বাংলা সাংবাদিকতার ইতিহাসে যারা শব্দকে তীব্রতর অস্ত্রে পরিণত করতে পেরেছিলেন, কাজী নজরুল ইসলাম তাদের অন্যতম। সাংবাদিকতায় এসে উপনিবেশিক সমাজের বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছেন তিনি। বিদ্রোহী কবির কাছে সাংবাদিকতা ছিল বিদ্রোহ, প্রতিরোধ, কালি আর শব্দকে অস্ত্র করে এক যুদ্ধ।
বিশ শতকের শুরুর বাংলার রাজনৈতিক অস্থিরতার ভেতর, যখন ব্রিটিশ শাসন কেবল ভূখণ্ডই নয়, মানুষের চিন্তা ও কল্পনাকেও নিয়ন্ত্রণ করছিল, তখন নজরুল আবির্ভূত হন এক আপসহীন কণ্ঠস্বর হিসেবে। ‘ধূমকেতু’ ও ‘লাঙল’-এর মতো পত্রিকার মাধ্যমে তিনি বাংলা সাংবাদিকতার ভাষা, উদ্দেশ্য এবং আবেগ-সবকিছুকেই বদলে দেন। সাময়িকপত্রকে পরিণত করেছিলেন বিপ্লবের মঞ্চে, সাহিত্যকে দিয়েছিলেন সরাসরি রাজনৈতিক স্পন্দন।
এক বিপ্লবী সাংবাদিকের জন্ম
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে কাজ করার পর, নজরুল ১৯২০ সালের দিকে কলকাতায় ফিরে আসেন এবং সাহিত্য ও সাংবাদিকতার জগতে জড়িয়ে পড়েন। সেই সময়ের কলকাতা ছিল রাজনৈতিকভাবে উত্তাল। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন জোরালো হচ্ছিল, বিপ্লবী সংগঠনগুলো সক্রিয় হয়ে উঠছিল, আর বুদ্ধিজীবীরা ভারতবর্ষের ভবিষ্যৎ নিয়ে তর্ক-বিতর্কে ব্যস্ত ছিলেন। নজরুল এই পরিবেশে প্রবেশ করেছিলেন এক বিস্ফোরক শক্তি হিসেবে।
তিনি ‘নবযুগ’, ‘মোসলেম ভারত’, ‘বিজলী’, ‘সেবক’সহ বিভিন্ন পত্রিকায় কাজ করেছেন। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বুঝতে পারেন, তার সাংবাদিকতা প্রচলিত সংবাদপত্রের মতো হবে না। কাজী নজরুল ইসলাম ভদ্র, সংযত জাতীয়তাবাদ কিংবা দূরত্ব বজায় রাখা বুদ্ধিবৃত্তিক ভাষা প্রত্যাখ্যান করেন। তার ভাষা ছিল আবেগময়, অগ্নিমুখর এবং শব্দ-সংঘর্ষে বিশ্বাসী। যখন অধিকাংশ সংবাদপত্র ঔপনিবেশিক আক্রমণের ভয়ে সতর্ক রাজনৈতিক অবস্থান নিত, নজরুল তখন বেছে নেন সরাসরি প্রতিরোধের পথ। তার সাংবাদিকতা কথা বলেছিল ব্রিটিশ শোষণ, সামাজিক বৈষম্য, সাম্প্রদায়িক বিভেদ, শ্রেণি-নিপীড়ন এবং উপনিবেশিত মানসিক দাসত্বের বিরুদ্ধে। বিশ্বাস করতেন— সাহিত্য ও সাংবাদিকতার দায়িত্ব শুধু নান্দনিকতা নয়, এর একটি নৈতিক কর্তব্যও আছে। এই বিশ্বাসই সবচেয়ে তীব্র রূপ নেয় ‘ধূমকেতু’র মাধ্যমে।
ধূমকেতু: উপনিবেশিক বাংলার আকাশে জ্বলে ওঠা অগ্নিপুচ্ছ
১৯২২ সালের ১১ আগস্ট কলকাতা থেকে নজরুল প্রকাশ করেন সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘ধূমকেতু’। নামের মধ্যেই ছিল গভীর প্রতীকী শক্তি। ধূমকেতু-যা হঠাৎ এসে অন্ধকার চিরে ফেলে, আকাশে আগুনের রেখা টেনে যায়, স্থিরতাকে ভেঙে দেয়। ঠিক সেটাই ছিল নজরুলের উদ্দেশ্য।
