নিজেকে নতুন করে খুঁজে নিয়েছিলেন রেখা

রেখার জীবনটা সিনেমার চেয়ে কম কিছু না। তার আসল নাম ভানুরেখা গণেশন। বাবা জেমিনি গণেশন দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমার পরিচিত অভিনেতা।

মাদ্রাজের এক কিশোরী। ১৯৭০ সালে ‘শাওন ভাদোঁ’র মাধ্যমে হিন্দি সিনেমায় পা রাখলেন। অভিনয়ের চেয়ে বেশি আলোচনায় এল তার চেহারা, গায়ের রঙ, শরীরের গড়ন আর হিন্দি ভাষায় দুর্বলতা। সিনেমা ম্যাগাজিনগুলো তাকে নিয়ে বিদ্রূপ করল। কেউ বলল, তিনি নায়িকা হওয়ার উপযুক্ত নন। অথচ সে মেয়েই একদিন হয়ে উঠবেন ভারতীয় সিনেমার অন্যতম রহস্যময়, আকর্ষণীয় ও সম্মানিত অভিনেত্রী রেখা। গতকাল ৭২ বছরে পা দিলেন তিনি। পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে অভিনয় ও ব্যক্তিত্ব দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন, তারকা হয়ে ওঠার চেয়েও বড় কৃতিত্ব নিজের পরিচয় নিজে নির্মাণ করা।

রেখার জীবনটা সিনেমার চেয়ে কম কিছু না। তার আসল নাম ভানুরেখা গণেশন। বাবা জেমিনি গণেশন দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমার পরিচিত অভিনেতা। মা পুষ্পাবল্লীও অভিনয় করতেন। বাবা তাকে ও তার মাকে খুব একটা শান্তি দেননি জীবনে। জেমিনির অনেক সম্পর্ক ছিল। এসবের মধ্য দিয়েই বড় হয়েছেন রেখা।

বাবা-মায়ের সূত্রে শৈশব থেকেই অভিনয়জগতের সঙ্গে পরিচয় ভানুরেখার। তবে হিন্দি সিনেমায় জায়গা তৈরি করা তার জন্য সহজ ছিল না। প্রথম দিকে একের পর এক সিনেমায় অভিনয় করলেও তাকে প্রায়ই সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছিল গ্ল্যামার-নির্ভর চরিত্রে। এর মধ্যে তার চেহারা নিয়ে কটাক্ষ চলেছে, অভিনয় নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কিন্তু রেখা সমালোচনাকে নিজের ভবিতব্য বলে মেনে নেননি। চেহারা, ভাষা, উচ্চারণ, নাচ ও অভিনয়ের ওপর পরিশ্রম করেছেন। ক্যামেরা তাকে কীভাবে দেখে, পোশাক কীভাবে চরিত্রের ভাষা হয়ে ওঠে ধীরে ধীরে আয়ত্ত করেছেন সে শিল্পও।

এ বদলের প্রথম বড় স্বীকৃতি আসে ১৯৭৮ সালে। ‘ঘর’ ছবিতে নিপীড়নের শিকার এক নারীর মানসিক ক্ষত ও ঘুরে দাঁড়ানোর সংগ্রাম তুলে ধরেন তিনি। একই বছর ‘মুকাদ্দার কা সিকান্দার’-এ জোহরার চরিত্রে রেখার অভিনয় দর্শকের মনোযোগ কেড়ে নেয়। এতদিন যাকে চেহারার কারণে বিচার করা হয়েছিল, তার অভিনয়ের গভীরতা এবার আর উপেক্ষা করা গেল না। রেখা বুঝিয়ে দিলেন, সৌন্দর্যের প্রচলিত সংজ্ঞায় উত্তীর্ণ হওয়াই নায়িকা হওয়ার একমাত্র শর্ত নয়; চরিত্রের ভেতর প্রবেশ করতে পারাই একজন অভিনেতার প্রকৃত শক্তি।

