It little profits that an idle king,
By this still hearth, among these barren crags,
Match'd with an aged wife, I mete and dole
Unequal laws unto a savage race
টেনিসন এভাবেই শুরু করেছেন তার কবিতা ‘ইউলিসিস’। গ্রিক নায়ক ওডিসিয়াসের নাম লাতিনে ইউলিসিস। ওডিসিয়াস, ইথাকার রাজা। আগামেমননের অধীনে তিনি অন্যতম প্রধান যোদ্ধা হয়ে গিয়েছিলেন ট্রয়ে। যাওয়ার আগে স্ত্রী পেনেলোপিকে বলে গিয়েছিলেন নির্দিষ্ট সময় পর ফিরে না এলে যেন নতুন স্বামী গ্রহণ করে। সে-ই হবে ইথাকার রাজা। পেনেলোপি তার কাছ থেকে কথা আদায় করেছিলেন যে ওডিসিয়াস ফিরবেন। ফেরার চেষ্টা ওডিসিয়াসেরও ছিল। কিন্তু ট্রয় যুদ্ধের চেয়ে ওডিসিয়াসের ফেরার পথ ছিল আরো ভঙ্গুর। বহু দেশ, বহু দুর্যোগ, বহু শত্রু মোকাবেলা করতে হয়েছিল তাকে। ওডিসিয়াসের ছিল এক দীর্ঘ যাত্রা। মহাকবি হোমারের বর্ণনায় সে যাত্রার নাম হলো ওডিসি। কালে কালে তারপর যেন সব দীর্ঘ যাত্রার নামই হয়ে উঠল ওডিসি। আর হোমারের মহাকাব্য অনুসরণে ওডিসিয়াসকে নিয়ে ক্রিস্টোফার নোলান নির্মাণ করলেন সিনেমা। হোমারের মহাবীর সেখানে হয়ে উঠলেন এক অনুতপ্ত যোদ্ধা।
সিনেমা শুরু হয় ইথাকা থেকে। প্রাসাদে পেনেলোপের পাণিপ্রার্থীদের ভিড়। টেলিমেকাস তরুণ যুবা। তার সেসব সহ্য হয় না। বুদ্ধি হওয়ার আগেই বাবা চলে গেছে যুদ্ধে। বাবার বীরত্বের কথা কিছু শুনেছে সে। কিন্তু ট্রয় যুদ্ধে কী হলো, সব জানে না। গল্পটা দর্শক জানে। জানা গল্পাটাই সিনেমার পর্দায় উঠে এল। দেখা গেল এমন এক প্রাসাদ, যাকে জাঁকজমকপূর্ণ বলা যায় না। ইথাকা রাজ্যেরও খুব সমৃদ্ধি নেই। কিন্তু পেনেলোপির রূপ, ইথাকার সিংহাসনের জন্য লালায়িত বহু পুরুষ সেখানে মোচ্ছব জমিয়ে রেখেছে। মায়ের কাছ থেকে টেলিমেকাস জানতে পারে, তার (পেনেলোপি) স্বামীই বলে গিয়েছিল ফিরে না এলে পুনরায় বিয়ে করার কথা। ২০ বছর পেরিয়ে গেলে টেলিমেকাস আর অপেক্ষা করতে পারে না। সে বেরিয়ে পড়ে বাবার খোঁজে। রাজ্যের পর রাজ্যে যায় সে, অন্তত জানতে চায় বাবার যুদ্ধ অভিজ্ঞতার কথা।
এথেনার সঙ্গে ওডিসিয়াস
বড় পর্দায় ভেসে ওঠে গ্রিক নৌকা। তেমন কোনো আড়ম্বর নেই। কেবল একটা সরু যুদ্ধজাহাজ। সেখানে একটা বড় মাস্তুল। অসংখ্য দাঁড়। সবল সব সৈন্যরা দাঁড় টানে। টেলিমেকাসরূপী টম হল্যান্ড যখন যাত্রা করেন, পর্দায় নীল সমুদ্রের জুম আউট করা দৃশ্য দেখে মনে হয় অকূল পাথারেই ভেলা ভাসাল টেলিমেকাস। সে জানে না কোথায় গেলে পাবে পিতাকে।
