মীনা: শিশুতোষ গল্পে প্রতিবাদের পাঠ

কী সুন্দর এক প্রতিবাদের ভাষা। আজকাল চারপাশে প্রতিবাদের নানা রকম অদ্ভুত ভাষার মাঝে মীনাকে মনে পড়ে।

‘আমি তো কালকের খুশি আর আশা, আমারও তো সাধ আছে, আছে অভিলাষ/ ঘরে বেঁধে রেখো না, নিয়ে যাও এগিয়ে, আমি বাবা-মায়ের শত আদরের মেয়ে।’

কী সুন্দর এক প্রতিবাদের ভাষা। আজকাল চারপাশে প্রতিবাদের নানা রকম অদ্ভুত ভাষার মাঝে মীনাকে মনে পড়ে। খুব বেশি চিৎকার না করেও যে প্রতিবাদ করা যায় মীনা আমাদের তা-ই শিখিয়েছিল। মীনা, রাজু, মিঠু, লালী, রিতা আপারা আমাদের ছেলেবেলার গল্পের চরিত্র ছিল ঠিকই, কিন্তু তাদের গল্পগুলো ছিল আমাদের সমাজেরই গল্প—বাল্যবিবাহ, মেয়েদের স্কুলে না পাঠানো, পুষ্টিতে বৈষম্য, শিশুশ্রম, পণ, স্বাস্থ্য, নিরাপদ পানি আর অধিকারহীনতার গল্প।

মীনাকে কখনো হীরা-জহরত, খাবার কিংবা সিনেমার নায়িকা হওয়ার প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। অথচ সে বেছে নিয়েছিল নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্যকর স্যানিটেশন আর সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার মতো আপাত-সাধারণ বিষয়। মীনা বুঝেছিল, নিজের ভালো থাকার চেয়ে অনেক সময় সবার ভালো থাকা বেশি জরুরি।

এ কারণেই মীনা নিছক একটি কার্টুন ছিল না। ইউনিসেফ তাকে তৈরি করেছিল দক্ষিণ এশিয়ার মেয়েশিশুদের শিক্ষা, অধিকার ও বৈষম্যের প্রশ্নকে গল্পের মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে। ১৯৯০ থেকে ২০০০ সালকে ‘মেয়ে শিশুর দশক’ হিসেবে সামনে রেখে শুরু হয়েছিল এ উদ্যোগ। মীনার চেহারা, পোশাক ও জীবনযাপন নিয়ে চার দেশের শিল্পীরা সম্ভাব্য চরিত্রের নকশা তৈরি করেছিলেন এবং প্রথম দিকের চলচ্চিত্র তৈরির আগে ১০ হাজারের বেশি শিশুর মতামত নেয়া হয়েছিল।

মীনার নির্মাণ একক কোনো শিল্পীর কাজ নয়। ইউনিসেফ বাংলাদেশের যোগাযোগ বিভাগের প্রধান নীল ম্যাকি এ উদ্যোগের অন্যতম প্রধান ব্যক্তি ছিলেন। ভারতের কিংবদন্তি অ্যানিমেটর রাম মোহন মীনা, রাজু, মিঠু ও তাদের পরিবারের চরিত্র নকশা এবং স্টোরিবোর্ড তৈরির দায়িত্ব নেন। বাংলাদেশের ইউনিসেফের যোগাযোগকর্মী সামসুদ্দীন আহমেদ ‘মীনা’ নামটি প্রস্তাব করেন। বাংলাদেশের শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারের ‘পারুল’ পাপেট চরিত্রও মীনার ধারণার সঙ্গে যুক্ত ছিল। পারুল চরিত্রটি দেখে ‘মীনা টিম’ আগ্রহী হন এবং মীনা তৈরির প্রাথমিক ভাবনায় মনোয়ারের অবদান ছিল।

