বলিউডে স্টারডমের সংজ্ঞা বদলাচ্ছে। আর সেই বদলের কেন্দ্রে সম্প্রতি ওঠে এসেছে একটি নাম, জাহ্নবি কাপুর। মূলত করণ জোহরের ট্যালেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠান ধর্মা কর্নারস্টোন এজেন্সি (ডিসিএ) থেকে আলাদা হওয়ার বিষয়টি বলিউডে তারকাদের আবির্ভাব, উত্থান-পতন, নেপোটিজম ও ব্যবস্থাপনার দিকগুলো নতুন করে আলোচনায় এনেছে। জাহ্নবির গুরু করণ জোহর একে ইন্ডাস্ট্রির ভেতরে ‘স্বাভাবিক’ পদক্ষেপ হিসেবেই দেখছেন। তবে বিশ্লেষকরা একে ‘তাৎপর্যপূর্ণ’ বলে অভিহিত করেছেন।
বলিউডে এজেন্সি বদলানো নতুন কিছু নয়; বরং ক্যারিয়ারের নতুন দিক খোঁজা, নতুন নেটওয়ার্ক তৈরি করা এবং ইমেজ রিবুট করার কৌশল হিসেবেই এটি দেখা হয়। জাহ্নবির ঘটনা আবার সামনে এনে দিয়েছে একটি বড় প্রশ্ন—আজকের বলিউডে আসলে কে স্টার বানায়? পরিবার, মেধা নাকি ট্যালেন্ট এজেন্সি?
রণবীর কাপুর, দীপিকা পাড়ুকোন, আদিত্য রয় কাপুর ও কলকি কচলিন। ছবি: সংগৃহীত
ট্যালেন্ট এজেন্সি এখন আর শুধু ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি নয়; এগুলো কার্যত ক্যারিয়ার নির্মাতা। বলিউডে ধর্মা কর্নারস্টোন ছাড়া প্রধান ট্যালেন্ট হাউজ হলো কেওয়ান এন্টারটেইনমেন্ট, ম্যাট্রিক্স এন্টারটেইনমেন্ট ও নতুন মিডিয়ানির্ভর কালেক্টিভ আর্টিস্টস নেটওয়ার্ক। এ প্রতিষ্ঠানগুলো অভিনেতাদের জন্য প্রজেক্ট জোগাড় করে, পারিশ্রমিক নিয়ে দরকষাকষি করে, ব্র্যান্ড এন্ডোর্সমেন্ট এনে দেয়, এমনকি মিডিয়ায় ইমেজ কীভাবে তৈরি হবে সেটাও ঠিক করে। একজন অভিনেতার ক্যারিয়ারের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে এদের ছাপ থাকে।
এ কাজের বিনিময়ে এজেন্সিগুলোর আয়ের প্রধান উৎস কমিশন। সাধারণত অভিনেতার মোট আয়ের ১০-২৫ শতাংশ পর্যন্ত তারা পেয়ে থাকে। সিনেমার ক্ষেত্রে কমিশন তুলনামূলক কম হলেও ব্র্যান্ড এন্ডোর্সমেন্টে তা অনেক বেশি হয়। কারণ বর্তমান বাস্তবতায় বলিউডে একজন তারকার আয়ের বড় অংশ আসে বিজ্ঞাপন ও ব্র্যান্ড ডিল থেকে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, একজন মাঝারি স্তরের অভিনেতা বছরে ১৬-৩৫ কোটি রুপি আয় করলে তার এজেন্সি শুধু কমিশন থেকেই ৩-৭ কোটি রুপির মতো আয় করতে পারে। ফলে স্পষ্ট—এজেন্সি শুধু ক্যারিয়ার গড়ে না, নিজেরাও বড় ব্যবসা দাঁড় করায়।
তবে এই হিসাব সব তারকার ক্ষেত্রে এক নয়। বলিউডের ‘তিন খান’— শাহরুখ খান, সালমান খান ও আমির খান এ কাঠামোর বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা এক ব্যতিক্রমী বাস্তবতা। তাদের ক্ষেত্রে ট্যালেন্ট এজেন্সি মূল খেলোয়াড় নয়, বরং সহায়ক শক্তি।
শাহরুখ খান নিজের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান রেড চিলিজ এন্টারটেইনমেন্টের মাধ্যমে কনটেন্ট, কাস্টিং এবং প্রজেক্টের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখেন। সালমান খান নিজের ব্র্যান্ড ও দর্শকসংযোগকে কেন্দ্র করে সিদ্ধান্ত নেন, যদিও ব্র্যান্ড ডিল বা ইভেন্টে কিছু ক্ষেত্রে এজেন্সির সহায়তা নেন। অন্যদিকে আমির খান আরো ভিন্ন। তিনি নিজের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান আমির খান প্রডাকশনসের মাধ্যমে খুব বাছাই করে কাজ করেন এবং এজেন্সির ওপর নির্ভরতা সবচেয়ে কম রাখেন। এই তিন তারকার ক্ষেত্রে দেখা যায়, এজেন্সি থাকলেও তা কন্ট্রোলার নয়—বরং ফ্যাসিলিটেটর। এর বাইরে হৃতিক রোশন থেকে দীপিকা পাড়ুকোন বা আলিয়া ভাট পর্যন্ত তারকাদের ক্যারিয়ারে এজেন্সি শক্তিশালী ভূমিকা রাখে।
