বহুতল ভবনের কাচঘেরা ঘর থেকে রোজ বিকেলে এক দৃশ্য দেখা যায়। বিচ্ছুরিত আলোয় ছেয়ে গেছে শহর, তার খানিকটা কাচ ভেদ করে এসে পড়ে মেঝেতেও। ওই নরম আলো স্মৃতির ক্যানভাস হয়ে উঠতে চায়, হাতছানি দিয়ে শৈশবে নিয়ে যেতে চায়। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। শৈশব থেকে যোজন দূরত্বে যৌবনের বাস। সেই কথা স্মরণে এলে এক ধরনের অপরাগতা, ব্যর্থতা, সুখস্মৃতি, স্মৃতিকাতরতা ঘন হয়ে আসতে শুরু করে। এমন করুণরাঙা কোমল বিকেলের আভা তৈরি করে চিত্তে তালাত মাহমুদের কণ্ঠ। তিনি গাইছেন, ‘অ্যায় দিল মুঝে অ্যায়সি জাগা লে চাল, যাহা কোয়ি না হো/আপনা পারায়া ম্যাহেরবা, ম্যাহেরবা কোয়ি না হো/যা কার কাহি খো যায়ু ম্যায়/নিন্দ আয়ে অর সো যায়ু ম্যায়...’।
তালাত মাহমুদ। সঙ্গীত জগতে তিনি ‘দ্য কিং অফ গজল’ নামে পরিচিত। গজলকে অনেক শিল্পী অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে গায়কির মাধ্যমে। তবে তালাত মাহমুদকে বিশেষভাবে আলাদা করা যায় ভিড়ের মাঝে। তার গায়কি শরীরের ব্যথাগ্রস্ত স্থানে হাত বুলিয়ে দেওয়ার মতো নরম দুঃখবোধ জাগিয়ে তোলে। জাগিয়ে তোলে পাঁচমিশালী এমন সব অনুভূতি, যেগুলো মাঝেমধ্যে শব্দে প্রকাশ করা কঠিন হয়ে ওঠে। তার কণ্ঠে ‘এই তো বেশ এই নদীর তীরে বসে গান শোনা/একটি দুটি কথা/একটু মাঝে মাঝে আনমনা’ শুনতে শুনতে শহরের বিল্ডিংগুলো যেন পাহাড় হয়ে যায়, তার পাদদেশে বয়ে চলা সড়ককে তখন নদী মনে হয়—পাহাড়ি নদী। আবার কখনো গানে গানে গানে তালাত শ্রোতাকে আহ্বান জানাচ্ছেন—‘যেথা রামধনু ওঠে হেসে, আর ফুল ফোটে ভালবেসে বল তুমি যাবে কি গো সাথে, এই পথ গেছে সেই দেশে’। সেই ডাকে সাড়া দিতে গেলে যেন শ্রোতা নতুন দ্বন্দচক্রের সামনে উপস্থিত হচ্ছেন। তখন মনে পড়ে যায় তালাতের গাওয়া ‘যায়ে তো যায়ে কাঁহা, সামঝেগা কন ইহা দার্দ ভারি দিলকা জুবা’ গানটি। এসব ভাবতে ভাবতে কানে ভেসে আসে তালাত গাচ্ছেন ‘দিল-এ-নাদা, তুঝে হুয়া কিয়া হ্যায়/আখির ইস দার্দ কি দাওয়া কিয়া হ্যায়’।
কোনো এক গান রেকর্ড করার সময়ে এভাবেই ক্যামেরাবন্দি হন তালাত মাহমুদ (মাঝখানে)
কলকাতায় তালাত পরিচিত ছিলেন ‘তপন কুমার’ নামে। ব্যবসায়িক চিন্তা থেকে তাকে এই নাম দেয়া হয়েছিল। যদিও অল ইন্ডিয়া রেডিওকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি উল্লেখ করেন, মুম্বাইয়ের সিনেজগতে তিনি জনপ্রিয় হয়ে ওঠার পর কলকাতার মানুষও তাকে তালাত নামে চিনতে শুরু করে। তখন তপন কুমার নামের পাশে ব্র্যাকেটে লেখা হতো তালাত মাহমুদ। মূলত কলকাতা থেকে তার সঙ্গীতের অনন্য উচ্চতায় পৌঁছানোর যাত্রা শুরু হয়।
১৯৪১ সাল। তার প্রথম গাওয়া গজল রেকর্ড করা হয়। রেকর্ড করেছিল যুক্তরাজ্যের গ্রামোফোন কোম্পানি ‘এইএমভি’। এর ইতিহাস জানতে হলে ফিরে যেতে হয় তালাতের ছেলেবেলায়।
এ গজলসম্রাট জন্মেছিলেন ১৯২৪ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি, উত্তর প্রদেশের লখনৌয়ে। ছোট থেকেই সুরের দুনিয়ার সানিধ্যে ছিলেন তিনি। তার বাবা মনজুর মাহমুদ ছিলেন বাদ্যযন্ত্র ব্যবসায়ী ও সংগীতপ্রেমী। যদিও তার পরিবারে কেউ শিল্পী ছিলেন না। সময় ও ঘটনা পরিক্রমায় তিনি নিজেই সঙ্গীত সচেতন হয়ে ওঠেন। তাকে সবচেয়ে প্রভাবিত করেছিলেন কুনন্দনলাল সায়গল (কে এল সায়গল)। এ কথা তালাত নিজে অল ইন্ডিয়া রেডিওকে দেয়া সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করে বলেছিলেন যে তিনি গুন গুন করে গান গাওয়ার চেষ্টা করতেন। পাশাপাশি চেষ্টা করতেন সায়গলের গলার আবেগ নিজ কণ্ঠে ধারণ করার। এভাবে সঙ্গীতের সঙ্গে তার সম্পৃক্তা বেড়েই চলে। পরবর্তী সময়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বিষয়বস্তু হিসেবে তিনি সঙ্গীতকে বেছে নেন। লখনৌ মরিস কলেজে ক্ল্যাসিক্যাল সঙ্গীতের তালিম নেন। এ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তার কণ্ঠকে আরো অনন্য করে তোলে।
