১৯৮০-র দশকের ইন্ডিয়ানার এক ছোটখাটো ছিমছাম শহর হকিংস নিয়ে আমাদের গল্প। প্রত্যেকটা শহরেরই নিজস্ব কিছু গল্প থাকে। কোনো গল্প ডায়রির পাতায় দিনলিপি হয়ে থাকে। হকিংসের দিনলিপি মূলত দুটো জগতের মাঝখানে ঝুলে ছিল দীর্ঘ দশটি বছর। হকিংস কেবল মানচিত্রের একটা বিশেষ জায়গা ছিল না, ছিল এক মহাজাগতিক ল্যাবরেটরি যেখানে মানবীয় আবেগ আর পাতালের অন্ধকার একে অপরের মুখোমুখি হয়েছিলো।
২০১৬ সালে যখন প্রথম বার স্ট্রেঞ্জার থিংসের অদ্ভুত সুর বেজে উঠেছিলো, তখন আমরা কেউই ভাবিনি দীর্ঘ দশটা বছর চারটা বাচ্চার সাইকেলের পেছনে পেছনে আমরাও অজানার পথে পাড়ি দেব। সিরিজের গল্প ঘুরেছে পাঁচ বছর। তবে পাঁচ বছরের বিশাল ডালপালা মেলা গল্পের পর্দা নামতে সময় গেলো দশ বছর। হাসি-কান্না-ভয় আর অপেক্ষা নিয়ে দর্শকেরও কেটে গেল এই সময়টা।
আমাদের, যাদের বেড়ে ওঠা নব্বইয়ের দশকে, ডিসেম্বরের বার্ষিক পরীক্ষা শেষে তিন গোয়েন্দা পড়ার অনুমতি পেতাম। আমরা কতকটা তিন গোয়েন্দার ছায়া খুঁজে পাই, নস্টালজিয়ায় ডুবে যাই হকিংয়ের ছেলেমেয়েদের এই সরল বন্ধুত্বের গল্পে। মাইক, উইল, ডাস্টিন আর লুকাসের গল্প যেন ডাফার ব্রাদার্সের নির্মাণশৈলীতে হয়ে ওঠে আমাদের গল্প।
সিরিজে উইল বায়ার্স। ছবি: নেটফ্লিক্স
গল্পের শুরুটা ছিল খুব সাধারণ। মাইকের বাসার বেজমেন্টে বন্ধুদের সঙ্গে ডানজেনস অ্যান্ড ড্রাগনস খেলে বাড়ি ফিরছিল উইল বায়ার্স। কোনোরকম ক্লু না রেখেই পথের মাঝখান থেকে উইল বেমালুম হাওয়া হয়ে গেল। এদিকে উইলের মা জয়েসের মনে হলো তার সন্তান লাইটের মাধ্যমে কমিউকেট করছে তার সাথে। ঘরভর্তি ক্রিসমাস লাইট জ্বালিয়ে ছেলের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করতে থাকে জয়েস। পুলিশের ইনভেস্টিগেশন টিম আর আশেপাশের মানুষ ভাবতে থাকে পুত্রশোকে জয়েসে মাথায় গন্ডগোল দেখা দিয়েছে।
বন্ধুদের রহস্যের জট খোলার চেষ্টা, কোডের মাধ্যমে কমিউনিকেট করা, ওয়াকিটকি আর সাইকেল নিয়ে দৌরাত্ম যেন সিজন ওয়ানে কেট বুশের ক্ল্যাসিক ‘রানিং আপ দ্যাট হিল’ গানটার যথার্থতা বজায় রাখল। উইলের বন্ধু মাইক, ডাস্টিন আর লুকাস মিলে জঙ্গলে উইলকে খুঁজতে গিয়ে দেখা পেলো এক অদ্ভুত মেয়ের, যার নাম বেশ সিম্বোলিক। ‘এল’ অর্থাৎ ইলেভেন তার নাম। তার মাথায় ছোটছোট করে কাটা চুল। সে এগো অ্যান্ড ওয়াফেলস খায়, আর চিরাচরিত মেয়েসুলভ কোনো আচরণ জানে না।
