রবীন্দ্রসংগীতে সাদি মহম্মদ পরিচিত নাম। বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনে তিনি একটি বিশেষ স্থানে আছেন। সাদি মহম্মদ একাধারে একজন গায়ক, সুরকার ও সংগীত কর্মী। বুধবার রাতে মারা গেছেন তিনি। ধারণা করা হচ্ছে আত্মহত্যা করেছেন। কোন ক্ষোভ বা বেদনা হতে এ কাজ করলেন সাদি তা এখনো রহস্য । সে রহস্য উদযাটন আমাদের কর্ম নয়। তবে সাদি মহম্মদের জীবন ও সংগীতযাত্রাটা জানার চেষ্টা করা যায়।
সাদি মহম্মদের জন্ম ১৯৫৭ সালের ৪ অক্টোবর। তিনি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন রবীন্দ্রসংগীত নিয়ে। সংগীতের সঙ্গেই ছিলেন আজীবন। বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে রবীন্দ্রসংগীতে স্নাতক হওয়ার পর স্নাতকোত্তর ডিগ্রিও লাভ করেন। একটি সূত্র থেকে জানা যায়, ১৯৭৩ সালে বুয়েটে ভর্তি হয়েছিলেন তিনি। পারিবারিক কারণেই এ পদক্ষেপ। ভর্তি হয়েছিলেন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে। কিন্তু সেখানে মন বসেনি। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াকালে ১৯৭৫ সালে স্কলারশিপ নিয়ে শান্তিনিকেতনে সংগীত নিয়ে পড়তে যান। সেই থেকে পথচলা সংগীতের সঙ্গে।
নিয়মিত গাইতেন রবীন্দ্রসংগীত। নানা গানের আসরের পাশাপাশি অ্যালবামও প্রকাশ করেছেন সাদি মহম্মদ। এরপর আবির্ভাব হয় সুরকার হিসেবে।২০০৭ সালে ‘আমাকে খুঁজে পাবে ভোরের শিশিরে’ অ্যালবামের মাধ্যমে তিনি সুরকার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ২০০৯ সালে তার ‘শ্রাবণ আকাশে’ ও ২০১২ সালে তার ‘সার্থক জনম আমার’ অ্যালবাম প্রকাশ হয়।
সাদি মহম্মদের পিতা শহীদ সলিম উল্লাহ। তিনি ছিলেন, নানা সামাজিক আন্দোলন ও কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত। মোহাম্মদপুরের একটি সড়কের নামকরণ করা হয়েছে তার নামে। সলিম উল্লাহ শহীদ হয়েছিলেন অবাঙালিদের হাতে। ঘটনাটি ঘটে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ। এর আগে থেকেই সলিম উল্লাহর পরিবার স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সঙ্গেও ছিল তাদের সখ্য।
মোহাম্মদপুর তাজমহল রোডের সি-১২/১০ নম্বর বাড়িতে থাকতেন সাদি মহম্মদ ও তার পরিবার। ৭১-এর ২২ মার্চ রাতে নিজেদের বাড়িতে বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়েছিলেন সাদিরা। সেদিন থেকেই অবাঙালিদের সরাসরি টার্গেটে পরিণত হন তারা। ২৬ মার্চ তাদের হাতেই তার বাবা মৃত্যুবরণ করেন। একই সঙ্গে খুন হন তার ভাই। সাদি মহম্মদের বাবা শায়িত আছেন মোহাম্মদপুর জামে মসজিদ কবরস্থানে।
সাদি মহম্মদরা ছিলেন ১০ ভাইবোন। তাদের মা জেবুন্নেসা সলিমউল্লাহ মুক্তিযুদ্ধের পর সন্তানদের নিয়ে আরেক যুদ্ধ শুরু করেন। সাদি মহম্মদ এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ওই সময় তিনি ও তার ভাই শিবলী মহম্মদ টিউশনি করে সংসারে সাহায্য করতেন।
এরপর সুসময়ও এসেছিল। সাদি মহম্মদ পরিণত হন বাংলাদেশের অন্যতম গুণী রবীন্দ্রসংগীত শিল্পীতে। তার ভাই শিবলী মহম্মদও নাচের কিংবদন্তি। ৫০-এর বেশি গানের অ্যালবাম প্রকাশ হয়েছে সাদির। সেই সঙ্গে নানা সময় বিদেশে গান গাইতে গিয়েছেন। করেছেন স্টেজ শো। ২০১২ সালে তাকে আজীবন সম্মাননা প্রদান করেছে চ্যানেল আই। ২০১৫ সালে বাংলা একাডেমি দিয়েছে রবীন্দ্র পুরস্কার।
সাংস্কৃতিক সংগঠন রবিরাগের প্রধান ছিলেন সাদি। এ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বহুজনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। আছেন অনেক শুভানুধ্যায়ী। কিন্তু এহেন সাদি কেন আত্মহত্যা করবেন?
অনেকেই জানিয়েছেন, তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন। গত বছর ৮ জুলাই তার মা মারা যান। এর পর থেকেই মানসিক অবসাদে ভুগছিলেন তিনি। মা হারানোর বেদনা তাকে কষ্ট দিয়েছিল। এক সাক্ষাৎকারে সাদি বলেছিলেন, ‘সবাই কেবল আমার বাবার কথা জানতে চায়। কিন্তু আমার মায়ের কথা কেউ জানতে চায় না। ৯৬ বছর বয়সে এখনো আমার মা বেঁচে আছেন, সেই ভয়াল স্মৃতি বুকে নিয়ে।’
সাদি মহম্মদও হয়তো অনেক স্মৃতি আর বেদনা বুকে নিয়ে চলে গেলেন। দর্শক শ্রোতাদের তিনি দিতে পারতেন আরো অনেক কিছু। তাকেও দেয়ার ছিল অনেক।