পত্রিকাটি প্রকাশিত হয় ব্রিটিশ ভারতের এক অত্যন্ত স্পর্শকাতর রাজনৈতিক সময়ে। অসহযোগ আন্দোলন তখন দুর্বল হয়ে পড়েছে, অনেক জাতীয়তাবাদী নেতা কারাগারে, আর তরুণ বাঙালিদের মধ্যে জমছে হতাশা ও ক্ষোভ। সেই সময় ‘ধূমকেতু’ আবির্ভূত হয় এক প্রকাশ্য বিদ্রোহের ঘোষণাপত্র হিসেবে।
এমনকি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজেও পত্রিকাটিকে স্বাগত জানিয়ে আশীর্বাদবার্তা পাঠিয়েছিলেন। শুরুর দিক থেকেই ‘ধূমকেতু’ মূলধারার সাংবাদিকতার সংযত ভাষা ভেঙে দেয়। এর পাতায় প্রকাশিত হতে থাকে বিপ্লবী সম্পাদকীয়, রাজনৈতিক প্রবন্ধ, কবিতা, ব্যঙ্গ ও প্রতিরোধের আহ্বান। এই সংমিশ্রণ বাংলা সাংবাদিকতাকে আমূল পরিবর্তন আনে।
সাংবাদিকতা হয়ে উঠল সংগ্রামের ময়দান
‘ধূমকেতু’র আগে বাংলা সাংবাদিকতা রাজনৈতিকভাবে সচেতন হলেও তার ভঙ্গি ছিল তুলনামূলক সংযত। জাতীয়তাবাদ ছিল, কিন্তু তা অনেক সময় কূটনৈতিক ভাষা বা ধীরগতির সংস্কারবাদে আবৃত থাকত। নজরুল সেই সংযম ভেঙে দিলেন।
তার সম্পাদকীয়গুলো স্বাধীনতার অনুরোধ নয়, বরং স্বাধীনতার দাবি রাখত। বিদ্রোহী কবি সংস্কারের কথা বলেননি, বলেছেন মুক্তির কথা। তার ভাষা তরুণ পাঠকদের মধ্যে বিস্ফোরিত করেছিল এক নতুন ক্রোধ, যারা ধীরে ধীরে আপসের রাজনীতিতে ক্লান্ত হয়ে উঠছিল।
নজরুল খুব গভীরভাবে বুঝেছিলেন, উপনিবেশবাদ কেবল অস্ত্রের জোরে টিকে থাকে না। এটি মানুষের মনে ভয় তৈরি করেও টিকে থাকে। তাই রাজনৈতিক স্বাধীনতার আগে দরকার মানসিক দাসত্ব ভাঙা। ‘ধূমকেতু’ সেই কাজটিই করার চেষ্টা করেছিল।
আনন্দময়ীর আগমনে এবং ব্রিটিশ শাসনের আতঙ্ক
নজরুলের সাংবাদিকজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত আসে ১৯২২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। ‘ধূমকেতু’র শারদীয় সংখ্যায় তিনি প্রকাশ করেন কবিতা ‘আনন্দময়ীর আগমনে’। বাইরে থেকে এটি দেবী দুর্গার আগমনের কবিতা মনে হলেও, এর ভেতরে ছিল ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবের সরাসরি আহ্বান। এখানে দুর্গা কেবল ধর্মীয় প্রতীক নয়, হয়ে উঠেছিল ধ্বংসের রাজনৈতিক শক্তি। ব্রিটিশ সরকার দ্রুতই এর অন্তর্নিহিত বার্তা বুঝতে পারে। কবিতাটিকে রাষ্ট্রদ্রোহী ঘোষণা করা হয়।
পুলিশ ‘ধূমকেতু’র অফিসে অভিযান চালায়, নজরুলকে গ্রেফতার করা হয়, এবং তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা করা হয়। ১৯২৩ সালের জানুয়ারিতে তাকে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয়। এই কারাবাস নজরুলকে কেবল লেখক হিসেবে নয়, প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করে।
কারাগারে বসেই তিনি লেখেন বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’, যেখানে তিনি অত্যাচারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের নৈতিক অধিকারকে ব্যাখ্যা করেন। কারাগারও তাঁকে নীরব করতে পারেনি।