ইলেভেন চরিত্রে মিলি ববি ব্রাউন
পরবর্তীতে জানা গেল হকিংস ন্যাশনাল ল্যাবের ড. মার্টিন ব্রেনার সবার অলক্ষ্যে নিষিদ্ধ এক প্রজেক্ট চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রজেক্টের অংশ হিসেবে ড. ব্রেনার ইলেভেনকে মিডিয়াম বানিয়ে নানারকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন। এল পালিয়েছে কেননা ল্যাবে ঘটেছে ভয়ঙ্কর বিপর্যয়। এল নিজের সাইকিক শক্তি দিয়ে নিজের অজান্তেই খুলে দিয়েছে প্যারালাল ইউনিভার্সের দরজা। যে জগতের সবটাই আমাদের পৃথিবীর মতন। তবু অন্ধকার, বিষাক্ত বাতাস, আর পচা-গলা সে দুনিয়া থেকে অদ্ভুত সব দানব বেড়িয়ে আসে। যে দানবের আক্রমণ থেকে কারোর রেহাই নেই।
সিরিজে এ অল্টারনেটিভ ওয়ার্ল্ড কে আখ্যায়িত করা হয় ‘আপসাইড ডাউন’ এবং এই দানবদলকে ‘ডেমোগর্গন’ নামে। ডেমোগর্গনকে মূলত নিয়ন্ত্রণ করতো মাইন্ড ফ্লেয়ার। মাইন্ড ফ্লেয়ার তার সাইকিক শক্তি দিয়ে ভিকটিমের সব স্মৃতির নিয়ন্ত্রণ নেয়। ভিকটিমকে হিপনোটাইজ করে আর পরবর্তীতে নিজের সুবিধামতো চালিত করে।
মাইন্ড ফ্লেয়ারের ধারণা আসে ডানজেনস অ্যান্ড ড্রাগনস (D & D) থেকে। মাইন্ড ফ্লেয়ার কালো ধোঁয়া বা ছায়ার তৈরি বিশাল অক্টোপাস কিংবা মাকড়সার মতো আকৃতির আকাশছোঁয়া দানব অর্থাৎ ‘শ্যাডো মনস্টার’। মাইন্ড ফ্লেয়ার একক সত্ত্বা নয় বরং একটা সামষ্টিক শক্তি বা ‘হাইভ মাইন্ড’। আপসাইড ডাউন জগতের নিয়ন্ত্রণ করে হাইভ মাইন্ড, ডেমোগর্গন মূলত তার আর্মি এবং ভেকনা মাইন্ড ফ্লেয়ারের আরেক বাস্তবিক রুপ যে কমান্ড অপারেট করে।
ভেকনা বা হেনরি ক্রিল বা মিস্টার হোয়াটসইট কোনো দানব নয় বরং একটা সাধারণ মানুষ। ভেকনা মূলত মানুষের ভেতর লুকিয়ে থাকা এক চরম অন্ধকারের অস্বিত্বের জানান দেয়। হেনরি ক্রিল থেকে ভেকনা হয়ে ওঠার সেই করুণ গল্প মনে করিয়ে দেয় যে, ঘৃণা আর একাকিত্ব একটা মানুষকে কতটা ভয়ঙ্কর করে তুলতে পারে। ঘড়ির সেই ‘টিক-টিক’ শব্দ দিয়ে জানান দিত যে সে আসছে। ভেকনা ছিল এমন এক শত্রু, যাকে শুধু গায়ের জোরে নয়, বরং মনের জোর দিয়ে হারাতে হতো। সে ছিল অন্ধকারের সেই প্রতিচ্ছবি।
ভেকনা চরিত্রে জেমি ক্যাম্পবেল। ছবি: দ্য হলিউড রিপোর্টার
