শব্দ নয়, দৃশ্যই তৈরি করে বিভ্রম

২০১৩ সালে মালয়ালম পরিচালক জীতু জোসেফ চমৎকার একটি গল্প পর্দায় উপস্থাপন করেছিলেন। দুর্ঘটনাবশত জর্জকুট্টির কন্যার হাতে একটি ছেলের মৃত্যু হয়।

সোশ্যাল মিডিয়ায় মাঝে মাঝে এক ধরনের ভিডিও আসে। মানুষের চেতন এবং অবচেতন মনের লক্ষ করার ক্ষমতা ও প্রবণতা নিয়ে নিরীক্ষা দেখানো হয়। যেমন একজন ব্যক্তি দোকানে গেলেন কলম কিনতে। তিনি কলম চাইলেন। দোকানি ভেতরে গিয়ে বা ক্রেতার চোখের সামান্য আড়ালে গিয়ে কলম আনলেন। কিন্তু এ সময়ে যে দোকানি বদলে গেলেন, ক্রেতা তা লক্ষ করেন না। কেননা দুজন আলাদা ব্যক্তির গড়ন, পোশাক ও শরীরী ভাষা কাছাকাছি। এক্ষেত্রে স্বল্প সময়ে ক্রেতা ওই বিক্রেতার চেহারায় মনোযোগ দেন না। দৃশ্যের এমন বহু বিভ্রম আছে। চোখের সামনে থাকলেও আমরা অনেক কিছু দেখি না। লক্ষ করি না। মানুষের এ ‘মিস করে যাওয়া’কেই হাতিয়ার বানিয়ে নিজের পরিবারকে বাঁচিয়ে দেয় বিজয় সালগাওকর।

২০১৩ সালে মালয়ালম পরিচালক জীতু জোসেফ চমৎকার একটি গল্প পর্দায় উপস্থাপন করেছিলেন। দুর্ঘটনাবশত জর্জকুট্টির কন্যার হাতে একটি ছেলের মৃত্যু হয়। ছেলেটি আবার পুলিশের বড় কর্তার সন্তান। এমন অবস্থায় পরিবারকে বাঁচানোর জন্য জর্জকুট্টি (মোহনলাল) নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা করে। এক্ষেত্রে সে সাহায্য নেয় সিনেমার। নিজের দেখা সিনেমা থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে গল্প সাজায়।

জীতু জোসেফের দৃশ্যমের হিন্দি রিমেক একই নামে নির্মাণ করেন নিশিকান্ত কামাত। ২০১৫ সালে মুক্তি পায় সিনেমাটি। জীতু জোসেফ এর পর আরো দুটি পর্ব এনেছেন। নিশিকান্ত কামাত মারা যান ২০২০ সালে। তার মৃত্যুর পর হিন্দিতে সিনেমাটির হাল ধরেন অভিষেক পাঠক। দৃশ্যম টুতে মালয়ালমের স্টোরিলাইন অনুসরণ করেছিলেন তিনি। কিন্তু সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া ‘দৃশ্যম: দ্য কনক্লুশন’-এ একদমই আলাদা পথে হেঁটেছেন। সে কাজটা করেছেন নিপুণভাবে। যে কারণে মূল নির্মাতার (জীতু) দৃশ্যম থ্রির তুলনায় ‘দৃশ্যম: দ্য কনক্লুশন’ আরো ভালো হয়ে উঠেছে।

মালয়ালমে দৃশ্যম থ্রি মুক্তি পায় ৩১ মে। সিনেমাটিতে প্রথম ‘দৃশ্যম’-এর তুলনায় অনেক বেশি দক্ষিণী উপকরণ যুক্ত করেছেন জীতু। ‘দৃশ্যম’ (২০১৩) ছিল একটি পরিবারের গল্প। ‘দৃশ্যম টু’ (২০২১) ছিল সেই পরিবারকে নিরাপদ রাখতে জর্জ ও তার পরিবারের বাকি তিন সদস্যের টিকে থাকার গল্প। কিন্তু ২০২৬ সালে এসে জীতু জোসেফ দৃশ্যমকে মোহনলালকেন্দ্রিক করে ফেললেন। তার দৃশ্যমে জর্জকুট্টি ছাড়া আর কিছু ছিল না। গল্প পথ হারিয়েছিল। বিপরীতে অভিষেক পাঠক (গল্প ও চিত্রনাট্যও তার) গল্পকে প্রাধান্য দিয়েছেন।

বিজয় সালগাওকর জানেন, যেকোনো সময় তাদের কেস পুনরায় চালু হতে পারে। সে সবসময় সতর্ক। ১২ বছরে নিজের ব্যবসায়ে উন্নতি করেছে। সেই সঙ্গে মনে রেখেছে পরিবারের প্রতি দায়িত্বও। সবকিছুর পাশাপাশি প্রতি পদে সে স্যামের মৃত্যুজনিত কেস থেকে নিজেদের রক্ষা করতে গুটি সাজিয়ে গিয়েছিল।