মীনার নির্মাণে তখনকার সময়ের প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতাও ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। রাম মোহনের নিজস্ব সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ‘পর্যাপ্ত অবকাঠামো না থাকায় প্রথম দিকের অ্যানিমেশন তৈরিতে ফিলিপাইনের ফিল কার্টুনস, ম্যানিলার সঙ্গে কাজ করেছিলাম। পরে অর্থ সংকটের কারণে সেই প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আসে এবং মুম্বাইয়ের “‍ফিউচার থটস”-এর সঙ্গে “‍ফ্ল্যাশ অ্যানিমেশন” ব্যবহার করে পরবর্তী পর্বগুলো তৈরি করা হয়।‘

অবশেষে ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত হলো মীনার প্রথম চলচ্চিত্র—‘মুরগিগুলো গুনে রাখো’। বাংলাদেশই ছিল মীনার প্রথম সম্প্রচারের দেশ। কিন্তু মীনা শুধু বাংলাদেশে সীমাবদ্ধ থাকেনি। বাংলা, ইংরেজি, হিন্দি, নেপালি ও উর্দুসহ একাধিক ভাষায় তৈরি হয় এবং বিভিন্ন দেশের ভাষায় অনুবাদ বা ডাব করা হয়। এমনকি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশেও মীনার পর্ব সম্প্রচারিত হয়েছে।

মীনা চরিত্রের কণ্ঠশিল্পী প্রমিতা গাঙ্গুলি মীনার স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘ক্লাস সিক্স-সেভেনে থাকা অবস্থায় আমি মীনার কণ্ঠ দেয়া শুরু করি। আমাকে স্কুলে অনেকেই মীনা ডাকত। চরিত্রটা আমার ভীষণ পছন্দ ছিল। পারিবারিক বন্ডিং থেকে শুরু করে সমাজের অনেক বিষয় খুব সহজভাবে মীনা তুলে ধরত। আমার মাঝে মাঝে মনে হতো আমিই মীনা।’

মীনা কার্টুনের সম্প্রচার নিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘আমি মনে করি মীনা কার্টুন চলমান থাকা উচিত। আমাদের প্রান্তিক অঞ্চলগুলোতে মীনার গ্রহণযোগ্যতা আছে। সেখানে আরো বেশি প্রচার করা উচিত। বিশেষ করে বাল্যবিবাহ ও নারীর শিক্ষাবিষয়ক সচেতনতায় মীনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। মীন যদি আবার কখনো শুরু হয়, আমি আবারো কণ্ঠ দিতে চাই।’

মীনা হঠাৎ একদিন বন্ধ হয়ে যায়নি, বরং তার নিয়মিত টেলিভিশন উপস্থিতি ধীরে ধীরে কমে গেছে। ইউনিসেফের একটি মূল্যায়নে ‘মীনা কমিউনিকেশন ইনিশিয়েটিভ’-এর ধীরগতির পেছনে অর্থ সংকট, নতুন কনটেন্টের অভাব, অনিয়মিত সম্প্রচার এবং উদ্যোগটির মালিকানা ও দায়িত্ব বণ্টনে স্পষ্ট কাঠামোর অভাবের কথা বলা হয়েছে। একই মূল্যায়নে বলা হয়েছে, নতুন নতুন কার্টুন ও শিশুদের বিনোদনের মাধ্যম জনপ্রিয় হয়ে ওঠায় মীনার সঙ্গে প্রতিযোগিতাও বেড়েছিল।

এখানে মীনার গল্পের সঙ্গে আমাদের শৈশবের গল্পটাও যেন মিশে যায়। একসময় কার্টুন দেখার জন্য নির্দিষ্ট সময়ের অপেক্ষা করতে হতো। এখন একটি শিশুর হাতে পুরো পৃথিবী—ইউটিউব, মোবাইল গেম, স্ট্রিমিং প্লাটফর্ম, অসংখ্য অ্যানিমেশন। বিনোদন বেড়েছে, কিন্তু সেই বিনোদনের ভেতর কতটা আমাদের সমাজের গল্প বলা হচ্ছে, কতটা শিশুকে প্রশ্ন করতে শেখানো হচ্ছে সেই প্রশ্নটি থেকেই যায়।

আরও