জাতীয়তাবাদের বাইরে: নজরুল ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দর্শন
নজরুলের সাংবাদিকতার সবচেয়ে অসাধারণ দিকগুলোর একটি ছিল সাম্প্রদায়িক বিভাজনকে প্রত্যাখ্যান। ব্রিটিশ শাসন ভারতবর্ষে হিন্দু-মুসলমান বিভেদকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করত। ১৯২০-এর দশকে বাংলাজুড়ে সেই উত্তেজনা দ্রুত বাড়ছিল। নজরুল ওই বিভাজনের বিরুদ্ধে দাঁড়ান বিস্ময়কর সাহস নিয়ে। ‘ধূমকেতু’-তে যেমন ইসলামি আধ্যাত্মিকতা এসেছে, তেমনি এসেছে হিন্দু পুরাণ। ফারসি প্রতীক যেমন ছিল, তেমনি ছিল সংস্কৃত ভাবধারা। বিপ্লবী জাতীয়তাবাদের পাশে ছিল মানবতাবাদ। এই সমন্বয় নিজেই ছিল এক বিপ্লব।
নজরুল কখনো বাঙালি পরিচয়কে সাম্প্রদায়িক সীমানার মধ্যে বন্দি হতে দেননি। তিনি এমন এক বাংলার কল্পনা করেছিলেন, যেখানে বৈচিত্র্য বিভাজনের নয়, শক্তির উৎস। যখন রাজনীতি ক্রমশ মানুষকে আলাদা করছিল, তখন নজরুলের সাংবাদিকতা মানুষকে একসঙ্গে দাঁড়ানোর ভাষা দিচ্ছিল।
লাঙল: শ্রমিক ও কৃষকের কণ্ঠস্বর
যদি ‘ধূমকেতু’ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক বিদ্রোহের প্রতীক হয়, তবে ‘লাঙল’ ছিল সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ভাষা। ১৯২৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর প্রকাশিত হয় ‘লাঙল’। এটি ‘শ্রমিক স্বরাজ পার্টি’-সংশ্লিষ্ট একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা।
যেখানে ‘ধূমকেতু’ জাতীয়তাবাদী বিপ্লবকে জাগিয়ে তুলেছিল, সেখানে ‘লাঙল’ নজরুলকে নিয়ে যায় শ্রেণিসংগ্রাম, শ্রমিক অধিকার, কৃষকের বঞ্চনা এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যের প্রশ্নে। এটি বাংলা সাংবাদিকতায় আরেকটি বড় পরিবর্তনের সূচনা করে।
নজরুল যে পরিবর্তন এনে দিয়েছিলেন
নজরুলের সাংবাদিকতার গুরুত্ব কেবল কয়েকটি পত্রিকা প্রকাশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তার আসল গুরুত্ব নিহিত আছে বাংলা সমাজের চিন্তা ও চেতনায় আনা পরিবর্তনের মধ্যে। তিনি অন্তত চারটি বড় পরিবর্তন ঘটিয়েছিলেন।
প্রথমত, তিনি সাংবাদিকতাকে নিছক তথ্য পরিবেশন থেকে আবেগজাগানিয়া শক্তিতে পরিণত করেন। তার লেখা মানুষকে শুধু জানাত না, নাড়িয়ে দিত।
দ্বিতীয়ত, সাহিত্য ও রাজনৈতিক আন্দোলনকে যুথবদ্ধ করেন নজরুল। কবিতা হয়ে ওঠে প্রতিরোধের ভাষা, সম্পাদকীয় হয়ে ওঠে সংগ্রামের আহ্বান।
তৃতীয়ত, বাংলা সাংবাদিকতার নৈতিক পরিসরের বিস্তৃতিন। নজরুল শুধু উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে নয়, বৈষম্য, সাম্প্রদায়িকতা এবং সামাজিক অবিচারের বিরুদ্ধেও লড়েছেন। রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা, নজরদারি, সেন্সরশিপ, কারাবাস-কিছুই তাকে থামাতে পারেনি। এই নৈতিক সাহসই তার উত্তরাধিকারের অন্যতম বড় অংশ হয়ে আছে।