ছোট ছোট পদক্ষেপে এগোতে চাই

একাকিত্ব, আত্মবিশ্বাসের অভাব আর নানা ভয়-নেতিবাচক ভাবনা ঘিরে ছিল তাকে। সে সময় নিজেকে একটু ভালো রাখার তাগিদেই থিয়েটারে যাওয়া।

অভিনয়ে আসার কোনো পরিকল্পনা ছিল না তরুণ অভিনেত্রী স্বর্ণালী চৈতীর। একসময় নিজের ভেতরই অনেকটা আটকে ছিলেন তিনি। একাকিত্ব, আত্মবিশ্বাসের অভাব আর নানা ভয়-নেতিবাচক ভাবনা ঘিরে ছিল তাকে। সে সময় নিজেকে একটু ভালো রাখার তাগিদেই থিয়েটারে যাওয়া। সেখানকার মানুষ ও পরিবেশ ধীরে ধীরে বদলে দেয় তাকে। থিয়েটারে একটি চরিত্রের মধ্য দিয়েই অভিনয়ের সঙ্গে তার পথ চলা শুরু।

অভিনয়ে আসার শুরুর সে সময়ের কথা বলতে গিয়ে স্বর্ণালী বলেন, ‘আমার কোনো বন্ধু ছিল না, আমি একসময় খুব একা ও হতাশ ছিলাম। কিছু নেতিবাচক ভাবনা বা ভয়ের ভেতর জীবন আটকে গিয়েছিল, যা কাউকে বলতে পারতাম না বা যাদের বলতাম, তারা বুঝত না। তখনই আমি থিয়েটারে যাই।’

থিয়েটারের সে চরিত্রের পথ ধরেই সিনেমার পর্দায় আসেন চৈতী। তার প্রথম সিনেমা রতন পালের ‘অন্তরখোলা’। এরপর নূর ইমরান মিঠুর ‘কুরকাব’, এন রাশেদ চৌধুরীর ‘সখী রঙ্গমালা’ ও রায়হান রাফীর ‘আন্ধার’-এ কাজ করেন তিনি। চার সিনেমার পর স্বপন আহমেদের ‘দ্য অরেঞ্জ’-এ যুক্ত হচ্ছেন চৈতী। পর্দায় কাজের পরিধি বাড়লেও এখনো নিজেকে শেখার পর্যায়েই রাখতে চান তিনি। ক্যারিয়ার নিয়ে আপাতত বড় কোনো পরিকল্পনা নেই। বরং প্রতিটি কাজ থেকেই শিখতে চান।

সিনেমার প্রস্তুতিতে নির্দিষ্ট কোনো পদ্ধতি অনুসরণ করেন না স্বর্ণালী। সিনেমার প্রস্তুতি নিয়ে তিনি বলেন, ‘একটি চরিত্র পাওয়ার পর গল্পের ধরন, চরিত্রটির বৈশিষ্ট্য এবং পরিচালক তাকে কীভাবে দেখছেন, সেগুলো বোঝার চেষ্টা করি। পরিচালকের ভাবনার সঙ্গে চরিত্রটাকে মিলিয়ে নিতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিই। একেকটি চিত্রনাট্য একেক ধরনের অভিনয় দাবি করে। তাই গল্পের প্রয়োজন অনুযায়ী কখনো সিনেমা দেখি, কখনো বই পড়ি, আবার কখনো মানুষকে পর্যবেক্ষণ করি। পুরো প্রস্তুতিটাই আসলে গল্পের ধরন অনুযায়ী নির্ভর করে।’

এখন পর্যন্ত করা চরিত্রগুলোর বেশির ভাগই চৈতীর ব্যক্তিজীবনের সঙ্গে মেলে না। বরং নিজের বিপরীত একজন মানুষ হয়ে ওঠার মধ্যেই অভিনয়ের আনন্দ খুঁজে পান তিনি। নিজের স্বাভাবিক সত্তার বাইরে গিয়ে নতুন একজন মানুষকে ধারণ করার সুযোগটিই তার কাছে অভিনয়ের অন্যতম আকর্ষণ। চৈতী বলেন, ‘সব চরিত্রই আমার নিজস্ব সত্তার একদম বিপরীত। কেবল তো শুরু, এখনো আমি অতটা নিজেকে মেলে ধরতে পারিনি। কিন্তু সম্ভবত অভিনয়টা আমার ভালোবাসার বা উপভোগ করার জায়গা বলে কোনো কিছুতে চাপ মনে হয়নি। নতুন চরিত্র হয়ে ওঠার চ্যালেঞ্জ নিতে আমার খুব ভালো লাগে।’

সহশিল্পীদের কাছ থেকেও শেখার সুযোগ পাচ্ছেন স্বর্ণালী। আন্ধারে কাজ করতে গিয়ে বড় শিল্পীদের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা তার অভিনয় ভাবনাকে আরো সমৃদ্ধ করেছে। তার মতে, বড় তারকারা শুধু তাদের অভিনয় দক্ষতার কারণেই বড় নন, তারা অনেক ধৈর্যশীল, সহযোগিতাপরায়ণ আর বিনয়ী। তাদের কাছ থেকে যে স্নেহ ও সম্মান পেয়েছি, সেটা আমাকে ভেতর থেকে অনেক আগ্রহী করে তুলেছে। এমন মনে হয়েছে, যদি তাদের মতো সততা ও নিষ্ঠা দিয়ে কাজ করে যেতে পারি, তাহলে আমিও দর্শকের ভালোবাসা পাব।’

অন্যদের কাছ থেকে শেখার পাশাপাশি নিজের দুর্বলতার জায়গাগুলো নিয়েও নিয়মিত কাজ করেন স্বর্ণালী। অভিনয়ের বাইরে তাই থিয়েটার চর্চাও তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রতিটি কাজ শেষে নিজের দুর্বলতার জায়গাগুলো খুঁজে বের করেন তিনি। প্রয়োজন হলে কর্মশালা, প্রশিক্ষণ কিংবা বাড়িতে অনুশীলনের মাধ্যমে সেগুলো কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করেন। থিয়েটার থেকে দূরে যেতে চান না চৈতী। কারণ অভিনয় চর্চার পাশাপাশি এটি তাকে মাটির কাছাকাছি রাখে।

ক্যারিয়ার নিয়ে খুব নির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা করতে চান না স্বর্ণালী। কোনো বিশেষ স্বপ্নের চরিত্র বা বড় কোনো লক্ষ্য নেই তার। সামনে যে কাজ আসে, সেটিতেই পূর্ণ মনোযোগ দিতে চান। অন্যদের সঙ্গে নয়, নিজের সঙ্গেই প্রতিযোগিতায় বিশ্বাসী তিনি। তার ভাষায়, ‘এখানে আমার প্রতিযোগী আমিই। আজকে যতটুকু ভালো করতে পারলাম, পরদিন তার থেকে যেন আরেকটু ভালো করতে পারি, এটাই নিজের সঙ্গে নিজের প্রতিযোগিতা। বড় কিছু নিয়ে ভাবি না বেশি। ছোট ছোট পদক্ষেপে এগোতে চাই।’

জীবনটাকেও খুব সাধারণভাবেই রাখতে চান স্বর্ণালী। অভিনয়ের ব্যস্ততার বাইরে নিজেকে তিনি সাধারণ মধ্যবিত্ত ঘরকুনো মানুষ হিসেবেই দেখতে চান। বাজার করা, রান্না, ঘর গোছানো, নিজের যত্ন, পরিবারে সঙ্গে সময় কাটানো কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা—সাধারণ এ জীবনই তাকে স্বস্তি দেয়।

আরও