গোয়েন্দা: বাংলা সাহিত্য থেকে সিনেমায়

চরিত্র থাকলেও গোয়েন্দা চলচ্চিত্র কম বাংলাদেশে

গোয়েন্দা গল্প সারা বিশ্বেই জনপ্রিয়। বাংলাদেশেও এ জনরার গল্প লুফে নেন পাঠক। সে কারণে এ দেশের সাহিত্যও পেয়েছে বেশ কয়েকজন গোয়েন্দা।

গোয়েন্দা গল্প সারা বিশ্বেই জনপ্রিয়। বাংলাদেশেও এ জনরার গল্প লুফে নেন পাঠক। সে কারণে এ দেশের সাহিত্যও পেয়েছে বেশ কয়েকজন গোয়েন্দা। গোয়েন্দার পাশাপাশি বাংলা সাহিত্যে আছে অ্যাডভেঞ্চারার। এগুলোকে গোয়েন্দা গল্প বলা যায় কিনা, তা নিয়ে তর্ক হতে পারে। তবে সুকুমার সেন তার ‘ক্রাইম কাহিনীর কালক্রান্ত্রি’ বইয়ে ‘ক্রাইম কাহিনী’র যে বৈশিষ্ট্যগুলো দিয়েছেন, এ গল্পগুলো তা ধারণ করে। সে কারণে বাংলা সাহিত্যের অনেক অ্যাডভেঞ্চার গল্প বা সাধারণ গল্পও গোয়েন্দা গল্প না হয়েও ক্রাইম কাহিনী হয়ে ওঠে। সেখানে রহস্য থাকে, রহস্যের সূত্র থাকে, অপরাধীও থাকে। এক বা একাধিক ব্যক্তি সূত্র অনুসরণ করে অপরাধী ধরেন। গোয়েন্দা গল্পের প্যাটার্নই এটা।

১৯২৯ সালে প্রকাশ হয় ‘এমিল উন্ড দ্য ডিটেক্টিভ’। জার্মান লেখক এরিখ কেস্টনারের বইটি ইংরেজিতে ‘এমিল অ্যান্ড দ্য ডিটেকটিভস’ নামে অনূদিত। বাংলায় অনূদিত হয় ‘এমিল ও তার গোয়েন্দা দল’ বা ‘এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী’ নামে। ১৯৮০ সালে বাদল রহমান এ নামেই একটি সিনেমা নির্মাণ করেন। এটি কোনোভাবেই বাংলা সাহিত্যের গোয়েন্দা গল্প নয়, কিন্তু অনুবাদ ও রূপান্তর করে গল্পটিকে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আনা হয়েছিল এবং নির্মাতা সিনেমাটিকে পুরোপুরি বাংলাদেশের করেই তৈরি করেন। সিনেমাটি আজও আলোচিত।

কিন্তু বাংলাদেশে গোয়েন্দা সিনেমা নির্মাণ হওয়ার ইতিহাস আরো পুরনো। সত্যজিৎ রায় পরিচালিত ‘সোনার কেল্লা’ মুক্তি পায় ১৯৭৪ সালে। একই বছর বাংলাদেশে মুক্তি পায় ‘মাসুদ রানা’। কাজী আনোয়ার হোসেনের কালজয়ী স্পাই মাসুদ রানাকে নিয়ে নির্মিত এ সিনেমা। পরিচালনা করেছিলেন মাসুদ পারভেজ। তিনি বাংলাদেশের সিনেমার সোহেল রানা নামেই বেশি পরিচিত। মাসুদ রানা সিনেমাটি তিনিই প্রযোজনার পাশাপাশি পরিচালনা করেন এবং নিজেই ছিলেন কেন্দ্রীয় চরিত্রে।

১৯৬৬ সালে যাত্রা ‘মাসুদ রানা’র। সত্তরের দশকে কাজী আনোয়ার হোসেন রচিত ‘মাসুদ রানা’র গল্পগুলো তরুণদের মধ্যে দারুণ জনপ্রিয়। মাসুদ রানা বাংলাদেশী স্পাই। এমন একটি চরিত্র পেয়ে পাঠকরা লুফে নিয়েছিল। সিরিজের ‘বিস্মরণ’ গল্পটি থেকে সোহেল রানা সিনেমা নির্মাণ করলেন। এতে তার পাশাপাশি অভিনয় করেন কবরী সরোয়ার, অলিভিয়া, গোলাম মোস্তফা, খলিল উল্লাহ খান, ফতেহ লোহানী। নায়করাজ রাজ্জাক ছিলেন অতিথি চরিত্রে। সিনেমার চিত্রনাট্য ও সংলাপ রচনা করেছিলেন কাজী আনোয়ার হোসেন।

