‘লালেট্টান’ হয়েই থাকতে চাইলেন মোহনলাল

মালয়ালম ভাষাভাষী অঞ্চলে মোহনলাল লালেট্টান নামে পরিচিত। মোহনলালের ‘লাল’ ও ‘এট্টান’ (বড় ভাই) মিলিয়ে তিনি লালেট্টান। ৪৬ বছরের ক্যারিয়ার তার।

একজন চরম প্রতিভাবান ব্যক্তিও কতদিন তার জাদু ধরে রাখতে পারেন? একটা সময় তারকাও ফিকে হয়ে আসে। এদিকে দক্ষিণ ভারতের মানুষ তাদের তারকাদের ঈশ্বরসম মনে করেন বলে সেখানে তারকারা তুলনামূলক বেশি সময় আলোচনায় থাকেন। তবে নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ বা দৃষ্টিকোণে তাকালে বোঝা যায়, তারাও একটা সময় ফিকে হয়েই যান। বহু ব্যবহার বা আরোপিত বিশেষণে মালয়ালম তারকা-অভিনেতা মোহনলালেরও এখন একই দশা।

মালয়ালম ভাষাভাষী অঞ্চলে মোহনলাল লালেট্টান নামে পরিচিত। মোহনলালের ‘লাল’ ও ‘এট্টান’ (বড় ভাই) মিলিয়ে তিনি লালেট্টান। ৪৬ বছরের ক্যারিয়ার তার। এর মধ্যে ৩০ বছর ধরে জনতাকে মোহিত করে রেখেছেন তিনি। মানুষ ভালোবেসে নাম দিয়েছে ‘লালেট্টান’। এখনো তার সিনেমা এলে দর্শক হইহই লাগিয়ে দেয়। কিন্তু বাস্তবে অভিনেতা মোহনলাল এখন লালেট্টান নামের এক ক্ষয়িষ্ণু, ক্লিশে, জড়, কড়মড়ে আর কৃত্রিমতার মোটা প্রলেপে ঢাকা পড়ে গেছেন।

মোহনলালের বয়স এখন ৬৬ বছর। তারুণ্যে তিনি যেসব ভেলকি দেখিয়েছেন, এখন আর তা সম্ভব নয়। কিন্তু এ কথা সম্ভবত তার কাছের জনরা কেউ তাকে বলেন না। বলিউড, ভারতের অন্য কোনো ইন্ডাস্ট্রির বড় তারকাকেও হয়তো বলা হয় না। অনেক বছর আগেই তার শরীরী ভাষা অভিব্যক্তি হারিয়েছে। আর তার কণ্ঠস্বর? যে দুর্বল ভয়েস মডুলেশন একসময় ভক্তরা স্নেহভরে উপেক্ষা করতেন, এখন তা অনেকেরই গোচরে পড়ছে। মুখেও অভিব্যক্তি তেমন একটা নেই।

একটি বিশাল ভবনের নির্মাণকাজ শেষ হলে মাচা খুলে ফেলা হয়। মোহনলালের তারকাখ্যাতির ক্ষেত্রে ঠিক উল্টোটা ঘটেছে। প্রতি বছর নতুন নতুন বাহারি আবরণ যোগ হয়েছে। সেটা করা হয়েছে ভেতরের ভেঙে পড়া কাঠামোকে আড়াল করার জন্য। সিনেমা থেকে উদাহরণ দেয়া যাক।

মোহনলাল অভিনীত লুসিফারকে অনেকে কাল্ট ক্ল্যাসিকের তকমা দিতে চান। এ সিনেমা ও বিশেষত সিনেমার সিকুয়াল ‘এম্পুরান’-এর অর্ধেকটাই স্লো-মোশনে রাখা হয়েছে মোহনলালের তারকাসুলভ আভা টিকিয়ে রাখতে। মারাক্কার বক্স অফিসে ব্যর্থ। সিনেমাটিও ব্যর্থ। তার কস্টিউম দেখে বোঝা মুশকিল, তিনি মধ্যযুগের মুসলিম যোদ্ধা নাকি কোনো ক্যালেন্ডারে বসানো ধর্মীয় ব্যক্তির ছবি। মালাইকোট্টাই ভালিবায় তাকে সুপারহিরো বানাতে গিয়ে সিনেমাটি ডুবে গেছে কার্টুনসুলভ ভিএফএক্সে।

আসা যাক ‘দৃশ্যম’ প্রসঙ্গে। ২০১৩ সালে মুক্তি পেয়ে সিনেমাটি রেকর্ড গড়েছিল, কাল্ট ক্ল্যাসিকও হয়েছে। সিনেমার মূল বিষয় ছিল একজন সাধারণ ‘ফ্যামিলি ম্যান’ কীভাবে তার পরিবারকে রক্ষা করে। তবে দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্ব এগোতে জর্জকুট্টির সাহসও ধীরে ধীরে অবাস্তব ম্যাকিয়াভেলিয়ান কৌশলে রূপ নেয়। দ্বিতীয় পর্বে তার পরিকল্পনা যেন নরসিমহা বা টোয়েন্টি:২০ সিনেমার নায়কোচিত চালাকি। দৃশ্যম থ্রি দেখার পর কৌতূহলী দর্শকের মনে হবে গল্প থাক বা না থাক, ‘লালেট্টান’কে থাকতেই হবে।

