সুপারহিরোদের পেছনের কারিগর ওয়াহিদ রেজা

হলিউডের স্পাইডারম্যান সিরিজির নতুন সিনেমা স্পাইডার-ম্যান: নো ওয়ে হোম-এ কাজ করছেন ঢাকার ছেলে ওয়াহিদ ইবনে রেজা। চলতি বছর জুলাইয়ে নতুন এ সিনেমা বড় পর্দায় মুক্তি পাওয়ার কথা থাকলেও করোনার করণে তা পিছিয়ে যায়।

হলিউডের স্পাইডারম্যান সিরিজির নতুন সিনেমা স্পাইডার-ম্যান: নো ওয়ে হোম- কাজ করছেন ঢাকার ছেলে ওয়াহিদ ইবনে রেজা। চলতি বছর জুলাইয়ে নতুন সিনেমা বড় পর্দায় মুক্তি পাওয়ার কথা থাকলেও করোনার করণে তা পিছিয়ে যায়।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল ডোমেইনের হয়ে স্পাইডার-ম্যান: নো ওয়ে হোম সিনেমার ভিজ্যুয়াল ইফেক্টস ডিজিটাল প্রডাকশনের দায়িত্বে কাজ করছেন ওয়াহিদ।

কয়েক সপ্তাহ আগে মুক্তির অপেক্ষায় থাকা সিনেমাটির ট্রেইলার নিজের ফেসবুক ওয়ালে শেয়ার করে তিনি লেখেন, তিন মাস ধরে সিনেমার কাজে যুক্ত আছেন। এর আগেও কয়েকটি হলিউড সিনেমার প্রডাকশন ম্যানেজার হিসেবে কাজ করেছেন।

স্পাইডারম্যান সিনেমা নিয়ে ফেসবুকে ওয়াহিদ রেজা আরো লেখেন, আমি সবসময়ই স্পাইডারম্যানের ভক্ত ছিলাম। তিনি কমিকস অথবা হাস্যকরভাবে প্রথম হিরো ছিলেন সেজন্য নয়। আমার নিজের ভেতর থেকেই এসেছে। হাস্যকর শিশু হওয়া ছাড়াও তিনি বিজ্ঞানে ভালো ছিলেন। আমার মাথায় সবসময়ই তিনি ছিলেন।

তিনি আরো লেখেন, আমি সবসময় স্পাইডারম্যানে কাজ করতে চেয়েছি। স্পিডি অ্যান্ড হিজ অ্যামেইজিং ফ্রেন্ডের প্রিস্কুল সিরিজের সিনেমায় আমি টেস্টও দিয়েছিলাম। আমি এখন আসন্ন সিনেমায় কাজ করছি। স্পাইডারম্যান সিরিজের এই নতুন সিনেমায় কাজ করতে পেরে আমি গর্বিত।

পরিশেষে ওয়াহিদ রেজা লেখেন, আমি আর সিনেমাটি হিট হওয়ার অপেক্ষা করতে পারছি না।

এদিকে সিনেমায় কাজ করার কথা শোনার পর অনেকেই ওয়াহিদ রেজাকে বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত বলেছেন। ব্যাপারে খোলাসা করেন তিনি। বলেন, এটা একটা খুব অদ্ভুত ব্যাপার হলো। অনেকে বলা শুরু করলেন, আমি নাকি বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত। বাংলাদেশে জন্ম মানুষ হওয়া আমার জন্য ব্যাপারটা যথেষ্ট লজ্জার। প্রথমে মনে করলাম কিছু বলব না কিন্তু তখনই মনে পড়ল একটা ঘটনা।

তখন নতুন নতুন মাথার চুল পড়ে যাচ্ছে। মনের দুঃখে লম্বা দাড়ি রেখে ঘুরে বেড়াচ্ছি। কীভাবে যেন একটা পাগড়ি জোগাড় করে ফেললাম। বেগুনি রঙের চূর্ণী কাপড়ের পাগড়ি পরে ঘুরে বেড়াতাম। বনানী ১১ নাম্বারে আমার গাড়ি পুলিশে আটকাল। পুলিশ ভাই গাড়ির পেছনে আমাকে দেখে খুব সময় নিয়ে পর্যবেক্ষণ করলেন। তারপর গলা নামিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন,

-ভাই কি দেশী?

আমি পাল্টা গম্ভীর গলায় উত্তর দিলাম,

-না, ফার্মের!       

