‘একা একা লাগে...’
মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ‘৫১বর্তী’ নাটকের বিশেষ একটি সংলাপ যিনি বলছেন একটু পরপর, নাটকে তার নাম ‘মেন্টাল বাহাদুর’। পুরনো প্রেমিকার শ্বশুরবাড়ি চলে আসে সে। পাগলা কিসিমের হলেও মানুষটা ভালো। এ চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন আহমেদ রুবেল। অসংখ্য নাটকে অসংখ্য চরিত্রে রূপ দিয়েছেন তিনি, কিন্তু কোনো না কোনোভাবে দর্শকের মনে আছে মেন্টাল বাহাদুরকে। দর্শকের মনে আছে রুমিকেও। আহীর আলম পরিচালিত ‘প্রেত’ ধারাবাহিকে এ চরিত্রে অভিনয় করেন আহমেদ রুবেল। হুমায়ূন ফরীদির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অভিনয় করেছিলেন। মুহম্মদ জাফর ইকবালের গল্প থেকে নির্মিত একুশে টেলিভিশনে প্রচার হওয়া এ নাটক এখন ক্ল্যাসিকের মর্যাদায়। সেই সঙ্গে দর্শকের মনে রেখাপাত করে আছে রুমি।
অবশ্য আহমেদ রুবেলের শুরুটা টেলিভিশন নাটক থেকে নয়। তিনি প্রথম অভিনয় করেছিলেন নাট্যাচার্য সেলিম আল দীনের ঢাকা থিয়েটারে। সেখানেই হাতেখড়ি, সেখানেই গড়ে ওঠা অভিনেতা হিসেবে। ‘বনপাংশুল’, ‘যৈবতী কন্যার মন’, ‘হাতহদাই’, ‘মার্চেন্ট অব ভেনিস’ নাটকে বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। টেলিভিশনে প্রথম অভিনয় করেছিলেন গিয়াস উদ্দিন সেলিমের নির্দেশনায়। নাটকের নাম ‘স্বপ্নযাত্রা’। এরপর হুমায়ূন আহেমেদের ঈদের নাটক ‘পোকা’য়। সেখানে চরিত্রের নাম ছিল ঘোড়া মজিদ। এ চরিত্রও দর্শকের মনে গেঁথে আছে।
আহমেদ
রুবেল নামে পরিচিত হলেও তার পুরো নাম আহমেদ রাজিব রুবেল। ১৯৬৮ সালের ৩ মে চাঁপাইনবাবগঞ্জ
শহরের রাজারামপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম আয়েশ উদ্দিন। চাঁপাইনবাবগঞ্জেই তার মামার বাড়ি। পিতা-মাতার বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরে হলেও ছোটবেলা থেকেই বেড়ে উঠেছেন ঢাকা শহরে। বসবাস করছিলেন গাজীপুরে। বুধবার সেখান থেকেই রওয়ানা হয়েছিলেন ‘পেয়ারার সুবাস’ সিনেমার
প্রিমিয়ারে। কিন্তু প্রিমিয়ারে অংশ নেয়া আর হয়নি তার।
চলে গেলেন না ফেরার দেশে।
মঞ্চ ও টেলিভিশন নাটকের পাশাপাশি অভিনয় করেছেন সিনেমায়। ১৯৯৩ সালে ‘আখেরী হামলা’র মাধ্যমে রুপালি পর্দায় পা রাখেন মঞ্চ ও টিভি নাটকের এ অভিনেতা। এরপর ‘আজকের ফয়সালা’, ‘মুক্তির সংগ্রাম’, ‘রঙিন রংবাজ’ প্রভৃতি বাণিজ্যিক সিনেমায় অভিনয় করেন। খল চরিত্রে বেশ দাপটের সঙ্গে অভিনয় করেছেন তিনি।
২০০০ সালের পর সিনেমার ক্যারিয়ারে আসে নতুন মোড়। ২০০১ সালে অভিনয় করেন নার্গিস আক্তারের ‘মেঘলা আকাশ’ সিনেমায়। এরপর হুমায়ূন আহমেদের ‘চন্দ্রকথা’, ‘শ্যামল ছাড়া’. সরয়ার ফারুকীর ‘ব্যাচেলর’, নাসির উদ্দিন ইউসুফের ‘গেরিলা’, সাদিক আহমেদের ‘দ্য লাস্ট ঠাকুর’, মাতিয়া বানু শুকুর ‘লাল মোরগের ঝুঁটি’তে অভিনয় করেছেন। সর্বশেষ সিনেমা পেয়ারার সুবাস। ২০১৪ সালে ভারতের নির্মাতা সঞ্জয় নাগ পরিচালিত ‘পারাপার’-এর প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন।
ওটিটির নতুন যুগে নতুন করে তাকে আবিষ্কার করার চিন্তা করেছিলেন অনেকেই। এর মধ্যে কাইজারের দ্বিতীয় পর্বে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে থাকার কথা ছিল তার। কিন্তু সেসব আর হলো না। তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন নাটক ও সিনেমা অঙ্গনের তারকা ও নির্মাতারা। চঞ্চল চৌধুরী ফেসবুকে লিখেছেন, ‘বিশ্বাসই করতে পারছি না যে অভিনেতা আহমেদ রুবেল ভাই আর নেই।’ রেদোয়ান রনি তার ফেসবুক পোস্টে রুবেলের মৃত্যুর খবর জানিয়ে শোক প্রকাশ করেন।
শিমুল ইউসুফ লিখেছেন, ‘ঢাকা থিয়েটার আরো একটি নক্ষত্র হারাল। গেরিলা চলচ্চিত্রের অন্যতম প্রধান চরিত্র শহীদ আলতাফ মাহমুদ চরিত্রে অভিনয় করেন আহমেদ রুবেল। শহীদ আলতাফ মাহমুদের দ্বিতীয় মৃত্যু হলো। আহমেদ রুবেল “বনপাংশুল, যৈবতী কন্যার মন, হাতহদাই, মার্চেন্ট অব ভেনিস নাটকে বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেন। অপ্রত্যাশিত এ চলে যাওয়া আমাদের নির্বাক করে দিয়েছে। তার আত্মার শান্তি কামনা করি।’
আহমেদ রুবেল তার অভিনয় দক্ষতা প্রকাশ করেছেন বহুবার, বহু নাটক ও সিনেমায়। বৃক্ষমানব কিংবা প্রেতের রুমি একসময় অভিনয় করেছেন ফেলুদা, সত্যজিৎ রায়, এমনকি শেখ মুজিবুর রহমানের চরিত্রেও। বহুবার মুগ্ধ করেছেন তিনি দর্শককে। নির্মাতা, সহশিল্পীদের পাশাপাশি তাই আহমেদ রুবেলের দর্শক ও ভক্তরাও তার মৃত্যুতে শোকাহত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার অভিনয় ও সম্ভাবনার কথা বলছেন সাধারণ দর্শকও। তবে তিনি না থাকলেও তার অভিনীত চরিত্রগুলো চিরকাল তার কথা মনে করিয়ে দেবে।