বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ‘আম্মাজান’খ্যাত কিংবদন্তি নায়িকা শবনম। আজ এ অভিনেত্রীর ৮০তম জন্মদিন। একই সঙ্গে তার বর্ণাঢ্য চলচ্চিত্রজীবন পূর্ণ করেছে ৬৫ বছর। তিনি একাধারে বাংলা ও উর্দু চলচ্চিত্রের স্বর্ণালি যুগের নায়িকা, যার অভিনয় ও সৌন্দর্যে একসময় বিমোহিত হয়েছিল গোটা উপমহাদেশের দর্শক।
১৯৬০ সালের ২ সেপ্টেম্বর মুক্তি পায় এহতেশাম পরিচালিত ‘রাজধানীর বুকে’। সিনেমার গান ‘আমি রূপনগরের রাজকন্যা রূপের জাদু এনেছি’-তে পারফর্ম করেই দর্শকের নজরে আসেন তরুণী শবনম। এহতেশামের ভাই মুস্তাফিজ তার সম্ভাবনা দেখে হারানো দিন সিনেমায় নায়ক রহমানের বিপরীতে তাকে নেন। ১৯৬১ সালের ৪ আগস্ট মুক্তি পাওয়া সে সিনেমায়ই রহমান-শবনম জুটি হয়ে ওঠে দর্শকপ্রিয়।
এরপর শুরু হয় তাঁদের সোনালি অধ্যায়। ‘জোয়ার ভাটা’, ‘আমার সংসার’, ‘চান্দা’, ‘তালাশ’, ‘প্রীত না জানে রীত’, ‘দরশন’, ‘চলো মান গায়ে’সহ বহু চলচ্চিত্রে তারা জুটি বেঁধে অভিনয় করেন। টানা কয়েক বছর শবনমের চলচ্চিত্র জীবন ছিল একের পর এক সফলতায় ভরপুর। ১৯৬২ সালে মুক্তি পায় এহতেশামের চান্দা, ১৯৬৩ সালে মুস্তাফিজের তালাশ ও মসউদ চৌধুরীর ‘প্রীত না জানে রীত’, ১৯৬৫ সালে মুক্তি পায় সাদেক খানের ‘ক্যায়সে কাহু’, ১৯৬৬ সালে মুক্তি পায় রহমানের ‘দরশন’ ও এহতেশামের ‘চকোরী’, যেটি দিয়ে চলচ্চিত্রে অভিষেক ঘটে নায়িকা শাবানার।
যদিও ক্যারিয়ারের শীর্ষ সময়ে পাকিস্তানি চলচ্চিত্রে শবনমের ব্যস্ততা বেড়ে যায়, তবু তিনি মাঝে মাঝে বাংলাদেশী সিনেমায়ও কাজ করেছেন। অশোক ঘোষের ‘নাচের পুতুল’ (১৯৭১) ছিল তার অভিনয়জীবনের আরেকটি মাইলফলক। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন মুক্তি পাওয়া এ সিনেমার গান ‘আয়নাতে ঐ মুখ দেখবে যখন’ আজও শ্রোতা-দর্শকের হৃদয়ে অমলিন।
পরবর্তী সময়ে ‘শর্ত’, ‘সন্ধান’, ‘জুলি’, ‘কারণ’, ‘যোগাযোগ’, ‘সন্দেহ’সহ বেশকিছু সিনেমায় অভিনয় করেন তিনি। দীর্ঘ বিরতির পর ১৯৯৯ সালের ২৫ জুন মুক্তি পায় শবনম অভিনীত শেষ বাংলাদেশী চলচ্চিত্র আম্মাজান। কাজী হায়াৎ পরিচালিত এ সিনেমায় নায়ক মান্নার মায়ের চরিত্রে তার অনবদ্য অভিনয় দর্শকের মনে আজও দাগ কেটে আছে। এই একটি সিনেমাই যথেষ্ট ছিল তাকে ‘আম্মাজান’ হিসেবে চিরস্মরণীয় করে রাখার জন্য।
আজকে এ অভিনেত্রীর জন্মদিন। এদিনে শবনম তেমন কোনো আয়োজন করেন না। জন্মদিন নিয়ে তিনি বলেন, ‘ছোটবেলায় জন্মদিন মানেই ছিল অনেক আনন্দ, উপহার পাওয়া আর বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো। এখন বাবা-মাকে খুব মিস করি, ছোটবেলার দিনগুলোও ভীষণ মনে পড়ে। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে শুধু দোয়া চাই—যতদিন বাঁচি, যেন সুস্থ থাকি। আর আমার দেশ যেন ভালো থাকে, দেশের মানুষ যেন শান্তিতে থাকে।’
বাংলাদেশী সিনেমার ইতিহাসে শবনম কেবল একজন নায়িকা নন, বরং এক যুগের প্রতীক। তার অভিনয়যাত্রা প্রমাণ করে, সঠিক শিল্পী কখনো শুধু পর্দায় সীমাবদ্ধ থাকেন না, তারা সময় পেরিয়ে দর্শকের হৃদয়ে জায়গা করে নেন।