সেলুলয়েডে শঙ্করের জীবনভাষ্য ও মধ্যবিত্তের দহনকাল

গতকাল চলে গেলেন মণি শঙ্কর মুখোপাধ্যায়। ১৯৩৩ সালে জন্ম তার। এক জীবনে বহু লিখেছেন।

তার লেখায় উঠে এসেছে মধ্যবিত্ত জীবন। কাগজ থেকে সেই জীবন এসেছে সিনেমার পর্দায়। তার লেখা থেকে নির্মিত হয়েছে ‘‌জন-অরণ্য’, ‘‌সীমাবদ্ধ’ ও ‘‌চৌরঙ্গী’র মতো বিখ্যাত সিনেমা।

বাঙালি মধ্যবিত্তের যাপিত জীবনের টানাপড়েন, উচ্চাকাঙ্ক্ষা আর নৈতিক স্খলনের গল্পগুলো মণি শঙ্কর মুখোপাধ্যায় তথা ‘শঙ্কর’-এর কলমে পেয়েছে এক অনন্য গদ্যশৈলী। তার এ জীবনবোধ কেবল কাগজের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তৎকালীন কলকাতার আর্থসামাজিক বাস্তবতাকে এতটাই নিপুণভাবে চিত্রায়িত করেছে যে বাংলা চলচ্চিত্রের দিকপাল পরিচালকরা বারবার তার দ্বারস্থ হয়েছেন।

শঙ্করের লেখালেখির ভুবন মূলত কলকাতাকেন্দ্রিক। স্বাধীনতা-উত্তর সমাজে তার রচনাগুলো চলচ্চিত্রকারদের কাছে হয়ে ওঠে সময়নির্ভর, সামাজিক বাস্তবতার প্রস্তুত পাণ্ডুলিপি।

চৌরঙ্গী: হোটেলের অন্দরে এক বিষণ্ন মহাকাব্য

‘চৌরঙ্গী’ উপন্যাসটি অনেকটা লেখকের নিজের জীবনালেখ্য। লেখকের বৈচিত্র্যময় জীবনের সন্ধান মেলে তার ভ্রমণ কাহিনীগুলো পড়লে। অল্প বয়সেই বাবার মৃত্যুর পর জীবিকা হিসেবে প্রাইভেট টিউশনি, পাটের দালালের কেরানি, কোর্টের ব্যারিস্টারের বাবুগীরি এমনকি ক্লিনারের কাজ করেছেন শঙ্কর। যাপিত জীবনের ক্লান্তি নিয়ে একদিন চৌরঙ্গীর কার্জন পার্কে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন তিনি। হঠাৎ করেই লেখকের সঙ্গে পূর্বপরিচিত বায়রন সাহেবের সাক্ষাৎ হয়। বায়রন সাহেবের অনুরোধে অভিজাত ‘শাজাহান’ হোটেলের রিসেপশনে চাকরি পান লেখক। তারপর কাউন্টারের এপাশে দাঁড়িয়ে লেখক উপলব্ধি করলেন নানা দেশের, নানা রঙের মানুষদের অদ্ভুত জীবন। চৌরঙ্গী সেসব অসামান্য গল্পেরই বর্ণনা।

১৯৬৮ সালে ‘চৌরঙ্গী’ কে রূপালী পর্দায় ধারণ করেন পরিচালক পিনাকী ভূষণ মুখোপাধ্যায়। হোটেলের রিসেপশনিস্ট ‘স্যাটা বোস’-এর চরিত্রে মহানায়ক উত্তম কুমারের অবিস্মরণীয় অভিনয় আজও বাঙালির স্মৃতিতে অমলিন। শাহজাহান হোটেলের বিচিত্র সব চরিত্র—করবী গুহ (সুপ্রিয়া দেবী) থেকে শুরু করে মার্কো পোলো বা শঙ্কর নিজে প্রত্যেকেই জীবন্ত হয়ে উঠেছিলেন।

চৌরঙ্গী কেবল একটি হোটেলের গল্প ছিল না; এটি ছিল জাঁকজমকপূর্ণ আলোকসজ্জার আড়ালে ক্ষমতা, প্রেম, প্রতারণা ও সামাজিক স্তরবিন্যাসের জটিল কাব্য। ছবিটির ব্যবসায়িক সাফল্য প্রমাণ করে শঙ্করের গদ্যের সিনেমাটিক এলিমেন্ট বা চলচ্চিত্রগুণ কতটা শক্তিশালী।

