রিভিউ

বিস্মরণের দিনগুলোয় প্রেম

এক অজানা ভাইরাসের কবলে পড়েছে পৃথিবীর মানুষ। রোজ ঘুম থেকে উঠেই যার চেহারা সে দেখত, হঠাৎ তাকেই আর চিনতে পারছে না।

এক অজানা ভাইরাসের কবলে পড়েছে পৃথিবীর মানুষ। রোজ ঘুম থেকে উঠেই যার চেহারা সে দেখত, হঠাৎ তাকেই আর চিনতে পারছে না। কেউ কেউ নিজের নাম-পরিচয় ভুলে উদভ্রান্তের মতো ঘুরছে রাস্তায়। স্মৃতি থেকে মুছে যাচ্ছে জীবনের সব আনন্দ-বিষাদের মুহূর্ত। গিটারের জাদুকরের আঙুল অকস্মাৎ থেমে যাচ্ছে ছয়টা তারের শরীরে। উড়ন্ত প্লেন আছড়ে পড়ছে সহসা। কারণ পাইলট ভুলে গেছেন প্লেন নিয়ন্ত্রণের কৌশল। ম্যারাথনে দৌড়াতে গিয়ে আর থামছে না কোনো দৌড়বিদ। কেউবা মনের বিভ্রমে সাঁতরে পাড়ি দিচ্ছে অজস্র মাইল। সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার এ ভাইরাস যেকোনো মুহূর্তেই সংক্রমিত হতে পারে যেকোনো বয়সের যে কারো শরীরকে। করোনা মহামারীতে যখন পুরো পৃথিবী নাজেহাল, তখন এ অদ্ভুত স্মৃতিভ্রংশের গল্প নিয়ে হাজির হয়েছিলেন পরিচালক চ্যাড হার্টিগান। গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের উপন্যাস ‘লাভ ইন দ্য টাইম অব কলেরা’র মতোই চ্যাড বিস্মরণের এ মহামারীতে বলতে চেয়েছেন আরেকটা ভালোবাসার গল্প। এ স্মৃতিখেকো ভাইরাস কীভাবে ঝুঁকিতে ফেলেছে এমা আর জুডের দাম্পত্য জীবনকে সে গল্প বলেছেন।

এমা আর জুড মহামারীর এ অবরুদ্ধ সময়ে ধরে রাখতে চায় তাদের বিগত জীবনের স্মৃতি, তাদের একসঙ্গে বেঁচে থাকার ইতিহাস। এমা আর জুডের জীবনে ভালোবাসা মানে শুধু স্মৃতি নয়, বরং প্রতিদিন একে অন্যকে নতুন করে চেনা। কিন্তু যখন পৃথিবীই ভুলে যাওয়ার রোগে আক্রান্ত, তখন এ চেনার প্রক্রিয়া ভয়াবহ এক অনিশ্চয়তায় ডুবে যায়। লিটল ফিশ সে অনিশ্চয়তার সিনেমা, যেখানে ভালোবাসা ও বিস্মৃতি একে অন্যের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে। প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে নিজেদের বিষয়ে জুডকে প্রশ্ন করা শুরু করে এমা। ছবির পেছনে লিখে রাখে ছবির সঙ্গে জড়িত ঘটনার গল্প। এভাবেই দৈনন্দিনতার মাঝে চলতে থাকে স্মৃতি ধরে রাখার অনন্ত প্রয়াস।

একদিন ভাইরাসকে রুখে দেয়ার চিকিৎসা পদ্ধতি আবিষ্কারের গুঞ্জন শোনা যায়। অল্পকিছু মানুষকে বেছে নেয়া হয় পদ্ধতিগত সাফল্য নির্ধারণে। পরীক্ষা কেন্দ্রগুলোর সামনে উপচে পড়া ভিড়। কেউ কেউ নিজেরাই নিজেদের অস্ত্রোপচার করে পড়ে প্রাণের ঝুঁকিতে। এভাবে সিনেমাটি আর এমা-জুডের কাহিনীর মাঝে আটকে থাকে না, ধরতে চায় বৃহত্তর জীবনের কোলাজকেও। পরিচালক চ্যাড হার্টিগান লিটল ফিশকে কোনো সাই-ফাই থ্রিলার বানাননি। বরং ছোট ছোট মুহূর্তকে সেলাই করে নিঃশব্দ, বিষণ্ন প্রেমের কাব্যে পরিণত করেছেন। যেভাবে সময় আমাদের সম্পর্কের স্মৃতিগুলো ধীরে ধীরে ক্ষয়ে দেয়, তেমনই এ ভাইরাস মুছে দিচ্ছে আমাদের ভালোবাসার ভিত্তি। পায়ে ছোট্ট একটা মাছের ট্যাটু এঁকে নিয়ে স্মৃতি আর সময়ের বিরুদ্ধে চলছে ভালোবাসার নিঃশব্দ যুদ্ধ।