মাসুদ রানার দুনিয়া এতটাই জৌলুশ ও থ্রিলারপূর্ণ যে সিনেমায় যেমন বাজেট প্রয়োজন, বাংলাদেশে তা ছিল না। তাই হয়তো মাসুদ রানার মতো চরিত্র নিয়ে পরে আর সিনেমা হয়নি। ২০২৩ সালে আসিফ আকবর নির্মাণ করেন ‘এমআর-৯: ডু অর ডাই’। মাসুদ রানার প্রথম বই ‘ধ্বংস পাহাড়’ অবলম্বনে এটি নির্মিত। সিনেমাটিতে হলিউডের নানা সহায়তা নেয়ার পাশাপাশি বড় বাজেটে নির্মাণ করা হয় অনেক দিন ধরে। মাসুদ রানা চরিত্রে এবিএম সুমনকে নিয়ে অনেকের আশাবাদ থাকলেও তা পূরণ হয়নি। সিনেমাটির সমালোচনাই করেছেন বেশির ভাগ দর্শক।

হুমায়ূন আহমেদের বিখ্যাত চরিত্র মিসির আলী। তাকে গোয়েন্দা বলতে রাজি হবেন না কেউ। কিন্তু মিসির আলীও রহস্য সমাধান করে। সে হিসেবে এতে গোয়েন্দা গল্পের ছাপ আছে। হুমায়ূন আহমেদের ‘দেবী’ অবলম্বনে ২০১৮ সালে অনম বিশ্বাস নির্মাণ করেন একই নামের সিনেমা। মিসির আলী চরিত্রে ছিলেন চঞ্চল চৌধুরী ও রানু চরিত্রে জয়া আহসান। এ সিনেমা নিয়েও দর্শকের মধ্যে আছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। সবাই পছন্দ করেনি এটি।

বাংলাদেশের শিশু-কিশোরদের এককালে বুঁদ করে রেখেছিলেন মুহম্মদ জাফর ইকবাল। তার বহু উপন্যাস কিশোরমন মাতিয়েছে। এর মধ্যে ‘দীপু নাম্বার টু’ থেকে নির্মাণ হয়েছে সিনেমা। এটিকে গোয়েন্দা গল্প বলা যায় না, কিন্তু এখানেও রহস্য সমাধানের বিষয় আছে। কিশোর মানস নিয়ে গল্প শুরু হয়ে এক সময় তা রহস্য সমাধানের দিকে যায়। দীপু তার বন্ধু তারেকের সঙ্গে মিলে কালাচিতার মাধ্যমে চোরাকারবারীদের ধরে। সেখানে তারা গোয়েন্দাসুলভ কাজই করেছে।

১৯৯৬ সালে সিনেমাটি নির্মাণ করেন মোরশেদুল ইসলাম। এতে দীপু চরিত্রে অরুণ সাহা ও তারিক চরিত্রে অভিনয় করেছেন সুভাশীষ রায়। দীপুর বাবা বুলবুল আহমেদ, মা ববিতা ও তারিকের মা চরিত্রে ছিলেন ডলি জহুর। জামশেদ চরিত্রে খলনায়ক ছিলেন গোলাম মোস্তফা।

ফরিদুর রেজা সাগর ছোটদের জন্য লিখেছেন ‘ছোটকাকু’ সিরিজ। এ সিরিজ থেকে চ্যানেল আইয়ে তৈরি হয়েছে বেশ কয়েকটি ধারাবাহিক ও খণ্ড নাটক। ছোটকাকু চরিত্রে অভিনয় করেছেন আফজাল হোসেন। নির্দেশনায়ও বেশির ভাগ সময় ছিলেন তিনি। সিনেমাও নির্মাণ হয়েছে। ‘মানিকগঞ্জের মানিক প্যালেস’ এ বছর কলকাতা ইন্টারন্যাশনাল চিলড্রেনস ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে প্রদর্শন হয়েছে। ছোটকাকু এ দেশের শিশু-কিশোরদের মধ্যে জনপ্রিয়।

১৯৭৪ সালে শুরু হলেও বাংলাদেশে গোয়েন্দা চরিত্র থেকে চলচ্চিত্র হয়েছে কম। তিন গোয়েন্দার মতো জনপ্রিয় কিশোর সিরিজ থাকলেও তা থেকে সিনেমা হয়নি। ২০১৪ সালে মাছরাঙা টেলিভিশনে এসেছিল তিন গোয়েন্দার ধারাবাহিক নাটক। এরপর আর কোনো সাড়াশব্দ ছিল না। গোয়েন্দা গল্প কম নেই বাংলাদেশে। কিন্তু এ থেকে সিনেমা না হওয়ার অন্যতম কারণ বাজেট স্বল্পতা। তবে কভিড-পরবর্তী সময়ে সিনেমার যে উন্নতি হচ্ছে, আশা করা যায় গোয়েন্দা গল্প থেকেও সিনেমা নির্মাণ হবে এখানে।

(সমাপ্ত)

আরও