তেলুগু সিনেমার ‘প্যান-ইন্ডিয়া’ জৌলুস ফুরিয়ে যাচ্ছে?

‘পেড্ডি’ একা নয়। গত কয়েক বছরে একাধিক বড় বাজেটের তেলুগু ছবির হিন্দি সংস্করণ হতাশাজনক ব্যবসা করেছে। প্রভাস অভিনীত ‘দ্য রাজা সাব’ হিন্দিতে প্রথম দিনে প্রায় ৫ কোটি রুপি আয় করেছে। রাম চরণের ‘গেম চেঞ্জার’ এবং জুনিয়র এনটিআরের ‘দেভারা: চ্যাপ্টার ১’—দুটিই প্রায় ৭ কোটির কাছাকাছি আয় করেছে। প্রভাসের ‘রাধে শ্যাম’ আরো খারাপ ফল করেছে, প্রায় ৪ কোটি রুপি

হিন্দিতে ডাব করা তেলুগু সিনেমাগুলোর বক্স অফিস আয় সাম্প্রতিক সময়ে ক্রমাগত কমছে। এ প্রেক্ষাপটে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে— ‘প্যান-ইন্ডিয়া’ সিনেমার যুগ কি শেষের পথে? অনেকের কাছে এমনটাই মনে হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে ভারতজুড়ে সফল হওয়ার আকাঙ্ক্ষা এবং পরস্পরকে ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতা অন্ধ্রপ্রদেশ ও তেলেঙ্গানার প্রযোজক-তারকাদের মধ্যে এখনো জাগ্রত। যা তাদের বড় বাজেটের ‘প্যান-ইন্ডিয়া’ প্রকল্পে বিনিয়োগে উৎসাহিত করছে।

সম্প্রতি রাম চরণের ‘পেড্ডি’ হিন্দি বাজারে বড় ধরনের ব্যর্থতার মুখে পড়েছে। গত ১১ জুন মুক্তি পাওয়া ছবিটির হিন্দি সংস্করণ চার দিনের দীর্ঘ সপ্তাহান্তে মাত্র প্রায় ৯ কোটি রুপি আয় করেছে। সে তুলনায় লক্ষ্ম্য ও অনন্যা পাণ্ডে অভিনীত ‘চাঁদ মেরা দিল’ একই সময়ে ১০ কোটির বেশি আয় করেছে।

‘বাবল’ কি ফেটে গেছে?

চলচ্চিত্র বিশ্লেষক কমল নেহতা মনে করেন, বিষয়টি এতটা সরল নয়। তার মতে, আগে যেমন সব সিনেমা সফল হতো না, এখনো তেমনই। তিনি বলেন, প্রায় ১৫ শতাংশ সিনেমা সফল হয়, আর ৮৫ শতাংশ ব্যর্থ হয়। তাই ‘প্যান-ইন্ডিয়া’ ধারণার বাবল বা বুদবুদ ফেটে গেছে বলা ঠিক হবে না। তার বিশ্বাস, ‘পুষ্পা থ্রি’ বা এস এস রাজামৌলি পরিচালিত মাহেশ বাবু ও প্রিয়াঙ্কা চোপড়া অভিনীত ‘বারাণসী’ মুক্তি পেলে আবারো মানুষ বলবে প্যান-ইন্ডিয়া সিনেমা চলছে।

শুধু ‘পেড্ডি’ নয়

‘পেড্ডি’ একা নয়। গত কয়েক বছরে একাধিক বড় বাজেটের তেলুগু ছবির হিন্দি সংস্করণ হতাশাজনক ব্যবসা করেছে। প্রভাস অভিনীত ‘দ্য রাজা সাব’ হিন্দিতে প্রথম দিনে প্রায় ৫ কোটি রুপি আয় করেছে। রাম চরণের ‘গেম চেঞ্জার’ এবং জুনিয়র এনটিআরের ‘দেভারা: চ্যাপ্টার ১’—দুটিই প্রায় ৭ কোটির কাছাকাছি আয় করেছে। প্রভাসের ‘রাধে শ্যাম’ আরো খারাপ ফল করেছে, প্রায় ৪ কোটি রুপি।

অন্যদিকে ‘আরআরআর’, ‘সাহো’ ও ‘কাল্কি ২৮৯৮ এডি’ প্রথম দিনে যথাক্রমে প্রায় ১৯, ২৫ ও ২০ কোটি রুপি আয় করেছে। অর্থাৎ কিছু ছবি সফল হলেও অধিকাংশই প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি।

‘প্যান-ইন্ডিয়া’ কি শুধু ব্র্যান্ডিং?

