মেহেদী হাসান, গোলাম আলী, জগজিৎ সিং-এর পর গজল ঠাঁই পেয়েছিল তার কণ্ঠে। পঙ্কজ উদাসকে গজলের মায়েস্ত্রো হিসেবেই উল্লেখ করা হয়। ভারতীয় শিল্পীদের মধ্যে অন্যতম জেষ্ঠ্য এ গায়ক মারা গেলেন গতকাল। দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় ভুগছিলেন তিনি। মুম্বাইয়ে চিকিৎসাধীন ছিলেন এ সময়। সেখানেই মারা গেলেন ৭২ বছর বয়সে।
পঙ্কজ উদাসের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে তার পরিবার। তারা বলেন, ‘গভীর বেদনার সঙ্গে জানাচ্ছি, দীর্ঘদিনের অসুস্থতার পর পদ্মশ্রী পঙ্কজ উদাস ২৬ ফেব্রুয়ারি মারা গেছেন।’ ভারতীয় গণমাধ্যম দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে, গত কিছুদিন ধরে পঙ্কজ উদাসের অসুস্থতা খুবই বেড়ে গিয়েছিল। গতকাল বেলা ১১টার দিকে তিনি ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে মারা যান।
গুজরাতের জেতপুরে ১৯৫১ সালে জন্ম পঙ্কজ উদাসের। বাবা কেশুভাই উদাস ও মা জিতুবেন উদাস। তিন ভাইয়ের মধ্যে পঙ্কজ ছিলেন সবচেয়ে ছোট। তার বড় ভাই মনোহর উদাস বলিউডের সিনেমায় গান গাইতেন। কিছুটা পরিচিতি তিনি পেয়েছিলেন সেখানে। তবে মেজো ভাই নির্মল উদাস বেশ পরিচিত ছিলেন গজল শিল্পী হিসেবে। পঙ্কজও সংগীত জগতে আসবেন, তা নতুন কিছু ছিল না। আর সে বিষয় পঙ্কজ পেয়েছিলেন ছেলেবেলা থেকেই। কেশুভাই উদাসের সঙ্গে পরিচয় ছিল প্রখ্যাত বীণাবাদক আব্দুল করিম খানের। ছেলেবেলায় বাবাকে দিলরুবা বাজাতে দেখেছেন পঙ্কজ। তিন ভাইকেই তাদের বাবা ভর্তি করে দিয়েছিলেন রাজকোটের সংগীত একাডেমিতে। সেখানে ওস্তাদ কাদির খানের কাছে তবলা বাজানো শেখেন পঙ্কজ। পাশাপাশি হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতে হাতেখড়ি হয় তার।
পঙ্কজ উদাসের ক্যারিয়ারের শুরুটা আগ্রহজাগানিয়া। তার ভাই মনোহর উদাস স্টেজে পারফর্ম করতেন। সে সময় মনোহরের সাহায্যেই স্টেজে গান করেন পঙ্কজ। ‘চাঁদনী জেয়সা রাঙ হ্যায় তেরা’ পারফর্ম করেছিলেন তিনি। এছাড়া সিনো-ইন্ডিয়ান যুদ্ধের সময় তিনি ‘অ্যায় মেরে ওয়াতান কে লোগো’ গেয়ে ৫১ রুপি পেয়েছিলেন শ্রোতাদের একজনের কাছ থেকে। এর চার বছর পর তিনি সংগীত নাট্য একাডেমিতে ভর্তি হন।
পঙ্কজ উদাসের সত্যিকার ক্যারিয়ার শুরু হয় ১৯৮০ সালে। সে বছর প্রকাশ হয় তার প্রথম অ্যালবাম ‘আহট’। প্রথম অ্যালবামেই সাড়া পেয়েছিলেন। এরপর আর থামতে হয়নি। ২০১১ সাল পর্যন্ত ৩১ বছরে তার ৫০টির মতো পূর্ণাঙ্গ অ্যালবামের পাশাপাশি মোট ১০০ অ্যালবাম প্রকাশ হয়েছে। এর মধ্যে প্লেব্যাকও শুরু করেন তিনি। ১৯৮৬ সালে প্রথম প্লেব্যাক করেন পঙ্কজ। ‘নাম’ সিনেমায় ‘চিঠ্ঠি আয়ি হ্যায়’ দিয়ে দর্শক শ্রোতোদের কাঁদিয়েছিলেন পঙ্কজ। এরপর নব্বইয়ের দশকে অনেক সিনেমায়ই প্লেব্যাক করেছেন পঙ্কজ উদাস। গেয়েছেন লতা মঙ্গেশকর, সাধনা সারগম প্রমুখের সঙ্গে। তার আরেকটি বিশেষত্ব ছিল, তিনি সিনেমায় প্লেব্যাকের পাশাপাশি ওই গানের শিল্পী হিসেবে সিনেমায়ও থাকতেন।
প্লেব্যাক করলেও গজলের জন্যই বেশি পরিচিত পঙ্কজ উদাস। তিনি সংগীত শেখার সময় উর্দুও রপ্ত করেছেন। হিন্দি গানও অনেক সময় গেয়েছেন গজলের মতো করে। পাশাপাশি গেয়েছেন অনেক বাংলা গানও। ‘যদি আরেকটু সময় পেতাম’, ‘চোখ তার চোরাবালি’ শ্রোতাপ্রিয়। অন্যদিকে ‘চান্দি জ্যায়সা রঙ’, ‘না কাজরে কি ধার’, ‘দিওয়ারো সে মিল কর রোনা’, ‘আহিস্তা’, ‘থোরি থোরি প্যার করো’, নিকলো না বেনাকাব’ আজও ঘরে ঘরে বাজে। পঙ্কজের চিঠি হয়তো আর আসবে না, কিন্তু গানগুলো প্রতিদিনই বাজবে কোথাও না কোথাও।