স্বাধীন চলচ্চিত্র বা ইন্ডি ফিল্ম

দর্শক হারাচ্ছে, নাকি নতুনভাবে পথ চলছে?

এ শরতে আন্তর্জাতিক বক্স অফিসের চিত্র খানিকটা ভিন্ন। যা সাধারণত ঘটে এসেছে, এবার তা ঘটেনি।

এ শরতে আন্তর্জাতিক বক্স অফিসের চিত্র খানিকটা ভিন্ন। যা সাধারণত ঘটে এসেছে, এবার তা ঘটেনি। একটা সময় শরতে সাধারণত ইন্ডি সিনেমা (স্বাধীন চলচ্চিত্র) দর্শক টানত। সমালোচকদের প্রশংসিত ও শিল্পমূলক সিনেমার স্বর্ণযুগ বলা যেত তাকে। বছরের এ সময়কে অনেকে ‘অস্কার সিজন’ও বলতেন। এ সময়কে ঘিরে তৈরি হয়েছিল আলাদা এক উৎসবমুখর পরিবেশ। কিন্তু এখন সে আবহ যেন হারিয়ে যাচ্ছে। প্রশ্ন জাগছে, স্বাধীন (ইন্ডি) চলচ্চিত্রগুলো এখন আর হিট হচ্ছে না কেন?

নব্বইয়ের দশকে পুরস্কার মৌসুমকে ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স’ বলেছিলেন হার্ভে ওয়াইনস্টিন। তখন থেকেই বছরের শেষের দিকে স্বল্প বাজেটের শিল্পগুণসম্পন্ন সিনেমা মুক্তির চল শুরু হয়। এরপর প্রতি বছরই এ ধারার সিনেমা মুক্তি পেয়েছে। বিশেষত শরতে সিনেমাগুলো মুক্তি পেত। কিন্তু সে ধারা এখন প্রায় বিলীন। ‘টার’, ‘অ্যানাটমি অব ফল’, ‘অ্যানোরা’র মতো সমালোচক প্রশংসিত সিনেমা দর্শক টানতে ব্যর্থ হয়েছে। অ্যানোরা আয় করেছিল ২ কোটি ডলার। আজকের দিনে সেটা ৫ কোটি ডলারের তুল্য।

২০২৫ সালের শরতে অবস্থা আরো হতাশাজনক। ‘আফটার দ্য হান্ট’, ‘দ্য স্ম্যাশিং মেশিন’, ‘স্প্রিংস্টিন: ডেলিভার মি ফ্রম নোহোয়্যার’ কিংবা ‘ক্রিস্টি’—প্রতিটি সিনেমা প্রত্যাশার তুলনায় ভীষণভাবে ব্যর্থ। এর পেছনের কারণগুলো কী হতে পারে? দর্শক হয়তো জুলিয়া রবার্টসকে কঠিন চরিত্রে দেখতে আগ্রহী নন। কিংবা ডোয়েইন জনসনকে একটা সিরিয়াস চরিত্রে দেখতে চান না। এর মধ্যে কেবল ‘বুগোনিয়া’ সামান্য আশার আলো দেখাচ্ছে। এর আয় দ্বিতীয় সপ্তাহ শেষে ১ কোটি ২৫ লাখ ডলার।

ইন্ডি সিনেমার বর্তমান অবস্থার বেশকিছু কারণ আছে। প্রথমত, স্ট্রিমিং প্লাটফর্ম ও ওটিটির উত্থান ও জনপ্রিয়তা। দর্শক এখন ঘরে বসেই নতুন সিনেমা দেখতে পাচ্ছেন। সিনেমা হলে যাওয়ার প্রয়োজন কমে গেছে। দ্বিতীয়ত, থিয়েটার উইন্ডোর পতন। একটা সময় ছিল যখন সিনেমা হল থেকে সিনেমা দর্শকের বসার ঘরে পৌঁছতে সময় লাগত কয়েক মাস; এখন সেটা কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই চলে আসে। ফলে তাড়াহুড়ো করে হলে গিয়ে দেখার তাগিদ আর নেই। তৃতীয়ত, থিয়েটার অভিজ্ঞতার অবনতি। দর্শক অভিযোগ করেন—হল নোংরা, ট্রেলার দীর্ঘ, দর্শকরা ফোনে ব্যস্ত এবং সিনেমা দেখার আনন্দ হারিয়ে গেছে। এর পেছনেও মূলত ঘরে বসে সিনেমা দেখার প্রবণতা প্রভাব রাখছে। দর্শক হলে কম যাওয়ার কারণে হলের সার্বিক পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে।

চতুর্থত, টেলিভিশন ও ওয়েব সিরিজ নতুন ইন্ডি ফিল্মের পরিসর দখল করেছে। এখন গুণমানসম্পন্ন গল্প দেখা যায় ছোট পর্দায়, ফলে ছোট বাজেটের সিনেমা বড় পর্দায় বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে না।

আরেকটি বড় কারণ নেটফ্লিক্সের মতো স্ট্রিমিং জায়ান্টদের কৌশল। ‘ফ্র্যাংকেনস্টাইন’, ‘ওয়েক আপ ডেড ম্যান: আ নাইভস আউট মিস্ট্রি’ বা ‘আ হাউজ অব ডিনামাইট’ সিনেমাগুলো হলে মুক্তি পেলে বড় হিট হতে পারত। কিন্তু অনলাইনে চলে আসায় তারা ‘ইভেন্ট সিনেমা’ হয়ে উঠতে পারেনি।

চলচ্চিত্র উৎসবগুলোও আর আগের মতো দর্শক টানছে না। সানড্যান্স, কান বা ভেনিসে প্রদর্শিত আলোচিত সিনেমাগুলো মুক্তির পর হারিয়ে যায় বললেই চলে। অথচ এ বছরের সবচেয়ে সফল সমালোচকপ্রিয় সিনেমা পল টমাস অ্যান্ডারসনের ‘ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার’ কোনো উৎসবেই দেখানো হয়নি।

তবুও আশার আলো আছে। যেমন সেলিন সংয়ের ‘ম্যাটেরিয়ালিস্টস’ আধুনিক যুগের প্রেম নিয়ে নির্মিত সাহসী রোমান্টিক কমেডি। অথবা ‘ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার’, যা আমেরিকার সামাজিক বাস্তবতাকে বিদ্যুতের মতো ঝাঁকুনি দেয়। আর অপেক্ষায় আছে জো সাফদির ‘মার্টি সুপ্রিম’। সিনেমাটি রোমাঞ্চকর ও জনপ্রিয়তাও পেতে পারে।

এ সিনেমাগুলোই দেখাচ্ছে ভবিষ্যতের পথ। দর্শক আজও নতুন গল্প, আবেগ ও বিনোদন চায়। কিন্তু শর্ত একটাই, গল্প হতে হবে জীবন্ত, সাহসী ও সংবেদনশীল। স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতাদের এখন কেবল শিল্প নয়, দর্শককে নিয়েও ভাবতে হবে।

আরও