আবেদন হারায়নি লোকগল্প

পর্দায় উপস্থাপনে প্রয়োজন আধুনিকতা নতুন মাত্রা ও প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার

ভারতীয় সিনেমায় পুরাণের ব্যবহার দেখা যায়। বৈদিককালের পুরাণ যেমন আছে, তেমনি বিভিন্ন অঞ্চলের স্থানীয় লোকপুরাণও আছে। হলিউডের জনপ্রিয় স্টুডিও মার্ভেলে ঘুরেফিরে এসেছে নর্স পুরাণের গল্প-চরিত্র। বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের সিনেমাও ব্যতিক্রম নয়। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে এ সময় লোকগল্পের সম্ভাবনা নিয়ে ‘বাংলা চলচ্চিত্রে লোকগল্প’ বিষয়ে ধারাবাহিকের আজ শেষ পর্ব

ভারতে ২০২৩ সালে মুক্তি পায় ‘কানতারা: চ্যাপ্টার ওয়ান’। ঋষভ শেঠি পরিচালিত এ কন্নড় সিনেমা আয় করে প্রায় ৯০০ কোটি রুপি। কানতারা একেবারেই কন্নড় ভাষাভাষীদের লোকপুরাণ অবলম্বনে নির্মিত। এর আগে অ্যামাজন প্রাইমে এসেছিল সিরিজ ‘সুজাল: দ্য ভর্টেক্স’-এর প্রথম সিজন। এ সিরিজের কেন্দ্রে ছিল তামিল লোকগল্প। ‘অসুর’ সিরিজে আছে পুরাণের ব্যবহার। মার্ভেলে ঘুরেফিরে এসেছে নর্স পুরাণের দুই চরিত্র। মার্ভেল কতটা সফল, তা বলার প্রয়োজন হয় না। বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলেও পুরাণ, লোককথা ও উপকথা থেকে এখনো চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়। বাংলাদেশেই বরং সে প্রচলন কমে গেছে। কিন্তু সম্ভাবনা কি নেই?

নব্বইয়ের দশকে যখন স্যাটেলাইট টেলিভিশন ঘরে ঘরে ঢুকতে শুরু করল, তখন বাংলাদেশের দর্শক ভারতীয়, বিশেষ করে বলিউড সিনেমার স্বাদ পেল। প্রেম, বন্ধুত্ব, সামাজিক নানা বিষয় ও নাগরিক গল্প তারা আরো দেখতে চাইল। তবে তখনো স্যাটেলাইট টিভি ঢাকার বাইরে যায়নি। কিন্তু মানুষের মন ও রুচি বদলে গিয়েছিল এবং বদলে যাচ্ছিল। সোহানুর রহমান সোহান নিয়ে এলেন ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’। সালমান শাহ ও মৌসুমী তখন দর্শকের চোখের মণি। দেশের প্রেক্ষাগৃহে সাজসাজ রব। বোঝা গেল, দর্শক এ নতুন ধারায় মজেছে। এরপর সোহানুর রহমান, মতিন রহমান, কাজী হায়াতসহ সবাই এ ধারার সিনেমাই নির্মাণ করতে শুরু করলেন। কমে গেল লোকগল্পের সিনেমা।

এ পরিবর্তন সম্পর্কে মতিন রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নব্বইয়ের দশকে রোমান্টিক-অ্যাকশন সিনেমা দর্শক পছন্দ করেছিল। এর সঙ্গে কপিরাইট এনে রিমেক করারও উদাহরণ দেখেছি। পার্শ্ববর্তী দেশের সিনেমার একটা প্রভাব ছিল। লোকগল্পের সাধারণ ন্যারেশন, সাধারণ উপস্থাপনের আবেদন দর্শকের কাছে আর ছিল না।’

এর মধ্যেও লোকগল্পের সিনেমা কিছুটা টিকে ছিল। কিন্তু সেখানে নির্মাতাদের নতুন কিছু করার তেমন আগ্রহ দেখা যায়নি। তারা আগের ফর্মুলায়ই সিনেমা নির্মাণ করে গেছেন। বদলে যাওয়া দর্শক চাহিদার সঙ্গে মিল রেখে তারা লোকগল্পের সিনেমাকে নতুনভাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেননি। দেলোয়ার জাহান ঝন্টু এর মধ্যেও নাগ-নাগিনীর সিনেমা নির্মাণ করে গেছেন। ২০০১ সালে তার পরিচালনায় মুক্তি পায় ‘দুই নাগিন’, এমনকি ২০১১ সালেও তার পরিচালনায় মুক্তি পায় ‘সাথী হারা নাগিন’।

এ শতকে লোকগল্প নিয়ে নির্মিত একমাত্র সিনেমার উদাহরণ হিসেবে সামনে আসে এ কে সোহেল পরিচালিত ‘খায়রুন সুন্দরী’। ২০০৪ সালে মুক্তি পাওয়া এ সিনেমায় খায়রুন নেসা চরিত্রে অভিনয় করেছেন মৌসুমী। তার স্বামী ফজল চরিত্রে ছিলেন ফেরদৌস আহমেদ। মুক্তির বছর রেকর্ড ব্যবসা করা সিনেমাটি পশ্চিমবঙ্গে রিমেক হয়। মমতাজের গাওয়া ‘খায়রুন লো’ আজও জনপ্রিয়। কিন্তু ‘খায়রুন সুন্দরী’ কতটা ‘লোকগল্প’ তা নিয়ে তর্ক হতে পারে। কেননা লোকগল্প বা লোকপুরাণ বলতে যেসব গল্প আমাদের চেনা, খায়রুন সে রকম গল্প নিয়ে নির্মিত নয়। তবে গল্পটি গ্রাম-গঞ্জে পরিচিত, সে হিসেবে লোকগল্পের কাতারে রাখা যায়।

