মাত্র ১৬ বছর বয়সে চলচ্চিত্রে যাত্রা অপর্ণা সেনের। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের উপন্যাস অবলম্বনে সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্র ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’ (১৯৭০) দিয়ে অভিনয় শুরু করেন তিনি। পরবর্তী সিনেমা ‘বসন্ত বিলাপ’। এর বহু বছর পর ২০১০ সালে ইতি মৃণালিনী। একের পর এক সিনেমায় সফলতার সঙ্গে অভিনয় করেছেন। পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। সিনেমায় তিনি এখন কিংবদন্তি। সে কিংবদন্তিকে নিয়ে এবার তথ্যচিত্র তৈরি করলেন নির্মাতা সুমন ঘোষ।
সুমন ঘোষ পরিচালনা করেছেন ‘পরমা—এ জার্নি উইথ অপর্ণা সেন’। তথ্যচিত্রটি মুক্তি পেয়েছে গত ৩১ জানুয়ারি। ফ্লোরিডার আটলান্টিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতির শিক্ষক সুমন বেশ কয়েকটি সিনেমাও পরিচালনা করেছেন। তার পরিচালিত সিনেমা নোবেল চোর (২০১২), আধার (২০১৯) ও কাবুলিওয়ালা (২০২৩)। অমর্ত্য সেনের সঙ্গে কথোপকথনের ভিত্তিতে তিনি ২০১৭ সালে তৈরি করেছেন ডকুমেন্টারি ‘দি আর্গুমেন্টেটিভ ইন্ডিয়ান’।
২০১২ সালে সুমন ঘোষের পরিচালিত সিনেমা বসু পরিবার। সেখানে অভিনয় করেছিলেন অপর্ণা সেন। সুমন ঘোষ ও অপর্ণা সেনের মধ্যে বন্ধুত্ব তৈরি হয়েছিল এ সিনেমার মধ্য দিয়েই। ফলে পরমা তৈরি হয়েছে।
স্ক্রল ডটইনকে সুমন বলেন, ‘সাত-আট বছর হবে আমাদের বন্ধুত্বের এবং আমার এমন একটি সম্পর্ক আছে অপর্ণার সঙ্গে, যেটি তাকে কাজের জায়গায় অনেক বেশি সুরক্ষিত ও স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করায়।’ নতুন এ সিনেমা নিয়ে সুমন ঘোষ বলেন, ‘আমি ভেবেছি একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য ডকুমেন্টারি তৈরি করা উচিত আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য।’ অপর্ণা সেনের প্রশংসা করে তিনি বলেন, ‘আজকাল সত্যিকার অর্থে আমরা এমন শিল্পী খুব কমই খুঁজে পাই।’
এক দশক সফলভাবে সিনেমায় অভিনয়ের পাশাপাশি অপর্ণা সেন ১৯৮১ সাল থেকে সিনেমা পরিচালনায় আগ্রহী হয়ে ওঠেন। তার পরিচালিত প্রথম সিনেমা ৩৬ চৌরঙ্গি লেন। সিনেমাটি ভারতীয় সিনেমায় এক নতুন মাত্রা যোগ করেছিল। এ সিনেমার জন্য তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছিলেন শ্রেষ্ঠ পরিচালক হিসেবে। এর পরও তিনি অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে বেশকিছু সিনেমা পরিচালনা করেছেন। আরো বেশকিছু সিনেমার সাফল্য তাকে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এনে দিয়েছে।
পরমা—এ জার্নি উইথ অপর্ণা সেনের প্রিমিয়ার হয়েছে ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল রটারডামে। তথ্যটিত্রে ৭৮ বছর বয়সী অপর্ণা সেনকে দীর্ঘ কর্মজীবনের মাধ্যমে নিজের বদলে যাওয়া ও নানা চড়াই-উতরাইয়ের কথা বলতে দেখা যাবে। যার মধ্যে রয়েছে তার পুরস্কারপ্রাপ্ত সিনেমা সতী (১৯৮৯), পারমিতার একদিন (২০০০), মিস্টার অ্যান্ড মিসেস লইয়ার (২০০২), ১৫ পার্ক এভিনিউ (২০০৫) ইত্যাদি।
অপর্ণা সেন সুমন ঘোষের সঙ্গে তার নারীবাদী চিন্তা, তার পছন্দের চরিত্র ও অভিনেতাদের নিয়েও কথা বলেছেন স্ক্রলের সঙ্গে। তথ্যচিত্র নির্মাণের আগে অপর্ণা সুমনকে বলেছেন, ‘যদি তোমার কাজে এতটুকু সত্যতা না থাকে তাহলে পুরো কাজই মিথ্যা।’
পরমার শুটিংয়ের আগে তিনি পুনরায় সেই সব জায়গায় গেছেন, যেখানে আগে তার সিনেমার শুটিং হয়েছিল। সুমন ঘোষ অপর্ণার মেয়েদের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। যার মধ্যে ঘোষের সহকর্মী ও বন্ধুও আছেন। আছেন অপর্ণার কন্যা কঙ্গনা সেনশর্মা। কঙ্গনাও এখন নামি অভিনেত্রী ও নির্মাতা। এসব বিষয় নিয়ে সুমন বলেন, ‘আজকাল আমরা অনেক নারী পরিচালক দেখতে পাই। তবে অপর্ণা যখন পরিচালনা শুরু করেছিলেন আশপাশে মাত্র কয়েকজন ছিলেন। তার কাজের মাধ্যমে বাঙালির সংস্কৃতি ও আন্তর্জাতিক আঙ্গিক উভয় তুলে ধরেছেন। আমার মনে হয় না ওনার মতো আর কেউ নারী চরিত্রের এত দিক তুলে ধরেছেন। তিনি রাজনীতির চরিত্রও খুব ভালোভাবে তুলে ধরেছেন। তার মিস্টার অ্যান্ড মিসেস আইয়ার ও ঘরে বাইরে আজ সিনেমায় আমরা তা দেখেছি।’
অপর্ণার সঙ্গে ঘোষের বেশ বিতর্ক চলে সিনেমা, রাজনীতি, অভিনয়ের পছন্দ অপছন্দ নিয়ে। তবে সিনেমার শুটিং শেষ হওয়ার পর তাদের এখনো দেখা হয়নি বলে জানান ঘোষ।
সূত্র: স্ক্রল ডটইন