সম্প্রতি গ্রেফতার হলেন অভিনেতা জোনাথন মেজর্স। এক নারীকে প্রাণঘাতী আঘাত করার অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছেন তিনি। মেজর্স অভিনীত মার্ভেলের ‘অ্যান্ট-ম্যান অ্যান্ড দ্য ওয়াস্প: কোয়ান্টাম্যানিয়া’ মুক্তি পায় গত ১৭ ফেব্রুয়ারি। সিনেমাটি সূচনায় ভালো করেও বক্স অফিসের সাফল্য ধরে রাখতে পারেনি। এর মধ্যে যা ছিল, মার্ভেলের জন্য তা যথেষ্ট, কিন্তু সমস্যা হলো অন্য জায়গায়। মার্ভেল তাদের পরবর্তী পর্যায়ের গল্পগুলোয় ক্যাং দ্য কংকারারকে মূল খলনায়ক করতে চেয়েছিল। মেজর্স সে চরিত্রেই অভিনয় করেছিলেন। কিন্তু তার গ্রেফতারের কারণে বদলাতে হতে পারে এ পরিকল্পনা। তাতে অবশ্যই প্রভাব পড়বে বক্স অফিসে। মেজর্সকে না বদলালেও প্রভাব থেকে রেহাই পাবে না মার্ভেলের সিনেমা। এর আগে এজরা মিলারের কাণ্ড নিয়ে ডিসিকে ভুগতে হয়েছে।
অভিনেতাদের ব্যক্তিগত জীবন, তাদের পছন্দ কোনোভাবেই সিনেমার ভালো-মন্দ নির্ধারণ করে না। কিন্তু এসব বিষয় অনেকভাবেই দর্শকের ওপর প্রভাব ফেলে। কেবল তাদের অভিনীত সিনেমাই না, পুরো ফ্র্যাঞ্চাইজিকে প্রভাবিত করে। কিন্তু কেবল মেজর্স বা মিলারের ব্যক্তিগত জীবন নয়, সুপারহিরো সিনেমা এমনিতেই বক্স অফিসে তুলনামূলক কম ব্যবসা করছে। ২০২২ সালে এ বিষয় দেখা গেছে স্পষ্ট করে। মার্ভেলের থর ও ডক্টর স্ট্রেঞ্জের সিনেমা দুটো নিয়ে যে প্রত্যাশা ছিল, তা পূর্ণ হয়নি। ব্যবসার দিক থেকে না হলেও সিনেমার গল্প, উপস্থাপন অর্থাৎ কনটেন্ট হিসেবে সন্তুষ্ট করতে পারেনি দর্শক সমালোচকদের।
গত ১ জানুয়ারি স্ক্রিন র্যান্ট একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এর শিরোনাম ছিল, ‘২০২২ সালে সুপারহিরো সিনেমা বক্স অফিসে তাদের প্রাধান্য হারিয়েছে’। এ শিরোনামে কোনো অত্যুক্তি নেই। গত বছর জারেড লেটো অভিনীত ‘মরবিয়াস’ আয় করেছিল মাত্র ২৪ কোটি ডলার। মরবিয়াস একাধিক বার মুক্তি দেয়ার পরও সিনেমাটি ব্যবসা করতে পারেনি। তবে মরবিয়াসের বিষয়টি ভিন্ন। সিনেমাটি যেন কোনোভাবেই দর্শকের মন পায়নি। ডিসির সুপারপেটস আয় করেছিল ২০ কোটি ডলারের কিছু বেশি। কিন্তু সিনেমাটি অ্যানিমেশন হওয়ার কারণে সেটির প্রতি দর্শকের আগ্রহ কমই ছিল। এর থাকে নির্দিষ্ট কিছু দর্শক। কিন্তু অন্য সিনেমাগুলোর ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন।
ডিসির ব্ল্যাক অ্যাডাম নিয়ে প্রত্যাশা ছিল। সিনেমাটির শুরুও হয়েছিল ডিসির অন্যান্য সিনেমার তুলনায় ভালো ব্যবসা দিয়ে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সিনেমাটি আয় করে ৪০ কোটি ডলারের কাছাকাছি। এ সিনেমার আগে-পরে বেশকিছু ঘটনা ঘটেছিল। প্রথমত সুপারম্যানের উপস্থিতি সিনেমাটির প্রতি দর্শকের আগ্রহ বাড়ায়। কিন্তু এরপর হেনরি ক্যাভিলের বাদ পড়া ভিন্ন পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল। সুপার পেটসের মতো প্রায় একই রকম অবস্থা হয়েছিল সনিক: দ্য হেজহগের। সিনেমাটি আয় করেছিল ৪০ কোটি ডলারের কিছু বেশি।