বাংলাদেশী সবুজ পাসপোর্ট হাতে নিজের একটা ছবি পোস্ট করে ওই পোস্টে তিনি আরো লেখেন, আমি যে বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত না, প্রমাণ করার জন্য ভাবলাম আমার বাংলাদেশী পাসপোর্ট নিয়ে একটা ছবি তুলি। সপ্তাহে আমার কানাডায় কাজের নয় বছর পূর্তি হলো! নয় বছরে স্যুটসের সেই প্রথম ইন্টার্নশিপ থেকে শুরু করে এখন নো ওয়ে হোম, বাংলাদেশী পাসপোর্ট নিয়ে জার্নিটা আল্লাহর রহমতে খারাপ হয়নি।

ওয়াহিদ ইবনে রেজাকে সবাই বাপ্পি নামে চেনেন। কিন্তু বন্ধু, পরিবার কলিগদের কাছে তিনি একজন লেখক, অভিনেতা ফিল্মমেকার হিসেবে পরিচিত। নটরডেম কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করেছেন। এরপর বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে বিএসসি শেষে ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলাম্বিয়া থেকে সিনেমা নির্মাণ বিষয়ে ডিগ্রি নেন।

রেজা ২০১৩ সালে হলিউডে কাজ শুরু করেন বার্ডেল অ্যানিমেশন স্টুডিওতে

রিক অ্যান্ড মরটি অ্যানিমেটেড সিরিজে প্রডাকশন সহকারী হিসেবে। পরে কাজ করেন ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার এমিপিস ম্যাথোড স্টুডিওতে। ২০১৭ সালে তিনি সনি পিকচার্স ইমেজ ওয়ার্কসে যোগ দেন অ্যাসোসিয়েট প্রডাকশন ম্যানেজারের পদে।

হলিউডের সুপার হিরোদের পেছনের কারিগর বলা হয় ওয়াহিদ রেজাকে। ভিজ্যুয়াল ইফেক্টস, প্রডাকশন, ডিজিটাল, সাবটাইটেলসহ নানাভাবে যুক্ত থাকছেন হলিউডের ছবির সঙ্গে। সর্বশেষ তিনি এক্সট্রাকশন সিনেমার সাবটাইটেল পরামর্শক ছিলেন। কাজ করেছেন হলিউডের বিখ্যাত ছবি গার্ডিয়ানস অব দ্য গ্যালাক্সি ভলিউম টুর ভিজ্যুয়াল ইফেক্টস টিমে, ব্যাটম্যান ভার্সেস সুপারম্যান: ডন অব জাস্টিস ছবির প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর, ক্যাপ্টেন আমেরিকা: সিভিল ওয়ার ডক্টর স্ট্রেঞ্জ ছবির ভিজ্যুয়াল টিমে কাজ করেছেন। ওয়াহিদ এমি পুরস্কার বিজয়ী রিক অ্যান্ড মরটি এবং গেম অব থ্রোনস, অস্কার মনোনয়নপ্রাপ্ত সিনেমা ডক্টর স্ট্রেঞ্জ, গার্ডিয়ান্স অব দ্য গ্যালাক্সি ভলিউম টু, ব্ল্যাক প্যান্থার অ্যাভেঞ্জার্স: ইনফিনিটি ওয়ারে কাজ করেছেন।

ওয়াহিদ ইবনে রেজা বাংলায় প্রথম ত্রিমাত্রিক অ্যানিমেশন কার্টুন সিরিজ চাচা বাহিনীর আজব কাহিনীর প্রযোজক মুক্তিযোদ্ধা বাবার প্রতি অনুপ্রাণিত হয়ে বাংলাদেশের প্রথম মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক দ্বিমাত্রিক অ্যানিমেশন চলচ্চিত্র সারভাইভিং: ৭১ তৈরি করেন।

হোয়াট অ্যাম আই ডুয়িং হেয়ার (২০১৩) স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রটির জন্য তিনি সারি ফিল্ম ফেস্টিভাল ২০১৪- বেস্ট স্টুডেন্ট ফিল্ম পুরস্কার অর্জন করেন। মন্ট্রিল ওয়ার্ল্ড ফিল্ম ফেস্টিভালে তিনি বেস্ট স্টুডেন্ট ফিল্ম পুরস্কার পান। ২০১৫ সালে এডমন্ড ফিল্ম ফেস্টিভালে আবারো বেস্ট স্টুডেন্ট ফিল্ম পুরস্কার পান। দ্য গোল্ডেন এগ ফিল্ম ফেস্টিভালে হোয়াট অ্যাম আই ডুয়িং হেয়ার (২০১৩) শর্ট ফিল্মটি বেশ আলোচিত হয় এবং সুনাম অর্জন করে। তিনি ফিল্মটিতে নিজের জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো তুলে ধরেছেন নান্দনিক উপায়ে। ফিল্মের জন্যই তিনি জফি অ্যাওয়ার্ডে সেরা স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র, সেরা অভিনেতা, সেরা পরিচালক সেরা অরিজিনাল স্ক্রিন প্লে বিভাগে মনোনীত হন।

আরও