হৃষিকেশ মুখার্জির ‘খুবসুরত’ (১৯৮০) তাকে হাজির করল অন্য এক রূপে। মঞ্জু প্রাণবন্ত, দুষ্টুমিভরা, নিয়মের বাইরে হাঁটতে ভালোবাসে। তার সাজপোশাকে নেই তারকাসুলভ আড়ম্বর; বরং রয়েছে পরিচিত জীবনের স্বাভাবিকতা। এ চরিত্রে রেখার হাস্যরস ও স্বতঃস্ফূর্ততা তাকে এনে দেয় ফিল্মফেয়ার সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার। পরের বছর ‘উমরাও জান’-এ তিনি যেন সম্পূর্ণ অন্য এক জগতে প্রবেশ করেন।

সিনেমা নয়, ক্যামেরায় যেন কবিতা ও পেইন্টিং তৈরি করেন মুজাফফর আলী। মীর্জা হাদি রুসওয়ার গল্প থেকে নির্মিত সিনেমায় রেখার অভিনয় শুধু সংলাপ, নাচ কিংবা সৌন্দর্যের প্রদর্শনী ছিল না। উনিশ শতকের লখনৌয়ের বাইজি ও কবি উমরাওয়ের জীবনে প্রেম, বিচ্ছেদ, আকাঙ্ক্ষা এবং নিঃসঙ্গতা যেভাবে মিশে আছে; রেখা তা প্রকাশ করেন চোখের দৃষ্টি, শরীরের সামান্য ভঙ্গি, কণ্ঠের ওঠানামা আর নীরবতার মধ্য দিয়ে। পোশাক, গয়না, চুলের সাজ সবই চরিত্রটির জীবনের অংশ হয়ে উঠেছিল। এ চরিত্রে অভিনয়ের জন্য ১৯৮২ সালে তিনি পান জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা অভিনেত্রীর সম্মান।

তবে রেখার যাত্রা কেবল ঐতিহাসিক চরিত্র কিংবা সংবেদনশীল নাটকে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ১৯৮৭ সালের ‘ইজাজত’-এ তার অভিনয় ছিল সংযত ও অন্তরঙ্গ। সেখানে বাহ্যিক চাকচিক্যের বদলে গুরুত্ব পেয়েছে চরিত্রের আবেগ ও সম্পর্কের জটিলতা। পরের বছর ‘খুন ভরি মাং’-এ তিনি ফিরে আসেন প্রতিশোধপরায়ণ এক নারীর চরিত্রে। স্বামীর বিশ্বাসঘাতকতায় মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসে নতুন চেহারা, নতুন পোশাক ও নতুন পরিচয়ে প্রতিশোধ নেয়ার গল্পটি যেন রেখার নিজের জীবনযাত্রারও প্রতীক। খুবই মধ্যম মানের সিনেমা হলেও রেখার অভিনয় একে দিয়েছিল নতুন মাত্রা।

১৯৯৬ সালের ‘খিলাড়িয়োঁ কা খিলাড়ি’তে ম্যাডাম মায়া চরিত্রে তার গ্ল্যামার হয়ে উঠেছিল ক্ষমতার ভাষা। অন্যদিকে ‘সিলসিলা’, ‘কলিযুগ’, ‘বিজেতা’ ও ‘উৎসব’-এর মতো ছবিতে তিনি দেখিয়েছেন, মূলধারার জনপ্রিয়তা ও শিল্পসম্মত অভিনয়ের মধ্যে বেছে নেয়ার প্রয়োজন নেই; বিভিন্ন ঘরানায় নিজেকে মানিয়ে নেয়ার ক্ষমতাই তাকে স্বতন্ত্র করেছে।

পর্দার বাইরেও রেখা একটি অনন্য পরিচয় নির্মাণ করেছেন। কাঞ্জিভরম শাড়ি, চুলে ফুল, কপালে বড় টিপ, গাঢ় কাজল, লাল ঠোঁটের এ সাজ এখন প্রায় তার নামের সমার্থক। পুরস্কার বিতরণী কিংবা জনসমক্ষে উপস্থিত হলে সেই চিরপরিচিত অবয়বেই তিনি আলাদা করে নজর কাড়েন। এটি নিছক ফ্যাশন নয়, নিজের পরিচয়কে নিজের ইচ্ছানুসারে নির্মাণের আরেকটি উদাহরণ।

আরও