বিশ্লেষকরা বলেন, এখানেই তৈরি হয় বলিউডের প্রকৃত পাওয়ার গেম। একদিকে বড় স্টার, অন্যদিকে প্রযোজক-স্টুডিও, আর তৃতীয়দিকে ট্যালেন্ট এজেন্সি—এই তিন শক্তির মধ্যে ভারসাম্যের ওপরই নির্ভর করে একটি ক্যারিয়ার। বড় স্টার হলে অভিনেতাই সিদ্ধান্ত নেয়, বড় স্টুডিও হলে প্রযোজক নিয়ন্ত্রণ করে, আর মাঝারি বা নতুন তারকার ক্ষেত্রে এজেন্সিই অনেক সময় মূল চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে।
পারিবারিক পরিচয় নিয়ে বলিউডে এলেও মেধার জোরে এখন ইন্ডাস্ট্রির অন্যতম তারকা হৃতিক রোশন। ছবি সংগৃহীত
এ প্রেক্ষাপটে নেপোটিজমের প্রশ্নও নতুনভাবে দেখা হচ্ছে। পরিবার বা পরিচিতির কারণে একজন অভিনেতা সহজে ইন্ডাস্ট্রিতে ঢোকার সুযোগ পেতে পারেন—যেমন জাহ্নবি কাপুরের ক্ষেত্রে হয়েছে। কিন্তু ইন্ডাস্ট্রিতে ঢোকা আর টিকে থাকা এক জিনিস নয়। ইতিহাস দেখায়, অনেক নেপোটিজম-প্রাপ্ত অভিনেতাও দর্শকের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে পারেননি, আবার আউটসাইডার হয়েও অনেকেই সুপারস্টার হয়েছেন। এখানে উদয় চোপড়ার বিপরীতে আয়ুস্মান খুরানা বা রাজকুমার রাও-কে উদাহরণ হিসেবে সামনে আনা যায়। ফলে আজকের বাস্তবতা দাঁড়িয়েছে—নেপোটিজম দরজা খুলে দেয়, কিন্তু সেই দরজা দিয়ে কতদূর যাওয়া যাবে তা নির্ধারণ করে ট্যালেন্ট, সিদ্ধান্ত এবং অনেক ক্ষেত্রে এজেন্সির কৌশল।
ডিজিটাল কনটেন্টের বাস্তবতায় বলিউডে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে । ওটিটি প্লাটফর্ম, সোশ্যাল মিডিয়া এবং গ্লোবাল ব্র্যান্ডিং—এই তিনটি বিষয় বলিউডের ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দিয়েছে। এখন শুধু সিনেমা নয়, একজন অভিনেতার ইনস্টাগ্রাম উপস্থিতি, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ডিল, এমনকি ব্যক্তিগত ইমেজ—সবকিছু মিলিয়েই তার স্টারডম নির্ধারিত হচ্ছে। এই জায়গায় কালেক্টিভ আর্টিস্টস নেটওয়ার্কের মতো নতুন প্রজন্মের এজেন্সিগুলো দ্রুত শক্তিশালী হয়ে উঠছে।
তবে এই পুরো ব্যবস্থার মধ্যেও যদি সত্যিই অপরিবর্তিত থাকে, তা হলো বলিউডে ‘চূড়ান্ত’ বলে কিছু নেই। একসময় ব্যর্থতার মুখে পড়েও শাহরুখ খান আবার ব্লকবাস্টার দিয়ে ফিরে আসেন। অমিতাভ বচ্চন দেউলিয়া অবস্থা থেকে নতুন করে নিজের ক্যারিয়ার গড়ে তুলেছেন। বিতর্কের পর আবার বক্স অফিস শাসন করছেন সালমান খান। এই কামব্যাকগুলোর পেছনে যেমন ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত আছে, তেমনি আছে সঠিক সময়, সঠিক প্রজেক্ট এবং কখনো কখনো সঠিক ম্যানেজমেন্ট কৌশল। আর অবশ্যই ভাগ্য।
সব মিলিয়ে আজকের বলিউডে স্টারডম একটি বহুমাত্রিক সমীকরণ। এখানে পরিচিতি, ট্যালেন্ট, সুযোগ, বাজার—সবকিছুর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ট্যালেন্ট এজেন্সির হিসাবি ভূমিকা। জাহ্নবি কাপুরের এজেন্সি পরিবর্তন সেই পরিবর্তনেরই প্রতিফলন—যেখানে একজন অভিনেতা শুধু অভিনয় করেন না, বরং নিজের ক্যারিয়ারের কৌশল নিজেই নতুনভাবে লিখতে শুরু করেন। আর যা বলার থাক, যার হাতে ‘হিট দেওয়ার ক্ষমতা’ থাকে শেষ কথা বলে সে-ই।