ক্যালেন্ডারে অক্টোবর এলেই অনেকের কাছে ফিরে আসে নস্টালজিয়া। এ নস্টালজিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে একটি সিনেমা—অক্টোবর’। এ মাস শুরু হতেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ সিনেমাটির দৃশ্য শেয়ার করেন, কেউ শিউলি ফুলের ছবি, কেউ শেয়ার করেন সিনেমাটির গান। ২০১৮ সালে মুক্তি পাওয়ার পর আট বছর পেরিয়ে গেলেও প্রতি অক্টোবরেই সুজিত সরকারের ‘অক্টোবর’ নতুন করে আলোচনায় আসে।
মনোবিজ্ঞানের ভাষায়, কোনো নির্দিষ্ট গান, গন্ধ, দৃশ্য কিংবা চলচ্চিত্রও হয়ে উঠতে পারে ‘অটোবায়োগ্রাফিক্যাল মেমোরি’র সংকেত। এ সংকেত আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় নিজের অতীতে। গবেষণায় দেখা গেছে, জনপ্রিয় সিনেমা অনেক সময় মানুষের অতীত ও বর্তমান সত্তার মধ্যে এক ধরনের ধারাবাহিকতার অনুভূতি তৈরি করে। তাই অক্টোবর আবার দেখা মানেই অনেকের কাছে শুধু ড্যান ও শিউলির গল্পে ফিরে যাওয়া নয়, বরং নিজের জীবনের কোনো পুরনো অক্টোবর, কোনো পুরনো সম্পর্ক, হারিয়ে যাওয়া মানুষ কিংবা নিজেরই এক পুরনো সংস্করণের কাছে ফিরে যাওয়া।
এটি আসলে প্রেমে পড়ার গল্প নয়, বরং একজন মানুষের জীবনে অন্য একজন মানুষ কীভাবে হঠাৎ করে এমন এক গুরুত্ব পেয়ে যায়, যার কোনো সহজ ব্যাখ্যা নেই, সেই গল্প। ড্যান ওয়ালিয়াকে শুরুতে কোনো আদর্শ প্রেমিক হিসেবে দেখা যায় না। সে অস্থির, দায়িত্বজ্ঞানহীন। অন্যদিকে শিউলি শান্ত, দায়িত্বশীল, নিজের জগতে অনেক বেশি স্থির। দিল্লির একটি হোটেলে দুজন পাশাপাশি কাজ করলেও তাদের মধ্যে প্রচলিত অর্থে প্রেমের কোনো গল্প তৈরি হয় না। তারপর এক রাতে শিউলি হোটেলের ছাদ থেকে পড়ে যায়। শিউলি কোমায় চলে যায়। আর ড্যান যেন অন্য এক ধরনের কোমায় ঢুকে পড়ে। একটি প্রশ্ন, একটি অনিশ্চয়তা এবং একটি অদ্ভুত টানের মধ্যে ঘুরপাক খায় সে। জুহি চতুর্বেদীর লেখার সবচেয়ে শক্তিশালী জায়গা এখানেই। সিনেমাটি কখনো ব্যাখ্যা করেনি ড্যান আসলে কী অনুভব করছে। এটা কি প্রেম? অপরাধবোধ? দায়িত্ব? কৌতূহল? আকর্ষণ? নাকি এমন একজন মানুষের অস্তিত্ব আবিষ্কার করা, যার কাছে সে নিজেই গুরুত্বপূর্ণ ছিল?
ড্যান হাসপাতালের বিছানার পাশে বসে থাকে। ওষুধ, নার্স, রিপোর্ট, মেশিনের শব্দ ধীরে ধীরে এগুলো তার জীবনের অংশ হয়ে যায়। শিউলির পরিবারের সঙ্গেও তার সম্পর্ক তৈরি হয়। একটা দায়িত্বজ্ঞানহীন মানুষের ভেতরে হঠাৎ এমন অনুভূতি জাগ্রত হওয়ার সে অনুভূতিগুলোর সঙ্গেই দর্শক নিজেকে সবচেয়ে বেশি মেলাতে পেরেছে।
সিনেমায় আরেকটি চমৎকার শব্দের সুন্দর ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে। তা হলো ‘অপেক্ষা’। অপেক্ষা খুব অদ্ভুত এক মানসিক অভিজ্ঞতা। বিশেষ করে যখন অপেক্ষার ফলাফল নিজের হাতে থাকে না। কোনো ব্যক্তি চাইলেই কাউকে সুস্থ করতে পারে। মৃত্যুকে থামাতে পারে না। ভবিষ্যৎকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। কোনো ব্যক্তি পারে শুধু ‘থেকে যেতে’। ড্যানের পরিবর্তন তাই কেবল প্রেমের অনুভূতির পরিবর্তন নয়, এটি তার অস্তিত্বের পরিবর্তন।
সিনেমাটির নীরবতাই দর্শকের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি কথা বলেছে। সুজিত সরকার জটিল সংলাপে আবেগকে বর্ণনা করেননি। তিনি আবেগকে অনুভব করিয়েছেন। হাসপাতালের করিডোর, জানালার আলো, দীর্ঘ নীরবতা, শিউলির পরিবারের ছোট ছোট মুহূর্ত—সবকিছু মিলিয়ে তৈরি হয় এমন এক আবহ, যেখানে দর্শককে জায়গা দিয়েছেন নিজের মতো করে অনুভব করার। তাই হয়তো এ সিনেমা দর্শকের স্মৃতিতে বারবার ফিরে এসেছে।
‘শিউলি’ নামটিই যেন সিনেমাটির সব ব্যাখ্যা দিয়ে দিয়েছে। রাতের অন্ধকারে ফুটে ওঠা, ভোরের আগেই ঝরে পড়া এ ফুলের সঙ্গে শিউলি চরিত্রটির এক অদ্ভুত প্রতীকী সম্পর্ক তৈরি করেছে। তার সৌন্দর্য যেমন ক্ষণস্থায়ী, তার উপস্থিতিও তেমনই। কিন্তু ফুল ঝরে গেলেও তার গন্ধ থেকে যায়। শিউলিও তেমন। শিউলির দর্শকও নিজেদের সে জায়গায় ভেবেছেন বারবার।
সিনেমার শেষের শিউলি গাছটি তাই নিছক আবেগের প্রতীক নয়। ড্যান শিউলিকে ফিরিয়ে আনতে পারে না। তার সঙ্গে কাটানো সময়ও ফিরিয়ে আনতে পারে না। কিন্তু সে শিউলির স্মৃতি সঙ্গে নিয়ে যেতে পারে। শোক তখন আর কেবল হারানোর বেদনায় থাকে না, তা হয়ে ওঠে জীবনের অংশ।
নাম ‘অক্টোবর’ হলেও সিনেমাটি ২০১৮ সালের এপ্রিলে মুক্তি পেয়েছিল। কিন্তু তার আবেগের ক্যালেন্ডার আটকে আছে সে অক্টোবরেই। বছর ঘুরে অক্টোবর আসে। শিউলি ফোটে। সিনেমাটির গান আবার বাজে। ড্যান আবার হাসপাতালের জানালার পাশে বসে থাকে। আর দর্শক নিজের অজান্তেই মনে করতে থাকে এমন কিছু মানুষকে, যাদের জীবনে আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।