শৈশব থেকেই হেনরি ছিল নিষ্ঠুর। হেনরির শৈশবের সব স্মৃতি ছিল আবছা যেন ‘এ ওয়ার্ল্ড থাউজেন্ড অফ মেমোরিজ’-এর মতো। খেলার ছলে হেনরি এক গুহায় ঢুকে পড়ে এবং দেখে একজন রক্তাক্ত লোক, যে ভয় পেয়ে হেনরির হাতে গুলি করে। নিজেকে বাঁচানোর জন্য হেনরি একটা পাথর তুলে আহত লোকটাকে হত্যা করে। একপর্যায়ে কৌতুহলবশত লোকটির ব্রিফকেস খুলে হেনরি এক অদ্ভুত উজ্জ্বল পাথরের সন্ধান পায়। যে পাথর থেকে হেনরি সাইকিক শক্তির অধিকর্তা হয়। মূলত লোকটি ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের একজন স্পাই। ঘটনার পর হেনরি তার সাইকিক পাওয়ার উপলব্ধি করে। হেনরির সে তার মা,বোন কে মেরে ফেলে এবং তার প্রভাবে হেনরির বাবা ভিক্টর পাগল হয়ে যায়।
হেনরি ড. মার্টিন ব্রেনারের প্রথম ‘চাইল্ড টেস্ট সাবজেক্ট’ ছিল হেনরি, যাকে নাম্বারিং করা হয় ০০১ নামে। ড. ব্রেনার হেনরির থেকে রেপ্লিকেট করতে থাকে বাকী শিশুদের। মূলত এল ছিল সাধারণ বাচ্চা, যার শরীরে হেনরির শরীরের রক্ত প্রবাহিত করে তাকে শক্তিশালী করে। এল মূলত একসময় ল্যাবে সাইকিক শক্তি ব্যবহার করে অনিচ্ছাকৃত ভাবে হেনরিকে আপসাইড ডাউন জগতে নির্বাসিত করে ও আপসাইড ডাউন জগতের দরজা খুলে দেয়। ক্রমাগত বিষাক্ত আবহাওয়া ও নানান বিবর্তনের মধ্যে হেনরি ভয়ানক মনস্টার ভেকনায় পরিণত হয়। ভেকনার চরিত্রে জেমি ক্যাম্পবেল বোয়ার অসাধারণ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন।
ছবি: এএইচ ম্যাগাজিন
উইলের নিখোঁজ রহস্য উন্মোচনের অফিশিয়াল দায়িত্ব পান পুলিশ চীফ জিম হপার। পরে একসময় উইল ঠিকই ফিরে আসে তবে মাইন্ড ফ্লেয়ার তার পিছু ছাড়ে না। এল আশ্রয় পায় হপারের কাছে। পরিবার হারানো হপার ইলেভেন কে মেয়ের মতো যত্নে রাখে। ইলেভেন ড. মার্টিন ব্রেনার কেই বাবা হিসেবে জানতো,পরবর্তীতে সে জানতে পারে তার মা টেরি সম্পর্কে। ইলেভেন অবশেষে জানতে পারে তার নাম আসলে ‘জেরি’ এবং সে ও তার মা সিআইএ-র প্রজেক্ট ‘এমকে-আল্ট্রা’র গিনিপিগ।
গল্প এগোতে থাকে। তাদের দলে ম্যাক্স মেফিল্ড নামে এক পাগলাটে মেয়ের আগমন ঘটে। ভীষণ রগচটা স্বভাব তার। ডাস্টিনের বন্ধু হিসেবে আবির্ভাব হয় ওদের চেয়ে বয়সে খানিকটা বড় স্টিভ হ্যারিংটন এর। ম্যাক্সের ভাই বিলি কিংবা ডাস্টিনের বন্ধু এডি মনসন ভয়ানকভাবে প্রাণ হারায়।ন্যান্সি-জনাথন-স্টিভের ত্রিকোণ প্রেমের গল্প কতরকম বাঁক নেয়। বাচ্চারা বড় হতে থাকে। তাদের অনুভূতি বদলায়, কর্কশ কন্ঠস্বর প্রখর হয়।
