এশিয়ার নির্মাতারা বদলে দিচ্ছেন বৈশ্বিক চলচ্চিত্রের ভাষা

একসময় বিশ্ব সিনেমার কেন্দ্র ছিল হলিউড। চলচ্চিত্রের হালচাল, এর ভবিষ্যৎ বোঝার জন্য নজর দিতে হতো হলিউডে।

এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে বিশ্বের চলচ্চিত্র ভাষা মূলত লিখেছে তারা। গল্প বলার ধরন থেকে শুরু করে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, তারকা তৈরির কৌশল থেকে বৈশ্বিক বিপণন, সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু ছিল হলিউড। ‘স্টার ওয়ার্স’, ‘টাইটানিক’ কিংবা ‘মার্ভেল সিনেমাটিক ইউনিভার্স’ এসেছে তাদেরই হাত ধরে। কিন্তু সে ধারায় পরিবর্তন এসেছে গত দুই দশকে। হলিউড এখনো শক্ত অবস্থানে, তবে ট্রেন্ড সেটারে পরিণত হচ্ছে এশিয়ার সিনেমা।

এশীয় সিনেমার উত্থানের ক্ষেত্রে দক্ষিণ কোরিয়ার নাম আসবে সবার আগে। ১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে দেশটি চলচ্চিত্র, টেলিভিশন ও সংগীত খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ শুরু করে। পরবর্তীকালে এ সাংস্কৃতিক বিস্তারই বিশ্বের কাছে পরিচিত হয় ‘হাল্লিউ’ বা ‘কোরিয়ান ওয়েভ’ নামে। বং জুন-হো, পার্ক চান-উক, লি চ্যাং-দংয়ের মতো নির্মাতারা ধীরে ধীরে সমসাময়িক বিশ্ব সিনেমার সবচেয়ে সম্মানিত পরিচালকদের কাতারে জায়গা করে নেন। এ যাত্রার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত আসে ২০২০ সালে।

বং জুন-হোর ‘প্যারাসাইট’ জিতে নেয় অস্কার। ইংরেজি ভাষার বাইরে এটিই প্রথম অস্কার জেতে। একই আসরে সেরা পরিচালক, সেরা মৌলিক চিত্রনাট্য ও সেরা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র—তিন বিভাগেও বিজয়ী হয় প্যারাসাইট। প্রচলিত ধারণা ছিল, সাবটাইটেল-নির্ভর চলচ্চিত্র কখনো মূলধারার বৈশ্বিক দর্শকের কাছে পৌঁছতে পারে না। প্যারাসাইট সে ধারণা ভেঙে দেয়। চলচ্চিত্রটি মূলত দক্ষিণ কোরিয়ার শ্রেণীবৈষম্যের গল্প বলে। কিন্তু তার মানবিক সংকট, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও সামাজিক বৈপরীত্য পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি দেশের দর্শকের কাছেই পরিচিত বাস্তবতা হয়ে ওঠে।

আরেকটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো কোরিয়ান নির্মাতারা সহজে কোনো একটি নির্দিষ্ট ঘরানার মধ্যে নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখেন না। একটি চলচ্চিত্র একই সঙ্গে কমেডি, থ্রিলার, ট্র্যাজেডি ও সোশ্যাল স্যাটায়ার হতে পারে এবং আশ্চর্যের বিষয়, তা কখনই বিচ্ছিন্ন মনে হয় না। এ ঘরানা-মিশ্রণের দক্ষতাই আজ বিশ্বের বহু নির্মাতাকে নতুনভাবে ভাবতে শিখিয়েছে।

এর পরই আসবে জাপানের নাম। বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে আকিরা কুরোসাওয়ার মতো প্রভাবশালী পরিচালকের সংখ্যা হাতেগোনা। ১৯৫৪ সালে নির্মিত তার ‘সেভেন সামুরাই’ অ্যাকশন সিনেমার ভাষাই বদলে দিয়েছিল। সাতজন যোদ্ধার একটি দলকে ঘিরে নির্মিত এ চলচ্চিত্রের গল্প, চরিত্র নির্মাণ এবং যুদ্ধের দৃশ্য এতটাই প্রভাব ফেলেছিল যে ছয় বছর পর হলিউড একই গল্পকে পশ্চিমা প্রেক্ষাপটে রূপ দেয় ‘দ্য ম্যাগনিফিসেন্ট সেভেন’ নামে।

কুরোসাওয়ার প্রভাব সেখানেই শেষ হয়নি। তার ‘ইয়োজিম্বো’ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ইতালীয় নির্মাতা সার্জিও লিওনে নির্মাণ করেন ‘আ ফিস্টফুল অব ডলারস’, যা পরবর্তীকালে স্প্যাগেটি ওয়েস্টার্ন ঘরানার অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে। আবার ‘দ্য হিডেন ফোর্টরেস’-এর গল্প বলার কাঠামো ও চরিত্র বিন্যাস জর্জ লুকাসের স্টার ওয়ার্স নির্মাণে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। লুকাস একাধিকবার তা স্বীকার করেছেন।

কেবল লাইভ অ্যাকশন নয়, অ্যানিমের জন্য বিখ্যাত জাপান। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অবদান হায়াও মিয়াজাকি ও তার স্টুডিও জিবুরির। ২০০৩ সালে ‘স্পিরিটেড অ্যাওয়ে’ অস্কারে সেরা অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্র বিভাগে পুরস্কার জিতে ইতিহাস সৃষ্টি করেন মিয়াজাকি। এছাড়া জাপানি হরর সিনেমাও বিশ্ব চলচ্চিত্রকে নতুন ভাষা শিখিয়েছে। ‘রিঙ্গু’ কিংবা ‘জু-অন’-এর মতো চলচ্চিত্র দেখিয়েছে, ভয় সৃষ্টি করতে অতিরিক্ত রক্তপাতের প্রয়োজন হয় না। ধীরগতির নির্মাণ, নীরবতা, মনস্তাত্ত্বিক অস্বস্তি ও অদৃশ্য আতঙ্ক—এ উপাদানগুলোই পরবর্তীকালে বিশ্বের অসংখ্য হরর চলচ্চিত্রে অনুসরণ করা হয়েছে।