সত্যজিতের জহুরি চোখে ‘সীমাবদ্ধ’ ও ‘জনঅরণ্য’

শঙ্করের সাহিত্যের প্রকৃত নির্যাস ও এর সমাজতাত্ত্বিক সংকটকে সবচেয়ে নিপুণভাবে অনুধাবন করতে পেরেছিলেন সত্যজিৎ রায়। তার ‘কলকাতা ট্রিলজি’র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটি স্তম্ভ নির্মিত হয়েছিল শঙ্করের ‘সীমাবদ্ধ’ ও ‘জনঅরণ্য’ উপন্যাস অবলম্বনে।

১৯৭১ সাল আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সময়। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে প্রাণে বাঁচতে লাখো শরণার্থী কলকাতায় আশ্রয় নিয়েছিল। প্রকট হয়ে ওঠা বেকার সমস্যা আর শ্রমিক আন্দোলনে জর্জর কলকাতা হয়ে উঠছিল আরো বিক্ষুব্ধ। সে সময় সাম্যের পরিবর্তে পুঁজিবাদের ক্রমবিকাশ আর প্রতিযোগিতা ও পদোন্নতির লড়াইয়ে এক শিক্ষিত সাধারণ তরুণের পরিবর্তন ও পদস্খলন লিপিবদ্ধ করেছিলেন শঙ্কর, নাম সীমাবদ্ধ।

শঙ্করের সে কাহিনীকে একই নামে সেলুলয়েডে রূপান্তর করেন সত্যজিৎ রায়।

সীমাবদ্ধ মূলত উচ্চাকাঙ্ক্ষী তরুণ শ্যামলেন্দু চ্যাটার্জির করপোরেট সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠার গল্প। নৈতিকতা বনাম সাফল্যের এ দ্বন্দ্বে সত্যজিৎ রায় শঙ্করের মূল উপন্যাসের নির্যাসটুকু চমৎকারভাবে তুলে ধরেছিলেন। বরুণ চন্দের আভিজাত্য আর শাশ্বত কলকাতার করপোরেট চেহারার রূঢ় দ্বন্দ্ব আজও সমসাময়িক। শ্যামলেন্দুর সাফল্যের বিপরীতে তার শ্যালিকা টুটুলের (শর্মিলা ঠাকুর) নীরব প্রত্যাখ্যান আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়—সাফল্য আর সার্থকতা এক জিনিস নয়।

শঙ্করের আরেক গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস ‘জনঅরণ্য’ থেকে নির্মিত জনঅরণ্য। কলকাতা ট্রিলজির শেষ সিনেমা হিসেবে ১৯৭৬ সালে মুক্তি পায় ‘জনঅরণ্য’। সত্তরের দশকের বেকারত্বের হাহাকার আর জীবিকার সন্ধানে একজন সৎ যুবকের অন্ধকার পথে পা বাড়ানো—কলকাতার সেই রূঢ় বাস্তবতাকে সত্যজিৎ ফুটিয়ে তুলেছিলেন শঙ্করের কলমকে পাথেয় করে।

এখানে কেন্দ্রীয় চরিত্র সোমনাথ—এক সাধারণ মধ্যবিত্ত যুবক, যে চাকরি না পেয়ে ব্যবসায় নামে। প্রদীপ মুখোপাধ্যায়ের অভিনয়ে সোমনাথ আজও প্রতিটি সাধারণ যুবকের নিরন্তর সংগ্রামের প্রতীক। নৈতিকতার বিসর্জন দিয়ে যখন সোমনাথকে দালালি করতে হয়, তখন তা কেবল এক যুবকের পরাজয় থাকে না, হয়ে ওঠে গোটা সমাজের অবক্ষয়ের প্রতিচ্ছবি। শঙ্করের কলমে যে নাগরিক বাস্তবতা জন্ম নিয়েছিল, রূপালী পর্দায় তা হয়ে উঠেছে এক বিস্তৃত সামাজিক ভাষ্য। সাহিত্য ও সিনেমা মিলেমিশে তৈরি করেছে মধ্যবিত্ত জীবনের দীর্ঘস্থায়ী দলিল।

আরও