গল্পে পাওয়া যায় নতুন বাঁক।রাশিয়ানরা সুড়ঙ্গ খুঁড়ে আবারও আপসাইড ডাউনের গেট খোলার চেষ্টা চালালো। ইলেভেন ওরফে এল কে বাঁচাতে গিয়ে বিলি নিজেকে উৎসর্গ করলো। আপাতদৃষ্টিতে মনে হলো মাইন্ড ফ্লেয়ার মৃত কিন্তু সে আবারও বিরতির পর ভেকনাকে নিয়ে ফিরলো।
গল্প তার মতো এগিয়ে চললো। ম্যাক্স কোমায় চলে গেলো। লুকাসের নার্ড আর বুদ্ধিমতী বোন এরিকাও মারকুটে দলে ভীড়ে গেলো অলিখিতভাবে।
ভেকনা মূলত ভিকটিমের ট্রমা বা দুঃখের স্মৃতিকে কাজে লাগিয়ে তাকে শিকার বানায়। মানসিকভাবে যারা দূর্বল ভেকনা তাদের সহজে টার্গেট করে। ফাইনাল প্ল্যান হিসেবে ভেকনা বারো জন শিশুকে অপহরণ করে আপসাইড ডাউন জগতে নিয়ে যায়। ইতিমধ্যে জানা যায় ম্যাক্স কোমায় ছিল না, ছিল ভেকনা বা হেনরি ক্রিলের কোনো এক মেমোরিতে। ম্যাক্স শেষতক ফিরে আসে। ভেকনা মরিয়া হয়ে দুটো ওয়ার্ল্ড ওভারল্যাপ করে সব ধ্বংস করে ফেলতে চায়। শেষতক ভেকনা বা হাইভ মাইন্ড তাদের প্ল্যানে ব্যর্থ হয়।আপসাইড ডাউন অবশেষে রাইটসাইড আপে পরিণত হয়।
এল নিজেকে আত্মাহুতি দেয়। তার পরিবর্তে পৃথিবী সুরক্ষিত হয়। মাইক বিশ্বাস করে এল হয়তো কোথাও একটা রৌদ্রজ্জ্ব্যল পৃথিবীতে দুটো ঝর্ণার পাশে হেঁটে বেড়াচ্ছে, সে হয়তো কোথাও আছে। এখানে নয়, অন্য কোথাও। আবার বসন্তের ছুটি শুরু হচ্ছে, হপার আর জয়েস শেষমেশ না হওয়া ডেটটা সম্পূর্ণ করে ফেলছে, হলি আর ডেরিক বন্ধু হয়ে গেছে, লুকাস আর ম্যাক্স প্রেম করছে,ডাস্টিন বরাবরের মতন ভালো ফলাফল করে যাচ্ছে,তবু মাইকের গল্প যেন অসম্পূর্ণ। এল কে ছাড়া মাইক অসম্পূর্ণ।
স্ট্রেঞ্জার থিংসের বিথ্যাত সেই ছবি, সাইকেলে চার বন্ধু। ছবি: নেটফ্লিক্স
গল্পের শুরু হয়েছিলো দশ বছর আগে যে বেজমেন্টে, শেষও একই জায়গায় হয়ে যায়। মাইক চেয়ে দেখে তাদের শৈশব ফুরিয়েছে। তাদের স্থান দখল করেছে হলি ও তার বন্ধুরা। ডানজেনস অ্যান্ড ড্রাগনস খেলে আবারও সব বন্ধু বাড়ি ফিরে গেছে, ঠিক দশ বছর আগের মতো। এই সময়টা, এই দৃশ্যগুলো দেখে মনে পড়ে জীবনানন্দ দাশের সেই লাইন—কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে....
তাই মাইকের দুচোখে অনাগত দিনের স্বপ্ন। হপার তাকে বলেছিলো, ‘যা ঘটেছে সেখানে তোমার কোনো দোষ নেই।