ভিউ-নির্ভর কনটেন্ট সংস্কৃতি, নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের টিকে থাকার লড়াইসহ নানা বিষয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন অহিদুর রহমান
সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে আপনার গান ‘খেয়ালী সুর’। এখনকার শ্রোতারা আপনার এ নতুন গানকে কীভাবে গ্রহণ করছে?
এখন মানুষ ওভাবে গান শোনে না। এখন মানুষ শুধু ভাইরাল বিষয় খোঁজে—সেটা গান হোক, কোনো প্রডাক্ট হোক, অভিনয় হোক বা কোনো নেতিবাচক বার্তা হোক সেটাই মানুষ শোনে-দেখে। তাই এখন গান প্রকাশ পেলে আলাদা করে কেমন সাড়া পাওয়া গেল বিষয়টা আসলে খুবই তুচ্ছ। তবে যারা প্রকৃত শ্রোতা, তারা ঠিকই গান শোনে এবং ভালো বলে। আমরা শিল্পী, গান না গেয়ে থাকতে পারি না, তাই গান করি।
বর্তমানের ভিউ-নির্ভর সংস্কৃতিকে আপনি কীভাবে দেখেন?
নেতিবাচক কিছু হলেই মানুষ এখন বেশি মাতামাতি করে। গান এখন আর নির্দিষ্ট কোনো শিল্প নয়, এটি ‘প্রডাক্ট’ বা কনটেন্ট হয়ে গেছে। অডিয়েন্স বা শ্রোতাও নষ্ট হয়ে গেছে, তারা কেবল বিতর্কিত জিনিস দেখতে ভালোবাসে। নাটকগুলোর ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। নেতিবাচক কোনো সিন ভাইরাল হলেই সবাই হুমড়ি খেয়ে দেখছে।
ভিউ বা ভাইরাল সংস্কৃতির কারণে বাংলাদেশের সংগীতের ভবিষ্যৎ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে বলে মনে করেন?
শূন্যতায়। যা হওয়ার তা আসলে নব্বই দশক পর্যন্তই হয়ে গেছে। ২০০০ সালের প্রথম দিকে কিছুটা হলেও এরপর শেষ। এখন মানুষের সবকিছু খুব দ্রুত সৃষ্টি হচ্ছে আবার নিমিষেই অতীত হয়ে যাচ্ছে, চারপাশে যত অস্থির সময় যাচ্ছে, আমি ততটা স্থির হচ্ছি।
ব্যক্তিগত ইউটিউব চ্যানেলে গান প্রকাশ করতে কেমন লাগে?
ভালোই লাগে, কারণ এখন ভালো কোনো ব্যানার নেই। আর তারা আমাকে দিয়ে কেনই বা গান করাবে, আমি আর ভাইরাল শিল্পী নই! আমি এ অসুস্থ প্রতিযোগিতায় কখনো দৌড়াইনি, দৌড়াবও না।
আপনি অন্যের সুরে কণ্ঠ দেয়ার পাশাপাশি ইদানীং নিজেও সুর করছেন...
আমি মূলত গানের কথা দেখে সুর করার অনুপ্রেরণা পাই। এটা অনেক বছরের অভিজ্ঞতার একটা ফসল। আমার বাবাও গান সুর করতেন। তাছাড়া অনেকের সুর শুনে ইম্প্রোভাইজ করতে করতে এটা একটা সাধারণ প্রক্রিয়া হিসেবে চলে আসে। ভারত বা পাকিস্তানেও অনেক শিল্পী নিজেদের সুরে গান করেন। এটা করতে করতে এক ধরনের অভ্যস্ততা তৈরি হয়। আমাদের দেশে লাকী আখন্দ, বাপ্পা মজুমদার, পার্থ বড়ুয়া বা চিরকুটের সুমি—অনেকেই নিজের গানে সুর করে। মেয়েদের মধ্যে এ প্রবণতা কিছুটা কম হলেও ইদানীং অনেকেই এগিয়ে আসছে। সুর করাটা একটা আনন্দের ব্যাপার; ভালো লাগলে করি, না হলে ছেড়ে দিই।
সুর করার সময় আপনার করা গানে বাবার গানের দর্শন বা ঘরানার কোনো প্রভাব কি আপনার ওপর কাজ করে?