অভিষেক পাঠকের গল্পটা শুরু হয় মীরা ও মহেশের ঘর থেকে। পুত্র শোক মীরা এখনো সামলে ওঠেনি। একদিন মীরা আত্মহত্যা করতে গেলে মহেশ তাকে কথা দেয়, ছেলের জন্য ন্যায়বিচারের ব্যবস্থা সে করবে। সে সূত্রেই মহেশ যোগাযোগ করে রাজবীর সিং তোমরের সঙ্গে। সে ক্রাইম ব্রাঞ্চের নতুন এসপি। তার হাতেই নতুন করে শুরু হয় কেসের তদন্ত। রাজবীরের ব্যক্তিগত শখ হলো পুরনো ও জটিল কেস নিয়ে কাজ করা। বিজয় তার কাছে একজন অপরাধী কেবল। তাকে যে কোনোভাবে শাস্তি দিতে চায় রাজবীর। আর আদালতে বিজয় ও তার পরিবারকে অপরাধী প্রমাণ করতে তারা দ্বারস্থ হয় ইন্দ্রজিৎ শেঠির, যে কোনো কেস হারে না।

‘দৃশ্যম: দ্য কনক্লুশন’ শুরু থেকেই গল্প নিয়ে এগোয়। আগের সিনেমায় গল্প যেখানে থেমেছিল সেখান থেকেই শুরু করেছেন অভিষেক। তারপর কেস নিয়ে মীরা ও মহেশ নিয়মতান্ত্রিকভাবে এগোয়। মীরা, মহেশ, রাজবীর ও ইন্দ্রজিতের কথোপকথনের মধ্য দিয়ে গতি পেয়েছে গল্প। সমান্তরালে বিজয় ও তার পরিবার, তাদের যাপিত জীবনও এসেছে। তাদের সঙ্গেও এগিয়েছে গল্প।

এ সিনেমা নিয়ে কথা বলতে গেলে স্বাভাবিকভাবেই তুলনা এসে যাবে জীতু জোসেফের ‘দৃশ্যম থ্রি’র সঙ্গে। জীতুর সিনেমাটি যত উচ্চকিত, অভিষেক পাঠক ততটাই সংযত ও গল্পের কেন্দ্রে ফোকাসড। স্ত্রী-কন্যার সঙ্গে বিজয়ের কথোপকথন, গীর্জায় তার নিয়মিত যাতায়াত, স্যাভিও এবং রঘুর সঙ্গে যোগাযোগের ঘটনা ও দৃশ্যায়ন গল্পকে জাস্টিফাই করে। সবটাই দারুণ হিসাব করে সাজানো। কোনো অতিমানবীয়, অতিনাটকীয় পরিস্থিতি নেই।

একইভাবে সংযত অভিনয় ছিল অজয় দেবগনের। এ সিনেমায় বিজয় সালগাওকরের সংলাপও হাতেগোনা। সে কেবল নিজের কাজটা করে যায়। একইভাবে নিজেদের কাজে ফোকাসড মীরা ও মহেশ। তারাও নিয়মতান্ত্রিকভাবে এগোয়। টাবু ও রজত কাপুর এ সিনেমায় দম্পতি হিসেবে আরো বেশি পরিণত। শ্রেয়া শরণ সামান্য সময় পেয়েছেন, তবে এবার অঞ্জু ও অনুর তেমন কিছু করার ছিল না। তাই গল্পের কারণে নিষ্প্রভ ছিলেন ইশিতা দত্ত ও মৃণাল যাদব। জয়দীপ আহলাওয়াত চমৎকার অভিনয় করেছেন। কিন্তু পুরো সিনেমায় এত ধূমপান করতে দেখা গেল যেন ওটাই তার কাজ ছিল। অন্যদিকে ইন্দ্রজিৎ চরিত্রে প্রকাশ রাজ একটু উচ্চকিতই ছিলেন। এতটা হওয়ার প্রয়োজন ছিল না।

গল্পকে প্রাধান্য দেয়া দৃশ্যমে নির্মাতার লক্ষ ছিল এ ঘটনা চূড়ান্তভাবে শেষ করার। তিনি করেছেন। সেজন্য বিজয়ের সাজানো প্লট ও গল্পের গতিও প্রকাশ করেছেন। সিনেমার শেষে বিজয় তার সাজানো গুটিগুলোকে দেখায়। আর বোঝায় সে একটা গল্প বলে বলে সেটাকে প্রতিষ্ঠা করেনি, সে সামনে রেখেছিল অনেক দৃশ্য। সে দৃশ্যগুলোয় সত্য ছিল, কিন্তু বিভ্রমের কারণে সত্যটা কেউ দেখতে পারেনি। এ পর্যায়ে গিয়ে তিন পর্বের সিনেমার নামও যথার্থতা পায়।

আরও