ক্রিস্টোফার নোলান সময় নিয়ে খেলতে পছন্দ করেন। তার সিনেমায় ফ্ল্যাশব্যাক থাকে। এক সময়কাল থেকে তিনি গল্প নিয়ে যান অন্য সময়কালে। ‘দি ওডিসি’ও-এর ব্যতিক্রম না। টেলিমেকাসের যাত্রার মধ্যেই আসে ওডিসিয়াসের অবস্থা। কোনো এক সমুদ্রতীরে পড়ে আছে সে। সঙ্গী তার জলপরী ক্যালিপসো। সেই বাঁচিয়েছিল ওডিসিয়াসকে। এ দুজনের কথোপকথনের মধ্য দিয়ে ক্রিস নোলানের ওডিসি দর্শকের সামনে ওডিসিয়াসের গল্প নিয়ে আসে। তার যাত্রারম্ভ, তার যুদ্ধ, তার সঙ্গী ইত্যাদি খণ্ড খণ্ডভাবে উঠে আসে পর্দায়। কখনো সে যুদ্ধের কথা স্মরণ করে। কখনো স্মরণ করে পরিবারের। কিছুটা সে মনে করতে পারে কিছুটা তার বাকি।
হোমারের কাব্যে ওডিসি এক দীর্ঘ যাত্রা। দীর্ঘ তার সময়। ক্যালিপসোর সঙ্গেই দ্বীপে আঁটকে ছিলেন ওডিসিয়াস সাত বছর। আগামেমনন ও তার বিশাল বাহিনী ট্রয় অবরোধ করে রেখেছিল ১০ বছর। তারপর তিন বছর সঙ্গীদের সঙ্গে ভেসেছেন ওডিসিয়াস। এতকিছু একটা ৩ ঘণ্টার সিনেমায় তুলে আনা অসম্ভব। ক্রিস্টোফার নোলান তাই খণ্ড গল্প বলেছেন। কখনো ওডিসিয়াসের মুখে, স্মৃতিতে; কখনো টেলিমেকাস সেই গল্প শুনছে মেনেলাউসের কাছ থেকে। কখনো এ দুইয়ের মাঝে আসে ইথাকার প্রাসাদ, ষড়যন্ত্র, ওডিসিয়াসের জন্য ইথাকার মানুষ—বিশেষত তার বিশ্বস্ত সঙ্গীদের অপেক্ষা।
গ্রিক যোদ্ধার সাজে ম্যাট ড্যামন
ওডিসিয়াস আখ্যানের মূল বিষয় অনেক। পৃথিবীর অন্যান্য মহাকাব্যেও যেমন একটা নিরেট কাহিনীর মধ্যে থাকে আরো শাখা-প্রাশাখা। তার মধ্যে থাকে নীতি, শাস্ত্র, যুদ্ধ, সমাজ, অঞ্চল, দেবতা, ভবিষ্যৎ, জ্যোতিষ, পরিবেশ, দুর্যোগ এবং অন্য বহুবিধ বাস্তব ও দর্শন এবং তা বর্ণিত হয়েছে বিস্তারে। সহজ সংস্করণ বা সিনেমায় তা আনা হয় সংক্ষেপে। নোলানও সে কাজটাই করেছেন। তিনি রেখেছেন ট্রয় যুদ্ধের উপস্থাপক কিছু দৃশ্য—বিশেষত ট্রোজান হর্স। ট্রয়ের প্রাসাদে আক্রমণও এসেছে। তবে বিশেষভাবে এসেছে ওডিসিয়াসের ঘরে ফেরার যাত্রা। সে যাত্রার একটা বড় অংশ জুড়ে আছে সমুদ্র। নোলান সে সমুদ্রকে বাস্তব করে তুলেছেন তার দর্শকের সামনে। ওডিসিয়াসের নৌকা যখন ঝড়ের মুখে পড়ে, তখন মনে হয় দর্শকও সে ঝড়ের অংশ। আবার একচক্ষু দানব সাইক্লপস পলিফেমাসের গুহায় আটকা পড়ার সময়ও দম বন্ধ হয়ে আসে। লেস্ট্রিগোনিয়ানদের সঙ্গে ওডিসিয়াস ও তার বাহিনীর সংঘর্ষও এনেছেন নোলান। প্রতিটি দৃশ্যই চমৎকার কোরিওগ্রাফ করা।
তবে হোমারের মূল আখ্যানে ওডিসিয়াস একজন গর্বিত যোদ্ধা। তিনি যা করেন, এক যোদ্ধার দর্শন থেকেই সিদ্ধান্ত নিয়ে করেন। কিন্তু ক্রিস্টোফার নোলানের ওডিসিয়াস এক অনুতপ্ত যোদ্ধা। ক্যালিপসোর সঙ্গে বসে তিনি যখন অতীত স্মরণ করতে চান, তখন তার চোখেমুখে থাকে চিন্তার রেখা। সে চিন্তার রেখার মধ্যে ওডিসিয়াস চরিত্রে ম্যাট ড্যামন ফুটিয়ে তুলেছেন জীবনের শেষ অংশে চলে আসা যোদ্ধার অনুতাপ। ক্রিস নোলানের ওডিসিয়াস নিজেকে প্রশ্ন করে। তার যুদ্ধজয়ের গৌরব নেই, আছে প্রতিজ্ঞা রক্ষার দৃঢ় ইচ্ছা আর আত্মসচেতনতা।
