ছাঁচে ফেলা সম্পর্ককে নতুন করে দেখা

সিনেমার প্রথম দৃশ্যে দেখা যায় চূর্ণী গাঙ্গুলী সুপারশপে ঘরের বাজার করছেন ট্রলি হাতে।

সিনেমার প্রথম দৃশ্যে দেখা যায় চূর্ণী গাঙ্গুলী সুপারশপে ঘরের বাজার করছেন ট্রলি হাতে। হঠাৎই সেখানে মেডিকেল ইমারজেন্সির আভাস পাওয়া যায়। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে চূর্ণী গাঙ্গুলী অর্থাৎ সিনেমার শুভ্রা যাকে অসুস্থ অবস্থায় দেখতে পান তিনি ছিলেন শুভ্রার প্রাক্তন স্বামী। রোগীকে স্ট্রেচারে নেয়া হচ্ছে, রোগীর হাত ধরে আছেন তার বর্তমান স্ত্রী।

প্রাক্তন স্বামীর চরিত্রে অভিনয় করেছেন কৌশিক সেন। তার চরিত্রের নাম সুমন চ্যাটার্জি এবং তার নতুন স্ত্রীর ভূমিকায় অভিনয় করেছেন জয়া আহসান। চরিত্রের নাম মেঘনা মুস্তাফী।

সুমনের সঙ্গে শুভ্রার ছিল দীর্ঘ সংসার। সুখের সংসারই বলা চলে। দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় তারা সংসার করেছেন। তবে সে ঘরে তাদের কোনো সন্তানাদি ছিল না। হাসপাতাল, ডাক্তার, রিপোর্ট থেকে শুরু করে ঘরে আলোচনা। বন্ধুমহলে কানাকানি, কার সমস্যা—এক্ষেত্রে যত সব আলোচনা হতে পারে তার কোনোটিই বাদ যায়নি। স্বাভাবিকভাবেই নারী হৃদয় কোমল, তাই সবার টিপ্পনী-তিরস্কার মেনে নিয়েই চুপ ছিল শুভ্রা। অর্ধাঙ্গিনী অর্থাৎ ‘বেটার হাফ’ হওয়া কি এতই সহজ!

কলকাতার বনেদি ঘরের ছেলে সুমন। ইউনিভার্সিটির প্রফেসর। এমন একজন ভদ্রলোক ‘স্টেরাইল’ হবেন আর আমাদের সভ্য সমাজ তা মেনে নেবে কেন! এ বিষয়ে অজ্ঞতার দরুন স্বাভাবিকভাবেই সবাই মনে করতে থাকল, শুভ্রার মা হওয়ার ক্ষমতা নেই। অথচ শুভ্রা মোটেও স্বামীর সমস্যার কথা বাইরের কাউকে জানতে দিল না। কেননা সে বিশ্বাস করে এতে সুমনের কোনো হাত নেই। দুজনের ভাবনা একবিন্দুতে মিলে গেলে সন্তান ছাড়াও সংসার টিকিয়ে রাখা যায়।

আরেকদিকে সুযোগ পেলে ভদ্রলোক সুমনও বন্ধুমহলসহ চেনা পরিমণ্ডলে প্রচার করে বেড়াত শুভ্রার সমস্যার কারণে সন্তানের বাবা হতে পারছেন না। নিজের শারীরিক খামতি প্রকাশে ‘মেল ইগো’তে বাধত তার। এভাবেই একসময় শুধু নিজের মতামত শুভ্রার ওপর চাপিয়ে দিয়ে দিল সুমন। কিন্তু এভাবে আর কতদিন চালিয়ে নেয়া যায়? সবকিছুরই একটা সীমা থাকে মানুষের মেনে নেয়ার। বিবাহবিচ্ছেদ হলো, জলভরা চোখে ১৫ বছরের সংসার ছাড়ল শুভ্রা। শুরু করল একা বাঁচার লড়াই।

অন্যদিকে আরেকটি চরিত্র মেঘনা মুস্তাফী। সে ঢাকার মেয়ে। সুন্দর রবীন্দ্রসংগীত গাইত। এক অনুষ্ঠানে অধ্যাপক সুমনের সঙ্গে পরিচয়, এরপর পরিণয়। এর মাঝে ছিল অনেক কথা। যেমন থাকে প্রতিটি সম্পর্কেই। নানা গল্প, ছোটগল্প, সংগীত আর পরিস্থিতি তৈরি করে দেয় একটা উপন্যাস।

