দিনগুলো ফুরিয়ে গেলেও যুদ্ধের ভয়াবহতার দীর্ঘমেয়াদি আঁচ লেগে থাকে মানুষের মনে। বিশেষ করে গৃহযুদ্ধে বিধ্বস্ত দেশে প্রাণ বাঁচাতে মরিয়া মানুষ ভিনদেশে আশ্রয় খুঁজে নিলে যুঝতে হয় সতত হা করে থাকা অনিশ্চয়তার সঙ্গে। শুধু আরেকটা দিন বেঁচে থাকাটা হয়ে ওঠে মূল লক্ষ্য। নতুন পরিবেশের অস্থিরতা, অর্থনৈতিক দুরবস্থা আর নৈরাজ্যের আঘাত সামাল দিতে না পেরে অস্তিত্বের ঘোর সংকট তৈরি হয় সেসব অনাহূত শরণার্থীদের মাঝে। ‘আ ব্রাইটার সামার ডে’ জুড়ে তীক্ষ্ণ সুরে বেজে গেছে পরিচয়হীনতার সে দিনগুলোর কথা, যা স্পর্শ করেছিল যুদ্ধোত্তর চীন থেকে পালানো প্রতিটি পরিবারকে।
১৯৪৯ সালে চীনের মূল ভূখণ্ডে উত্থান হয়েছিল কমিউনিজমের। বিরোধী জাতীয়তাবাদী দল ও তার সমর্থকরা তখন দেশত্যাগে ফেরারি। শরণার্থীদের অনেকেই এসে আশ্রয় নিচ্ছে তাইওয়ানের রিফিউজি ক্যাম্পে। বাস্তুহারা বাবা-মায়ের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ তাদের সন্তানদের জীবনে ফেলেছিল অস্থিরতার ছাপ। পরিচয় আর নিরাপত্তা রক্ষায় ভাগ্যবিতাড়িত কিশোরদের জায়গা নিতে হয় বিভিন্ন গ্যাংয়ে। তেমনই এক শরণার্থী ঝাও সির পরিবারে আছে বাবা-মা, দুই ভাই, তিন বোন। সংসারে প্রকট অভাব। এরই মধ্যে একদিন সাংহাইয়ে তাদের একান্ত আশ্রয় ফিরে পাওয়ার স্বপ্নও দেখছে। রূঢ় বাস্তবতার বিপরীতে পরিবারটির দাঁড়িয়ে থাকার সংগ্রামের সঙ্গে মিশে গেছে কিশোর ঝাও সির সারল্য হারানোর গল্প।
নাইট স্কুলের পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে বেগ পেতে হয় অন্তর্মুখী ছেলেটিকে। বন্ধু ক্যাটের সঙ্গে ক্লাস ফাঁকি দিয়ে স্কুলের পাশের স্টুডিওটিতে শুটিং দেখে। মাঝে মাঝে গার্ডের তাড়া খেয়ে বেরিয়ে আসে। একবার গার্ড ক্যাটকে তাড়া করতে গেলে সি গার্ডের রুম থেকে চুরি করে আনে টর্চলাইট। এ টর্চলাইট সিনেমার গুরুত্বপূর্ণ রূপক। বিভিন্ন দৃশ্যে নানা পরিস্থিতিতে ঘুরেফিরে আসে এ টর্চের আলো-আঁধার। পরের দৃশ্যে দর্শক প্রবেশ করে তাইওয়ানের কিশোর অপরাধের অন্ধকারে। প্রত্যেক গ্যাং চায় আধিপত্য খাটাতে। পার্ক স্ট্রিট ক্লাবের নেতা হানি প্রতিদ্বন্দ্বী ২১৭ ক্লাবের একজনকে খুন করে এখন গা ঢাকা দিয়ে আছে।
এক রাতে ঝাও সি বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিল স্কুলের বাইরে, তখন খবর আসে স্লাইকে ২১৭ ক্লাবের এলাকায় একা পেয়ে আটকে রেখেছে। তার টর্চটা নিয়ে পার্ক স্ট্রিটের ছেলেরা ২১৭ ক্লাবের ছেলেদের অমানবিকভাবে মারধর করে। কয়েকজন মিলে ২১৭ ক্লাবের এক কিশোরকে ধরে নিয়ে এলে স্লাই ক্যাটকে ইট দিয়ে বলে ছেলেটির মুখে মারতে। ক্যাট আর সির কেউই কাজটা না করলে স্লাই নিজেই ছেলেটিকে আঘাত করে রক্তাক্ত করে ফেলে।