‘দি ওডিসি’ মুক্তির আগেই প্রশ্ন উঠেছিল বেশকিছু বিষয় নিয়ে। প্রথমেই ছিল ভাষার ব্যবহার, দ্বিতীয় ছিল বর্মের নকশা, তৃতীয় ছিল কৃষ্ণাঙ্গ অভিনেতাদের অন্তর্ভুক্তি। নিরপেক্ষভাবে বিচার করতে গিয়ে বলা যায়, ভাষা খুব বেশি সমস্যা তৈরি করেনি। বর্মের নকশা নিয়ে কাজ করার আরো সুযোগ ছিল। যে নকশা নোলান ব্যবহার করেছেন, তাতে গ্রিক সেনাদের পোশাক ও বর্ম নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। কৃষ্ণাঙ্গ অভিনেতা হিসেবে লুপিতা নিয়ং’ওকে নিয়েই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল। হেলেন চরিত্রে তাকে কাস্ট করা কতটা যুক্তিযুক্ত? হেলেনকে পৃথিবীর (পৃথিবী কি গ্রিসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ?) সুন্দরতম নারী বলেছেন হোমার। সুন্দরের নানা ব্যাখ্যা হতে পারে। হোমারের গ্রিসে কৃষ্ণাঙ্গ নারী ছিলেন না এমনটাই প্রচলিত। তবে এ সিনেমায় হেলেন চরিত্রটারই কোনো প্রয়োজন ছিল না। তার স্ক্রিনটাইমও ছিল সামান্য।
পেনেলোপি ও টেলিমেকাস
এ সিনেমা মূলত সিনেমার দর্শকের জন্য একটা চমৎকার ভিজুয়াল এক্সপেরিয়েন্স। ক্রিস্টোফার নোলান তার অন্য সিনেমার মতোই ‘দি ওডিসি’ এক অসাধারণ ভিজুয়ালের সমষ্টি। সমুদ্র, নৌকা, সমুদ্রসৈকত, ঝড়, ট্রোজার হর্স, ট্রোজান ওয়ারের সামান্য একটু থাকলেও তার আয়োজন আর উপস্থাপন ছিল মহাকাব্যিক। ক্রিস্টোফার নোলানের সবচেয়ে বড় শক্তি তার ভিশন আর ভিজুয়াল। সে কারণেই বেনি সাফিদিকে একবারও পুরোপুরি দেখা না গেলেও আগামেমনন চরিত্রে তার উপস্থিতি গায়ে কাঁপন ধরায়। ট্রয়ের দরজা খোলার পর সেনাদলের সামনে আগামেমনন যেন অপার্থিব কোনো দেবতা। এ সবই সম্ভব কেবল ভিশনের কারণে।
নোলানের সে ভিশনকে বাস্তবায়ন করতে যেন নিজেদের সর্বোচ্চটা নিয়েই অভিনয় করেছেন ম্যাট ড্যামন, অ্যানা হ্যাথাওয়ে, টম হল্যান্ড, চার্লিজ থেরন, হিমেশ প্যাটেল। পেনেলোপির চরিত্রে অ্যানা হ্যাথাওয়ে চমৎকার। রবার্ট প্যাটিনসন অ্যান্টিনাস চরিত্রে এক প্রকৃত কাপুরুষ খল চরিত্র। টম হল্যান্ড যেন এ সিনেমার জন্যই নিজেকে এতদিন ধরে পরিণত করেছেন। আর ওডিসিয়াস! ম্যাট ড্যামনের প্রতিটি অভিব্যক্তি, ভঙ্গির মধ্যে ওডিসিয়াস জীবন্ত। তবে তিনি হোমারের ওডিসিয়াস নন, নোলানের ওডিসিয়াস।
ওডিসিয়াসকে সংক্ষেপে সবচেয়ে সুন্দর উপস্থাপন করেছেন টেনিসন। কবিতায় তিনি ইউলিসিসের মুখে বসিয়েছেন ‘আমার যাত্রায় কোনো বিশ্রাম নেই, জীবনকে আমি তলানি পর্যন্ত পান করব’। ইউলিসিসের কথায় ছিল প্রচ্ছন্ন গর্ব। সে গর্বটুকুকে অনুতাপে রূপান্তর করলেই তা পরিণত হয় ‘দি ওডিসি’তে।
সিনেমা: দি ওডিসি
পরিচালক: ক্রিস্টোফার নোলান
আইএমডিবি রেটিং: ৮.৫/১০