‘হাওয়া’র দৃশ্যে নাজিফা তুষি

এরপর দীর্ঘ বিরতি। ২০২২ সালে মুক্তি পায় মেজবাউর রহমান সুমন পরিচালিত ‘হাওয়া’। এ সিনেমার শেষ দৃশ্যে নায়িকার সাপে পরিণত হওয়ার বিষয়টিকে কেউ মনসা, কেউ বেহুলার সঙ্গে তুলনা করেছেন। হাওয়া নিয়ে নানা লেখালেখি হয়েছে। মেজবাউর রহমান সুমন সরাসরি রেফারেন্স দেননি। তবে চরকিতে আসা তার ‘কোথায় পালাবে বলো রূপবান’ সরাসরি ‘রূপবান’কে রেফারেন্স হিসেবে নিয়েছে। অর্থাৎ অন্তত দুটো কনটেন্টে এ প্রজন্মের চলচ্চিত্র নির্মাতা সুমন লোকগল্পের রেফারেন্স এনেছেন।

নিজের কাজে লোকগল্পের রেফারেন্স প্রসঙ্গে সুমন বলেন, ‘যেকোনো অঞ্চলের লোকগল্প সে অঞ্চলের আর্টের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সেটা সংগীত, সাহিত্য, চিত্রকর্ম বা সিনেমা যেটাই হোক। সারা পৃথিবীতে মানুষের গল্প আসলে একই। কিন্তু অঞ্চলভেদে তা আলাদা। এক্ষেত্রে প্রকৃতি, জলবায়ু প্রভাব ফেলে। মরুর লোকগল্পে মরুঝড় থাকবে, বাংলার উপকূলের গল্পে থাকবে পানি। আমার কাজে আমার অঞ্চলের লোকগল্পকে সবসময়ই রাখতে চেয়েছি।’

মেজবাউর রহমান সুমনের সিনেমা ছাড়া টেলিভিশন ফিকশনেও লোকগল্পের ব্যবহার আছে। হাওয়ায় লোকগল্পের রেফারেন্সটা ওপেন এন্ডেড হলেও তিনি ওটিটিতে এনেছিলেন কোথায় পালাবে বলো রূপবান (২০২২)। তিনি বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে রূপবানের রেফারেন্স রেখে একটি প্রশ্ন তুলেছিলেন, রূপবানের কোলের শিশুটি কার?

তাহলে এ সময়েও লোকগল্প ভিত্তি করে কনটেন্ট তৈরি সম্ভব? এমন প্রশ্নের উত্তরে সুমন বলেন, ‘আগেও যে সিনেমাগুলো হয়েছিল, সেখানে কেবল গল্পটাই আনা হয়েছে; সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতির বিষয়গুলো আসেনি। এখন যদি সিনেমা নির্মাণ হয়, তাহলে জনপ্রিয় গল্পের আড়ালে থাকা সমাজ, রাজনীতি বা অর্থনীতির প্রসঙ্গ ধরে সিনেমা নির্মাণ করতে হবে।’

কাছাকাছি মত নির্মাতা গিয়াসউদ্দিন সেলিমেরও। ২০২৪ সালে তার পরিচালনায় মুক্তি পায় ‘কাজলরেখা’। মৈমনসিংহ গীতিকা অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে সিনেমাটি। মৈমনসিংহ গীতিকা বাংলাদেশের নিজস্ব ‘ব্যালাড’। এর মধ্যে বেশকিছু আখ্যান আছে। সেসবের মধ্যে কাজলরেখা তুলনামূলক বেশি রূপকথা ঘেঁষা। সিনেমাটি নিয়ে দর্শকের মধ্যে আগ্রহ দেখা গিয়েছিল। এছাড়া গিয়াসের নির্মাণে আধুনিকতা ছিল। ফলে ভিজুয়াল প্রেজেন্টেশনের জন্যও সিনেমাটির প্রতি দর্শক আগ্রহী হয়েছেন।

লোকগল্প অবলম্বনে নির্মিত সিনেমার সম্ভাবনা প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে সেলিম বলেন, ‘কোন সিনেমা দর্শক গ্রহণ করবেন, সেটা বলা মুশকিল। কাজলরেখার অন্তর্নিহিত বিষয়টা আমি সিনেমায় আনার চেষ্টা করেছি। এমনিতে লোকগল্পের আবেদন কোনো দেশেই কখনো ফুরাবে বলে মনে হয় না। তবে তার উপস্থাপনে নতুন মাত্রা আনতে পারলে দর্শক তা গ্রহণ করবে।’

মতিন রহমান মনে করেন, এ সময়ে সিনেমার ক্ষেত্রে ভিজুয়াল ইফেক্টের গুরুত্ব খুব বেশি। তিনি বৈশ্বিক অন্যান্য ইন্ডাস্ট্রির উদাহরণ দিয়ে বলেন, ‘রামায়ণ কিন্তু মানুষ দেখছে। সেটা রাজনীতি ও কূটনীতির গল্প। পাশাপাশি প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার সেখানে থাকে। সিনেমার গল্প বলার ধরনটা আধুনিক। আমাদের দেশে এখন যদি লোকগল্প নিয়ে সিনেমা নির্মাণ করতে হয়, তাহলে প্রযুক্তিকে সঙ্গে নিয়ে এগোতে হবে।’

আরও