তালাতমাহমুদ ডটনেট থেকে
১৬ বছর বয়সে তালাত অল ইন্ডিয়া রেডিও-র লখনৌ কেন্দ্র থেকে মির্জা গালিবের গজল পরিবেশনের সুযোগ পান। সেটি ছিল ‘সানি যো খাক হামনে...আপনে কো খো কার বেয়ঠে/পায়া ইয়ে উমার ভারমে’। তার কণ্ঠের কোমলতা, মায়াময়তা তাকে স্পট লাইটে নিয়ে আসে। নজর কারে রেকর্ড কোম্পানি এইচএমভির। এ কোম্পানি থেকে তিনি গজল রেকর্ড করার প্রস্তাব পান, যার স্টুডিও অবস্থিত ছিল কলকাতার দমদমে। এ সূত্রে তালাতের কোলকাতায় আসা এবং সঙ্গীতের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়।
এ কোম্পানির সঙ্গে তিনটি গজল গাওয়ার চুক্তি হয়। তালাতের রেকর্ড করা প্রথম গজল ছিল—‘সাব দিন এক সামান নাহি থা’ যা তাকে দ্রুত জনপ্রিয় করে তোলে। তালাত প্রস্তাব পান গানের অ্যালবাম প্রকাশের। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৪১ সালে এ কোম্পানি থেকেই তালাতের প্রথম গানের অ্যালবাম প্রকাশ পায়। পরে অবশ্য তিনি লখনৌ ফিরে যান তার সঙ্গীতের পাঠ সম্পন্ন করতে। সেখানে তার গুরু ছিলেন পণ্ডিত এসসিআর ভাট।
ক্রমেই তালাত সিনেমায় গান গাওয়ার প্রস্তাব পেতে থাকেন। এ যাত্রায় সর্বাধিক খ্যাতি লাভ করেন ১৯৪৪ সালে। ফাইয়াজ হাশমির লেখা আর কমল দাশগুপ্তের সুর করা ‘তাসভির তেরি দিল মেরা বেহেলা না সাকেগি/ইয়ে তেরি তারহা মুঝছে তো শারমা না সাকেগি’ গানে কণ্ঠ দিলেন তালাত। এ গানের ব্যাপক জনপ্রিয়তা তার সঙ্গীত জীবনে বড় বাঁক বদল করে। তবে তার সঙ্গীত জীবনকে গতিশীল রাখতে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা ছিল অনিল বিশ্বাসের। মজরুহ সুলতানপুরীর লেখা ও অনিলের সুর করা আরজু (১৯৫০) সিনেমার ‘অ্যা দিল মুঝে অ্যাইসি জাগা লে চাল’ গজলে কণ্ঠ দেন তালাত। আর এ গজল বলিউডে তাকে দীর্ঘস্থায়ী খ্যাতির দিকে নিয়ে যায়।
অনিল বিশ্বাসের সঙ্গে তালাত মাহমুদ
কলকাতা, মুম্বাইয়ের বাইরে ঢাকায় তথা বাংলাদেশেও তালাত সমান জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। তার ভাই ঢাকায় থাকার সুবাদে তিনি ঢাকায় এসেছিলেন। পরিচালক এহতেশাম ‘রাজধানীর বুকে’ সিনেমার গান গাওয়ার জন্য বেছে নিলেন তালাৎ মাহমুদকে। সেই সিনেমার জন্য গান লিখেছিলেন গীতিকার কে জি মোস্তফা। তার লেখা কালজয়ী গান ‘তোমারে লেগেছে এত যে ভালো, চাঁদ বুঝি তা জানে’ গানের সুর করেন রবিন ঘোষ আর তাতে কণ্ঠ দেন তালাত। এই গানের মাধ্যমে তালাতের কণ্ঠ মোহাবিষ্ট করে এপার বাংলার শ্রোতাদেরও। তার গাওয়া বাংলা গানের সংখ্যা সর্বমোট ৪৯টি। তিনি বিশ্বের প্রায় ১২টি ভাষায় গান গেয়েছেন। কণ্ঠে ফুটিয়ে তুলেছেন সাধারণ মনের বিচিত্র আবেশ।
লতা মঙ্গেশকর একবার গেয়েছিলেন, ‘কী যে করি, কী যে করি/ দূরে যেতে হয় তাই/সুরে সুরে কাছে যেতে চাই’। তালাত মাহমুদকে এ গানটি উৎসর্গ করা যায়। তার কণ্ঠ সরাসরি শোনার খায়েশ থাকলেও যেহেতু সুযোগ নেই, তাই সুরে সুরে তাকে স্মরণ করে যাই নরম-করুণ বিকেলগুলোয়।