্ঝার রাতে এক হাসপাতালে একাকী মা ফুটফুটে এক শিশুর জন্ম দেয়। শিশুর বাবা তার দায়িত্ব নিতে চায় না। বুকে কষ্ট চেপে রেখে মা বাচ্চাটিকে ফেলে দেয় ময়লায়। সেখানে দেখতে পেয়ে ডা. তিথি শিশুটিকে উদ্ধার করে ও সন্তানের গুরুত্ব বোঝানোর চেষ্টা করে মাকে। মায়ের মনে তখন অনেক প্রশ্ন! সেসবের উত্তরে তিথি নিজের জীবনে দেখা জনি ওরফে জংলি আর তাকে বদলে দেয়া পাখির কাহিনী বলতে শুরু করে।
জংলির গল্প মূলত ফ্ল্যাশব্যাক-কেন্দ্রিক। খুব পরিপাটিভাবে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া থেকে বাড়ি ছেড়ে উচ্ছন্নে যাওয়া জনির (সিয়ামের) জার্নিটা দর্শকের সামনে আসতে থাকে। সমাজের নানা আপত্তিকর ইস্যু, প্যারেন্টিং ও কোর্ট ইস্যু চলে আসতে থাকে গল্পের স্রোতেই। জংলি বা জনির যাত্রার সঙ্গে গল্প এগোয় এক মর্মস্পর্শী ঘটনার দিকে। আজাদ খান প্রশংসা পাবেন এমন কাহিনী ভাবনার জন্য।
একদিক থেকে দেখলে এটা সিয়াম আহমেদের এখন পর্যন্ত সেরা পারফরম্যান্স অবশ্যই, একই সঙ্গে শিশুশিল্পী নৈঋতা ও বুবলিও দারুণ অভিনয় করেছেন। খেয়াল করে দেখলে বোঝা যাবে, সিয়াম এ সিনেমার সঙ্গে অনেক বেশি যুক্ত ছিলেন। তার অভিব্যক্তির কাঠিন্য দেখলে বোঝা যায়। বাকি চরিত্রগুলো গল্পের প্রয়োজনে এসেছে, চলে গেছে। খুব মনে রাখার মতো নয়। এমনকি দীঘির জায়গায় অন্য কাউকে নিলে খুব হেরফের হতো না। সিয়াম শুরুতে কম ভোকাল থাকলেও শেষদিকে ওভার ন্যারেশনে গেছেন, যেটা বিরক্তির ছিল।
জংলির শক্তিশালী দিক যেমন এর চিত্রনাট্য বা গল্পের বয়ান, এর দুর্বলতাও ঠিক ওখানেই। মেহেদী হাসান মুন, সুকৃতি সাহা প্রথমবারই এত ইমোশনাল একটা স্ক্রিনপ্লে লিখেছেন টের পাওয়া যায়নি। এম রাহিম ‘শান’ বানানোর আগে অনেক সিনেমায় সহকারী পরিচালক ছিলেন। তাই মেকিংয়ের টেকনিক ও ইমপ্লিমেন্ট করার ভঙ্গি সহজাত ছিল। তবে এ সিনেমা যতটা না সাধারণ দর্শকের জন্য, তার চেয়েও অনেক বেশি হৃদয়-ছোঁয়া, যেখানে চিত্রনাট্যকার-পরিচালক জুটি কী বলবেন, তা আন্দাজ করা সহজ ছিল। সিনেমা তার মূল গল্পে ঢুকতে সময় নিয়েছে, রেখে গেছে কিছু লজিক্যাল লুপহোল। কিছু জায়গায় দর্শককে যুক্ত করতে ও একই রকম আবেগতাড়িত করতে আরোপিত কান্না জুড়ে দেয়া হয়েছে।
প্রিন্স মাহমুদের মিউজিকে গানগুলো ভালো ছিল। তবে সিনেমায় গানের সংখ্যাধিক্য মনে হয় একটা সময়। দুটো গান কমানো যেত।৷সবচেয়ে ভালো লাগার বিষয় সিনেমার স্মার্ট এন্ডোর্সমেন্ট স্ট্র্যাটেজি৷ তেল থেকে শুরু করে দেয়ালের রঙ সবখানে বিজনেস।
জংলিতে খুব বর্বরতার দৃশ্য নেই, অ্যাকশন খুব লো স্কেলে হাতেগোনা দুটি, গালাগালিও তীব্রভাবে মনে লাগে না। হয়তো কমিক রিলিফ কম ছিল, বাজেট ঘাটতিও বোঝা গেছে। তবে আরো একটা বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণ করার মতো। খলচরিত্র যারা করেছেন বা যাদের রাখা হয়েছে, তাদের ও তাদের চরিত্র আরো শক্তিশালী ও বিশ্বাসযোগ্য করার প্রয়োজন ছিল। নির্মাতাদের সুযোগও ছিল। তবে তা না করে কেবল জংলিকেন্দ্রিক হয়েও সিনেমাটি যে আবেগকে স্পর্শ করে, তার জন্য হলেও বহুদিন দর্শকের মুখে মুখে এর নাম ঘুরবে তা বলা যায়।