এশীয় সিনেমার প্রভাব নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে হংকংকে বাদ দেয়া অসম্ভব। বিশেষ করে অ্যাকশন চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে। হলিউডের অ্যাকশনকেও একসময় প্রভাবিত করেছে হংকংয়ের সিনেমা। পরিচালক জন উ বন্দুকযুদ্ধকে এমন এক নান্দনিক রূপ দিয়েছিলেন, যা পরে ‘ফেইস/অফ’, ‘মিশন ইম্পসিবল-টু’সহ অসংখ্য হলিউড চলচ্চিত্রে প্রভাব ফেলেছে। অন্যদিকে ব্রুস লি শুধু মার্শাল আর্টকে বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় করেননি, তিনি এশীয় অভিনেতাদের জন্য আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রে নতুন দরজাও খুলে দিয়েছিলেন। হলিউডের ‘দ্য ম্যাট্রিক্স’, ‘কিল বিল’ কিংবা সাম্প্রতিক ‘জন উইক’ সিরিজের অ্যাকশন ভাষার মধ্যেও হংকং সিনেমার প্রভাব স্পষ্টভাবে দেখা যায়।

এ আলোচনায় অনিবার্যভাবেই আসবে ভারতের কথা। বিশ্বের অনেক দর্শকের কাছেই ভারতীয় সিনেমা মানেই বলিউড। তবে বাস্তবে হিন্দির পাশাপাশি তেলেগু, তামিল, মালয়ালম, কন্নড়, বাংলা, পাঞ্জাবি, ভোজপুরিসহ বিভিন্ন ভাষায় চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়। এ বহুমাত্রিকতার কারণেই ভারত প্রতি বছর বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ চলচ্চিত্র উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে বিবেচিত হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ভারতীয় সিনেমা আন্তর্জাতিক পর্যায়েও নতুনভাবে আলোচনায় এসেছে। এসএস রাজামৌলির ‘আরআরআর’ বিশ্ব দর্শকের সামনে ভারতীয় চলচ্চিত্রের কারিগরি দক্ষতা, ভিজুয়াল কল্পনা এবং আবেগঘন গল্প বলার ক্ষমতাকেও নতুনভাবে তুলে ধরে। চলচ্চিত্রটির গান ‘নাটু নাটু’ ২০২৩ সালে অস্কারে সেরা মৌলিক গান বিভাগে পুরস্কার জিতে ইতিহাস গড়ে।

আজ চীন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ চলচ্চিত্র বাজার। কিছু বছরে দেশটির অভ্যন্তরীণ বক্স অফিস আয় উত্তর আমেরিকার বাজারকেও ছাড়িয়ে গেছে। ‘উলফ ওয়ারিয়র-টু’, ‘দ্য ব্যাটেল অ্যাট লেক চ্যাঞ্জিন’ কিংবা অ্যানিমেশন ‘নি ঝাঁ’ প্রায় পুরোপুরি দেশীয় বাজার থেকেই কয়েকশ কোটি ডলারের সমপরিমাণ আয় করেছে। অবশ্য চীনা সিনেমা অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী হলেও দক্ষিণ কোরিয়া বা জাপানের মতো একই মাত্রায় বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক প্রভাব এখনো তৈরি করতে পারেনি। তবে প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ, বৃহৎ বাজেট ও ভিজুয়াল ইফেক্ট ব্যবহারে চীনা চলচ্চিত্র শিল্প দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে।

এশিয়ার প্রভাবশালী চলচ্চিত্রের তালিকায় থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়ার নাম তুলনামূলক কম উচ্চারিত হলেও তাদের অবদান কম নয়। থাইল্যান্ডের পরিচালক অ্যাপিচাটপং উইরাসেতাকুল সমসাময়িক আর্টহাউজ সিনেমার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্মাতা। তার ‘আংকেল বুনমি হু ক্যান রিকল হিজ পাস্ট লাইভস’ ২০১০ সালে কান চলচ্চিত্র উৎসবে পাম ডি’অর জয় করে। অন্যদিকে ইন্দোনেশিয়ার ‘দ্য রেইড’ ও ‘দ্য রেইড টু’ আধুনিক অ্যাকশন চলচ্চিত্রের সংজ্ঞাই বদলে দেয়। পরিচালক গ্যারেথ ইভান্স ইন্দোনেশিয়ার ঐতিহ্যবাহী মার্শাল আর্ট ‘পেনচাক সিলাত’কে এমন দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করেন, যা পরবর্তীকালে আন্তর্জাতিক অ্যাকশন সিনেমার কোরিওগ্রাফিতেও ব্যাপক প্রভাব ফেলে।

আজকের বাস্তবধর্মী অ্যাকশন দৃশ্যের পেছনে এ চলচ্চিত্রগুলোর প্রভাব অস্বীকার করার উপায় নেই। বিশ্ব সিনেমার মানচিত্রে হয়তো এসব দেশের বাজার তুলনামূলক ছোট, কিন্তু সৃজনশীল প্রভাবের দিক থেকে তাদের অবস্থান শক্তভাবেই জানান দিচ্ছে।

আরও