হ্যাঁ, অবশ্যই করে। আমার সুরের পুরোটাজুড়েই বাবার ঘরানার প্রভাব থাকে।
এ প্রজন্মের সংগীতশিল্পীদের উদ্দেশে কিছু বলার আছে কি?
এ প্রজন্মের শিল্পীরা আসলে কিছু শিখে ওঠার আগেই টিকে থাকার এক অন্ধ দৌড়ে শামিল হচ্ছে। তারা যে ভালো কিছু করতে চায় না তা নয়, কিন্তু জীবনধারণের কঠিন বাস্তবতার কারণে তাদের দৌড়াতে হচ্ছে। এখন নাচ-গান ভরপুর ধামাকা ছাড়া কোনো প্রোগ্রাম জমছে না। আগে মানুষ গান শুনত, এখন নাচ দেখতে চায়। এমনকি গায়ক বা গায়িকাকেই স্টেজে নাচতে হচ্ছে, ফলে মূল নৃত্যশিল্পীদেরও কাজ কমে গেছে। বেঁচে থাকার তাগিদে নতুন প্রজন্মকে এ স্রোতেই ভাসতে হচ্ছে।
আপনি কর্মজীবনের একদম শুরুতে চলচ্চিত্রের গান দিয়ে যাত্রা করেছিলেন। ‘দূরদেশ’ সিনেমায় প্রথম প্লে-ব্যাকের সে অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
অভিজ্ঞতাটা ভীষণ চমৎকার ছিল। তখন আমরা অনেক ছোট। ‘দূরদেশ’ ছবিটি তিন দেশের যৌথ প্রযোজনা ছিল (বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান)। ছবিতে আমাদের দুই বোনের কণ্ঠে গাওয়া ‘ভাইটি আমার তুমি কেঁদো না’ গানটি মূলত ভারতের লতা মঙ্গেশকর ও আশা ভোঁসলে করেছিলেন। এফডিসিতে গিয়ে যখন শুনলাম এত বড় মাপের দুজন শিল্পীর বাংলা সংস্করণটি আমাদের গাইতে হবে, তখন আমরা ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। সে ভয়টি ছিল মূলত শ্রদ্ধাবোধের জায়গা থেকে, যেন কোনো ভুল হয়ে না যায়।
সিনেমার গানের জন্য আপনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও পেয়েছিলেন। কিন্তু বর্তমান চলচ্চিত্রের গানে আপনাকে সেভাবে পাওয়া যায় না কেন?
জাতীয় পুরস্কার পাওয়ার পর ভেবেছিলাম এটা আরো অনুপ্রেরণা জোগাবে এবং চলচ্চিত্রে আরো বেশি গান গাওয়ার সুযোগ আসবে। সবাই বলতেন আমার কণ্ঠ নাকি ভীষণ ফিল্মি। কিন্তু বাস্তবে উল্টোটা ঘটল। পুরস্কার পাওয়ার পর এক ধরনের সিন্ডিকেটের কারণে চলচ্চিত্রে আমার গান গাওয়া প্রায় বন্ধই হয়ে গেল। একদম যে করি না তা নয়। তবে এ সিন্ডিকেটগুলো এখন নতুন কাউকে সহজে ঢুকতে দিতে চায় না।
অনেক হতাশার কথা বললেন। সেখানে আশার কি কিছু দেখতে পান?
আশার কথা হলো এ অস্থির প্রতিযোগিতার দৌড়ে সবাই একসময় ক্লান্ত হয়ে একদিন সবাইকে নিজের শেকড়েই ফিরে আসতে হবে। আমি সে আশায় আছি। হয়তো আমি নিজে তা দেখে যেতে পারব না, কিন্তু আমি জানি এটা হবে। কিছু সময়ের জন্য চারপাশে আগাছা জন্মায়, কিন্তু এ আগাছাগুলো একসময় ঝরে যাবেই। মানুষ বেশিদিন খারাপের সঙ্গে থাকতে পারে না। যারা এ অস্থিরতা তৈরি করছে, তারা নিজেরাই একসময় সরে যেতে বাধ্য হবে। এ আঁধার কেটে যাবেই।