শিল্পসংশ্লিষ্ট অনেকের মতে, ‘প্যান-ইন্ডিয়া’ আসলে একটি বিপণন কৌশল বা ব্র্যান্ডিং। কারণ দক্ষিণের সিনেমা এর আগেও হিন্দি বাজারে সাফল্য পেয়েছে। আল্লু অর্জুনের ‘পুষ্পা টু’, ‘বাহুবলী’ সিরিজ এবং যশ অভিনীত ‘কেজিএফ ২’ তার বড় উদাহরণ।

আসলে এ প্রবণতা নতুন নয়। কমল হাসানের ‘হিন্দুস্তানি’, রজনীকান্তের ‘রোবট’ ও ‘২.০’ এবং মনি রত্মমের ‘রোজা’ ও ‘অঞ্জলি’ অনেক আগেই হিন্দি দর্শকদের মধ্যে সাড়া ফেলেছিল। তবে সব ডাব করা ছবি যে সফল হবে, এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়।

কনটেন্টই মূল বিষয়

প্রবীণ প্রযোজক সুরেশ বাবু ডগ্গুবতী মনে করেন, দর্শক এমন গল্প খোঁজে যা তাদের আবেগের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করে। তার মতে, ‘বাহুবলী’ মুক্তির সময় মানুষ নতুন ধরনের অভিজ্ঞতা খুঁজছিল, তাই ছবিটি বিপুল সাফল্য পায়। আবার ‘পেড্ডি’ স্থানীয় বাজারে ভালো করলেও জাতীয় পর্যায়ে প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। কারণ এর গ্রামীণ প্রেক্ষাপট হয়তো সারা ভারতের দর্শকের কাছে সমানভাবে গ্রহণযোগ্য হয়নি।

তবে তিনি আশাবাদী যে আঞ্চলিক সিনেমার জাতীয় বিস্তার ভারতীয় চলচ্চিত্র শিল্পের জন্য ইতিবাচক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও টেলিভিশনের কারণে এখন বিভিন্ন ভাষার ছবি সহজেই বৃহত্তর দর্শকের কাছে পৌঁছাচ্ছে। তার মতে, ব্যর্থতা থাকবে, সাফল্যও থাকবে; কিন্তু এই ধারা বন্ধ হবে না।

তিনি উদাহরণ হিসেবে ‘হাম আপকে হ্যায় কৌন..!’, ‘পুষ্পা’ ও ‘কান্তারা’র কথা উল্লেখ করেন। এগুলোর সাফল্যের মূল কারণ ছিল গল্প ও আবেগের শক্তিশালী সংযোগ।

হিন্দি সিনেমার দক্ষিণে অবস্থান

প্রদর্শক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত অক্ষয় রাঠীর মতে, দক্ষিণ ভারতে হিন্দি ছবির সাফল্য এখনো নিয়মিত নয়। তবে ‘জওয়ান’ বা ‘ব্রহ্মাস্ত্র’-এর মতো ছবিগুলো দেখিয়েছে যে সঠিক বিপণন করলে দক্ষিণের বাজারেও বড় সাফল্য পাওয়া সম্ভব।

অন্যদিকে দক্ষিণী তারকা থাকলেই যে কোনো হিন্দি ছবি আঞ্চলিক ভাষার বাজারে সফল হবে, তাও নয়। ‘আদিপুরুষ’ ও ‘ওয়ার ২’ তার প্রমাণ।

‘প্যান-ইন্ডিয়া’ সাফল্যের কোনো নিশ্চয়তা নেই

বিশ্লেষকদের মতে, প্যান-ইন্ডিয়া সাফল্য কখনো নিশ্চিত নয়। শুধু স্থানীয় সুপারস্টারের জনপ্রিয়তা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন শক্তিশালী গল্প, বিনোদনমূল্য এবং এমন বিষয়বস্তু যা ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের দর্শকের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে পারে।

কোমল নেহতা বলেন, ‘আরআরআর’-এর সাফল্যের পেছনে শুধু রাম চরণ বা জুনিয়র এনটিআর নন, পরিচালক এস এস রাজামৌলির অবদানও ছিল বিশাল। তার মতে, একটি সিনেমা ভালো না হলে ‘প্যান-ইন্ডিয়া’ ট্যাগ কোনো কাজে আসে না।

সব মিলিয়ে শিল্পসংশ্লিষ্টদের ধারণা, কয়েকটি বড় ব্যর্থতা ‘প্যান-ইন্ডিয়া’ সিনেমার ধারণাকে শেষ করে দেবে না। বরং ‘রামায়ণ’, ‘বারাণসী’, ‘স্পিরিট’ ও ‘টক্সিক’-এর মতো প্রকল্পগুলোর প্রতি দর্শকের আগ্রহই প্রমাণ করে যে আঞ্চলিক সীমানা পেরিয়ে জাতীয় দর্শকের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।

ভ্যারাইটি ইন্ডিয়া অবলম্বনে

আরও