এ নৃশংসতা ঘুমোতে দেয় না সিকে। সে বারবার আলো জ্বালায় আর নেভায়। বুঝতে পারে, চোখে কোনো একটা সমস্যা হয়েছে। হুট করে আলো পড়লে ঝাপসা লাগে চারপাশ। ঠিক সে মুহূর্তে শুরু হয় ঝাও সির আঁধারের যাত্রা। এরপর দেখি, স্কুলের মেডিকেলে চোখ দেখাতে গেলে কাকতালীয়ভাবে দেখা হয় মিংয়ের সঙ্গে। ডাকাতের মতো প্রেম আসে সির জীবনে। ৪ ঘণ্টার এ মহাকাব্যিক সফরে জীবনের এক অদ্ভুত বিবর্তন শেষমেশ তাকে নিয়ে ফেলে লোহার গরাদের আড়ালে।
সুদূর তাইওয়ানের হলেও আ ব্রাইটার সামার ডে থেকে পরিচিত জীবনের স্বাদ পাওয়া যায়। পরিচালক ৪ ঘণ্টার প্রতিটা মিনিট ব্যবহার করে স্পর্শ করেছেন ড্রামা, ক্রাইম, পলিটিকস, ফ্যামিলি, থ্রিলার ও রোমান্টিক জনরাকে। উত্থান-পতন, ভালোবাসা-ভ্রাতৃত্ব, রাগ-ক্ষোভ, হিংসা-বিদ্বেষ, দ্বন্দ্ব-সংঘাত, পরিবার-সমাজ সবকিছুই ঠাঁই পেয়েছে সিনেমায়। আছে নাগরিক জীবনের মাত্রাহীন অবসাদ, কামনা-বাসনা, অনুযোগ-অভিযোগের খণ্ড মুহূর্ত। সিনেমাজুড়ে এলভিস প্রিসলির গানের অসংখ্য একাকী স্বর ক্রমাগত বাতাসে ভেসে বেড়ায় এক তীব্র জিজ্ঞাসা নিয়ে, ‘আর ইউ লোনসাম টুনাইট?’
পরিচালক সরাসরি ভায়োলেন্স পরিহার করেও গল্পে ভয়াবহতা তুলে ধরেছেন। সিনেমাটিকে বলা যেতে পারে এক হারানো সময়ের আয়নায় কিছুটা ব্যক্তিগত, কিছুটা ঐতিহাসিক স্মৃতির প্রতিবিম্ব। এডওয়ার্ডের বাবা নিজেই এ ধরনের পরিস্থিতির শিকার হওয়ার কারণে একদিক থেকে খুব ব্যক্তিগত সিনেমাও বলা যায়। অসংখ্য লং শটের মাধ্যমে যেন সমাজে ঘটে চলা সংগতি কিংবা অসংগতির গোটা ছবিটা দর্শক বৃহত্তর দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখতে পায়। ক্যামেরার মন্থর সুসংহত চলন আরো গভীরে নিয়ে চলে। অনেক ফ্রেম ঠিক একই জায়গা একই অ্যাঙ্গেল থেকে নেয়া, যেন চরিত্রগুলোর একঘেয়ে জীবনের প্রতিফলন।
শুরু আর শেষ দৃশ্যের মাঝেও খুঁজে পাওয়া যায় সমাপতন। জেলে যাওয়ার বছরখানেক পর গ্রীষ্মের এক উজ্জ্বলতর দুপুরে সির মা খুঁজে পান স্কুলের পোশাক। ঠিক এক বছর আগেকার দুপুরের মতো রেডিওতে বাজতে থাকে, কারা সে বছর স্কুলের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে। মা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। দর্শকও স্থির চোখে চেয়ে দেখে সময়ের সঙ্গে পরিস্থিতির পরিবর্তন।
সাদা-কালো এ বাইনারির বাইরে গিয়ে মানুষ মূলত ধূসর। এজন্য সে নিজে কতটা দায়ী? সাধারণ জীবন সির প্রাপ্য ছিল, তার বদলে যে কেবল সমাজের ফাঁকি আর বঞ্চনার শিকার হয়ে রইল, দায়টা আসলে কার? এমন অমোঘ প্রশ্নবোধক চিহ্নে সমাপ্ত হয় গ্রীষ্মের উজ্জ্বলতর দিনের এ আখ্যান, যার উত্তরে নিঃসীম শূন্যতা ছাড়া আর কিছু খুঁজে পাওয়া যায় না।