ঘটনাচক্রে সুমনের অসুস্থতার দরুন মেঘনাকে তার স্বামীর প্রথম স্ত্রীর দ্বারস্থ হতে হয়। ঠিক এ জায়গাটায় এসে একই সঙ্গে ক্রোধ, ঈর্ষা, দরদ, ভালোবাসা সব ছাপিয়ে গল্পটা হয়ে ওঠে দুজন নারীর গল্প। যারা জুড়ে আছে এক পুরুষকে ঘিরে। তারা অর্ধাঙ্গিনী, একজন বর্তমান, একজন অতীত। মেঘনা মূলত সাহায্যের জন্য শুভ্রার দ্বারস্থ হয়। এমনই এক দৃশ্যে শুভ্রা মেঘনাকে উদ্দেশ্য করে বলে, ‘প্রাক্তন স্ত্রী হলো মহাজনের মতো, সে জানে সে তার ক্যাপিটালটা কোনোদিন পাবে না। সুদটা তো তোমাকে চুকিয়ে যেতেই হবে সারাজীবন।’

বাস্তবে এমন হয় কিনা জানা কঠিন, হয়তো হয়। মানুষের গল্পই তো পর্দায় উঠে আসে। দুজনের আলাপে কঠিন সত্যের মুখোমুখি হয় ওরা। সব শেষে শুভ্রা মূলত এসব থেকে মুক্ত হতে চায়। সুমনের বলয়ে সে বাঁচতে চায় না। সেখানে একটি প্রশ্ন তোলে শুভ্রা। হয়তো সব নারীর মনেই একবার করে এ প্রশ্ন আসে—নারী পুরুষের অর্ধাঙ্গিনী হলে পুরুষকেও নারীর অর্ধাঙ্গিনী বলা যায় না কেন?

প্রশ্নের উত্তর সে পায়নি। পেয়েছিল চরম আঘাত, যে আঘাত তার জীবন অন্য খাতে বইয়ে দিয়েছিল। সহচরের সত্য তার কাছে ছিল সংরক্ষিত। প্রাক্তন স্বামীর বর্তমান স্ত্রীকে সে শেষমেশ বলেছিল, ‘এ ইনফরমেশন সেফ রাখার দায়িত্ব এখন তোমার, কারণ তুমি বাকি জীবনটা আমার ফেলে আসা বেডরুমটা শেয়ার করবে।’ সিনেমার শুভ্রা বেশ উদারতা দেখিয়েছিল। তবু এ কথায় ছিল কতকটা অপমান আর ঘৃণার ছায়া। যতটা অপমান শুভ্রা পেয়েছিল সে বাবদ এ হয়তো কিছুই না।

চূর্ণী গাঙ্গুলী, জয়া আহসান ও কৌশিক সেনের সঙ্গে কৌশিক গাঙ্গুলী পরিচালিত এ সিনেমায় আরো অভিনয় করেছেন লিলি চক্রবর্তী, দামিনী বসু, জয়দীপ মুখার্জি প্রমুখ। প্রত্যেকে তাদের নিজের চরিত্রে মানানসই। বিশেষত শুভ্রা চরিত্রটি যেন চূর্ণীর জন্যই লেখা হয়েছিল। বাকিরাও চরিত্রের প্রতি ন্যায়বিচার করেছেন।

কৌশিক গাঙ্গুলী তার প্রায় প্রতিটি সিনেমায়ই মানুষ, মানুষের মন, সম্পর্কের গল্প বলেন। এর সঙ্গে আনুষঙ্গিক হিসেবে আসে সমাজ, বাস্তবতা, চলতি নিয়ম, নীতি ইত্যাদি। কৌশিক প্রশ্ন রাখেন কিংবা তার দর্শকের—পাঁচটা সাধারণ মানুষ—মনে জাগা প্রশ্ন তুলে আনেন। এবারের সিনেমাটি দেখতে গিয়ে মনে হবে আমরা রোজ ভুলে যাই, মেঘনা কিংবা শুভ্রা মূলত প্রথমে একজন মানুষ। তারপর হয় নারী, কন্যা, বোন, প্রেমিকা, প্রণয়িনী, অর্ধাঙ্গিনী, মা কিংবা ধরিত্রী।

আরও