মোহনলাল এখন এমন এক ‘অপরাজেয় নায়ক’ যে তাকে সংযত হতে বলতে গেলেও মনে হবে সে সময় চলে গেছে।

শোনা যাচ্ছে, আসন্ন এল৩৬৬ সিনেমায় তিনি আবার সেই পাকানো গোঁফের অবতারে ফিরছেন। এ খবরে তার ভক্তরা খুশি। ভক্তদের খুশি করেছিল নব্বইয়ের দশকে তার মাচো, নারীবিদ্বেষী চরিত্রগুলো। সত্যি বলতে দর্শক এমনই মাতাল হয়েছিল যে সে ধারার প্রভাব কাটাতে মালয়ালমে নতুন ধারার চলচ্চিত্র আনা প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল।

নব্বইয়ের দশকের প্রথমার্ধে মোহনলাল ছিলেন আগুন। তারপর এল অন্ধ ভক্তি, অতিরঞ্জিত প্রশংসা, নায়ক পূজা। এক অসাধারণ শিল্পীকে নামিয়ে আনা হলো ‘দ্য কমপ্লিট অ্যাক্টর’ উপাধির মধ্যে। অথচ তারকারা প্রতিনিয়তই শেখেন। অমিতাভ বচ্চন, কমল হাসান, রজনীকান্ত নিয়মিত নিজের কাজ, অন্যের কাজ, সাফল্য ও ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়েছেন। এমনকি মালয়ালমের আরেক তারকা মাম্মুত্তিও বাদ যান না।

মোহনলালের সহজাত প্রতিভা ছিল, যা মাম্মুত্তির ছিল না। কিন্তু বয়সে এক দশক বড় মাম্মুত্তি বারবার নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করেছেন। এখনো তিনি তরুণ নির্মাতা, প্রযুক্তি ও নতুন ভাবনার সঙ্গে কাজ করেন।

মোহনলাল সম্পর্কে বেশকিছু কথা প্রচলিত আছে। তার সঙ্গে কাজ করা অনেক নির্মাতাই জানিয়েছেন—নতুন কিছু শেখার আগ্রহ মোহনলালের নেই। ফলে তিনি মূলত পুরনো খ্যাতির অবশিষ্ট জ্বালানিতে এগিয়ে চলছেন।

এতকিছুর পরও তার ভক্তরা মোহনলালকে মাথায় তুলে রাখেন। তারা অন্য অভিনেতাদের সঙ্গে তার তুলনা করে তাকে উচ্চাসন দিয়ে থাকেন। মূলত মোহনলালের কিছু সীমাবদ্ধতা নব্বইয়ের দশকেই ধরা পড়েছিল। কিন্তু মালয়ালম চলচ্চিত্রের সেই স্বর্ণযুগের পরিচালক, চিত্রনাট্যকার ও অভিনেতারা তাকে গড়ে তুলেছিলেন। সাথিয়ান অন্তিক্কাড, পদ্মরাজন, ভারতন, প্রিয়দর্শন; অভিনেতা নেদুমুদি ভেনু, সুকুমারী, থিলকান; লেখক লোহিতদাস ও এমটি বাসুদেবন নায়ার—তারা সবাই মিলে তার প্রতিভাকে শাণিত করেছিলেন।

সাধারণ, ভঙ্গুর, মাটির কাছাকাছি চরিত্রগুলো মোহনলাল ভালো করতেন। এরপর ১৯৯৬ সালে এল ‘কালাপানি’, আর শুরু হলো পতন। এরপর দ্য প্রিন্স, ওস্তাদ, নরসিংহ, রাবণপ্রভু ও থান্দাভামের মতো একের পর এক অহংকারী, অতিমানবীয়, বিষাক্ত পৌরুষের চরিত্রই হয়ে উঠল তার পরিচয়। যদি তিনি মাচো নায়ক না হন, তাহলে তিনি সবজান্তা, সর্বগুণসম্পন্ন মানুষ—গায়ক, নৃত্যশিল্পী, যোদ্ধা, কৌশলী, আদর্শ বাবা, শিক্ষক, গুপ্তচর সবকিছু একসঙ্গে। একসময়কার স্বতঃস্ফূর্ত অভিনেতা ক্রমে নিজেরই নির্মিত তারকা চরিত্রে বন্দি হয়ে গেলেন।

তবু বাণপ্রস্থ (১৯৯৯), প্রণয় (২০১১) ও স্পিরিট (২০১২) সিনেমায় তিনি আশার ঝলক দেখিয়েছিলেন। এমনকি ২০০২ সালের কোম্পানি সিনেমায়ও ভিন্ন মোহনলালকে দেখা গিয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মোহনলাল ফিরে আসেননি। ফিরে এসেছিল ‘লালেট্টান’। চরিত্রাভিনেতা মোহনলাল হারিয়ে গেলেন একেবারেই।

আরও