সেরার তালিকায় থাকা থর: লাভ অ্যান্ড থান্ডারের আয় ৭৬ কোটি ডলার। এর আয় ১০০ কোটি না হলেও ৮০-৯০ কোটি ডলার আশা করা হয়েছিল। মাঝখান থেকে ভালো আয় করেছে ডিসির দ্য ব্যাটম্যান। রবার্ট প্যাটিনসন অভিনীত সিনেমাটির আয় ৭৭ কোটি ডলারের মতো। মার্ভেলের সিনেমার ব্ল্যাক প্যান্থার: ওয়াকান্ডা ফরএভার। ২০২২ সালের নভেম্বরে মুক্তি পাওয়া সিনেমাটি আয় করেছে ৭৮ কোটি ৬০ লাখ ডলার। সবচেয়ে বেশি ব্যবসা করা সুপারহিরো সিনেমা ডক্টর স্ট্রেঞ্জ ইন দ্য মাল্টিভার্স অব ম্যাডনেসের আয় ৯৫ কোটি ৫০ লাখ ডলার।
এখন দেখে মনে হতেই পারে সিনেমাগুলো তো ভালো আয় করছে। কিন্তু আদতে তা নয়। ডক্টর স্ট্রেঞ্জ ১০০ কোটি পার করতে পারেনি। ওয়াকান্ডা ফরএভার আয় করেছে আরো কম। ডক্টর স্ট্রেঞ্জের সিনেমার কথাই যদি চিন্তা করা হয়, ২০১৬ সালে মুক্তি পাওয়া প্রথম সিনেমাটি আয় করেছিল ৬৭ কোটি ৭৮ লাখ ডলার। ২০১৭ সালের থর: র্যাগনারক আয় করেছে ৮৫ কোটি ৪০ লাখ ডলার। ২০১৮ সালের ব্ল্যাক প্যান্থারের আয় ১৩০ কোটি ডলারের বেশি। সে হিসেবে ২০২২ সালের সিনেমাগুলোর আয় আসলে কম।
কেন পিছিয়ে পড়ছে সুপারহিরো সিনেমা? এ কথা ভাবতে গেলে প্রথমেই আসে মহামারীর কথা। কভিড-১৯ সিনেমার বাজারকে পিছিয়ে দিয়েছে। থিয়েটার বন্ধ থাকা ও অর্থনৈতিক মন্দার কারণে সিনেমা হলে মানুষের আগমন কমেছে। কিন্তু সেখান থেকেও বেরিয়ে এসেছিল বা সিনেমার ব্যবসাকে বের করে এনেছিল মার্ভেল। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে মুক্তি পাওয়া স্পাইডার-ম্যান: নো ওয়ে হোম আয় করেছিল প্রায় ২০০ কোটি ডলার। কিন্তু তার পরই যেন পেছাতে শুরু করল সুপারহিরো সিনেমা। এর অন্যতম কারণ দর্শকদের চাহিদার বিপরীতে সিনেমার নির্মাণে পার্থক্য। এছাড়া সুপারহিরো সিনেমার ইতিহাস দেখতে একটু পেছনে ফিরতে হবে।
নব্বইয়ের শেষের দিকে সুপারহিরো সিনেমা চলত অন্যান্য সিনেমার সমান্তরালে। আলাদা বড় ব্যবসা করার চিন্তা সেখানে ছিল না। ক্রিস্টোফার নোলানের ব্যাটম্যান ট্রিলজি দিয়ে ব্যাটম্যানের মাধ্যমে সুপারহিরো সিনেমার নতুন ধারা তৈরি হয়। ২০০৮ সাল থেকে মার্ভেল সে ধারায় একের পর এক সিনেমা নির্মাণ করে এবং ২০১২ সালে অ্যাভেঞ্জার্স দিয়ে প্রতিষ্ঠা করেছিল নিজেদের একাধিপত্য। অ্যাভেঞ্জার্স আয় করেছিল ১৫০ কোটি ডলার। অ্যাভেঞ্জার্স এন্ডগেমের আয় ২৭০ কোটি ডলারের বেশি। মূলত এর পরই আসতে শুরু করে খারাপ সময়।
এন্ডগেমের পর মার্ভেলের ফরমেশন বদলে যায়। পুরনো তারকারা সিরিজ ছেড়ে দিলে দর্শকের পছন্দ হচ্ছিল না নতুন সেটআপ। এরপর সাম্প্রতিক সিনেমাগুলোর গল্প ও ভিএফএক্স নিয়েও আছে তাদের আপত্তি। এদিকে লোকি যেভাবে দর্শকদের মজা দিয়েছে, ক্যাং তা দিতে পারেনি। ব্যাটম্যানকে দর্শক যতটা পছন্দ করেছে, শাজামকে তা করতে পারেনি। মার্ভেল তাদের সিনেম্যাটিক ইউনিভার্স বড় করতে গিয়ে মানের ক্ষেত্রে আপস করেছে। অন্যদিকে ডিসি কী করছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। এর পাশ দিয়ে নতুন করে টপ গান, অ্যাভাটারের মতো সিনেমা এসে দর্শকের স্বাদ বদলের কারণ হচ্ছে। তাই অনেকেরই মনে হচ্ছে সুপারহিরোদের থামতে হতে পারে এবার।