এমার চরিত্রে অভিনেত্রী অলিভিয়া কুকের কোমল চোখ দুটোয় এ যুদ্ধের স্পষ্ট আতঙ্ক স্থির হয়ে থাকে সবসময়। এত সাধের ভালোবাসার মানুষটা যদি একদিন ঘুম থেকে উঠে হঠাৎ তাকে চিনতে না পারে সে ভয় তাকে তাড়া করে ফেরে সবসময়। জ্যাক ও’কনেল যেন নিজের আত্মাকে চালান করে দিয়েছেন জুড চরিত্রটির হৃদয়ে। গভীর মানবিকতার সঙ্গে ফুটিয়ে তুলেছেন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চরিত্রটির চোখেমুখে লেগে থাকা বিভ্রান্তি। নিজের বিয়ের দিনের ঘটনা ভুলে যাওয়া থেকে শুরু করে নিজের কুকুরকে চিনতে না পারা—তার এ ধারাবাহিক স্মৃতিবিভ্রমের অংশীদার হয়ে ওঠে দর্শকও। তাদের বন্ধু বেনের চরিত্রে অভিনয় করা রাউল কাস্টিলোর স্বল্প সময়ের উপস্থিতিও গভীরভাবে মনে ছাপ ফেলে যায়। এক গায়ক ধীরে ধীরে ভুলে যাচ্ছে তার সবচেয়ে আবেগের কাজ। হাতে গিটারের তারে বাঁধা সুরলিপি এঁকে রেখেও মনে থাকছে না কিছুতেই। বেনের সে তীব্র অসহায়ত্ব সঞ্চারিত হয় দর্শকের মাঝেও।

বলা হয়, গোল্ডফিশের স্মৃতিশক্তি নাকি ৩ সেকেন্ড স্থায়ী। মানুষের স্মৃতিশক্তির কমজোরি বোঝাতে আমরা প্রায়ই ব্যবহার করি ‘গোল্ডফিশের স্মৃতি’ শব্দবন্ধ। লেখিকা আজা গ্যাবেলের গল্পের মুন্সিয়ানায় সে কমজোর স্মৃতির সরণিতে নিজেদের জীবনকে দেখার প্রয়াসই ‘লিটল ফিশ’। সিনেমাটোগ্রাফার শন ম্যাকইউয়ের ক্যামেরা সে গল্পের বিস্মৃত পৃথিবীকে দেখায় নরম, ধোঁয়াটে আলোয় অস্পষ্ট কোনো ছবির মতো। যেন স্মৃতির আবছা দেয়ালের ভেতর দিয়েই আমরা তাকিয়ে আছি জীবনের দিকে। প্রতিটি ফ্রেমে ছড়িয়ে আছে অনিশ্চয়তার কুয়াশা, সে কুয়াশার ভেতর দিয়েই ভেসে আসে ভালোবাসার কোমল আলো। ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকও সাযুজ্য ধরে রাখে। অল্প, সংযত কিন্তু বিষণ্নতার সফেদ কাফনে ঢাকা। লিটল ফিশ সিনেমাটিতে তার পূর্বসূরি ইটার্নাল সানশাইন অব দ্য স্পটলেস মাইন্ড (২০০৪), পারফেক্ট সেন্স (২০১১) সিনেমাগুলোর ছায়া থাকলেও তা স্বকীয় হয়ে উঠেছে ভীষণ ব্যক্তিগত গল্পের কারণে। প্রশ্ন রাখতে চেয়েছে, অতীতের স্মৃতি মুছে ফেলেও ভালোবাসা বিস্মরণের অন্ধকারের মাঝে নিজের উষ্ণতা ধরে রাখতে পারে কিনা।

আরও