ঘনঘটা ২: ফেলে আসা স্বপ্ন যেমন দেখায়

বয়সের সিঁড়ি বেয়ে মানুষ ক্রমেই মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যায়। এ যাত্রায় মানুষ কেবল যাপিত জীবন পেছনে ফেলে আসে না; যাপন করতে না পারা স্বপ্নগুলোও পেছনে থেকে যায়।

স্বপ্ন, শখ তখন দীর্ঘশ্বাসের নামান্তর হয়ে দাঁড়ায়; জীবনের বাস্তবতায় ম্রিয়মাণ হয়ে পড়ে। তবু যেহেতু স্বপ্নের শরীর নেই; এটি মানসজাত, অবিনশ্বর এবং যেহেতু ‘জীবন অবাধ, জীবন অগাধ’, তাই অধরা স্বপ্ন উঁকি দেয় বারবার। যেন কেউ তাকে হাতছানি দিয়ে ডেকে যায়। তেমনি এক ডাকে সাড়া দেয়া নারীদের নিয়ে গতকাল অনুষ্ঠিত হয়ে গেল নৃত্য উৎসব ‘ঘনঘটা ২’।

বেলা ১১টা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) চারুকলার প্রবেশমুখে মানুষের দীর্ঘ সারি। সবার গন্তব্য চারুকলা অনুষদের বকুলতলা। মানুষের ভিড় কাটিয়ে বকুলতলায় চোখ পড়তেই দেখা যায় ভিন্ন দৃশ্য। যদিও বর্ষাকাল এখন, তবু বকুলতলা হয়ে উঠেছে শরতের নীল আকাশের মতো। আকাশি রঙের শাড়ি পরে ‘আল্লাহ মেঘ দে, পানি দে’ গানের তালে নৃত্য পরিবেশন করছেন একদল নৃত্যশিল্পী। তাদের আহ্বানে যেন আকাশও তখন সাড়া দিয়ে মেঘের ঘনঘটা নামিয়ে আনে। সঙ্গে মৃদু বাতাসও। যদিও বৃষ্টি নামেনি, তবু তখনই বেজে উঠল ‘মেঘ বলেছে যাব যাব’। বাদল দিনের অনুভব করানোর শুরুটা হলো এভাবেই। এরপর একের পর এক দলীয় নৃত্য নিয়ে হাজির হয়েছেন ৩-৭০ বছর বয়সী নৃত্যশিল্পীরা। ৯০ মিনিটের এ প্রযোজনায় মঞ্চজুড়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম আর বাংলার লোকজ ঐতিহ্য থেকে নেয়া মোট ১৬টি পরিবেশনা উপস্থাপন করা হয়েছে। শিশুরা নাচল ‘খেজুর পাতার নূপুর’-এর তালে, বড়রা নাচলেন ‘সঘন শ্রাবণ গগন-তলে রিমি ঝিমি ঝিম্ নবধারা জলে’।

ঘনঘটা যতটা না প্রাতিষ্ঠানিক নৃত্যচর্চার আয়োজনকে তুলে ধরে, তার চেয়ে বেশি প্রকাশ করে সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বাধার মুখে যারা নাচের চর্চা এগিয়ে নিতে পারেনি তাদের নিবেদন। তারা কেউ শিক্ষার্থী, পেশাজীবী, গৃহিণী। তারা সবাই ব্যক্তিজীবনে ভিন্ন, ঘনঘটায় অভিন্ন, নৃত্যশিল্পী। মনে পড়ে আলাপচারিতাকালে ঘনঘটা প্রসঙ্গে একজন নৃত্যশিল্পী বললেন, এখানে তারা বৃষ্টি, নাচ ও মানুষকে সাহায্য করতে একত্রিত হয়েছেন। আর ঘনঘটার প্রধান আয়োজক একুশে পদকপ্রাপ্ত নৃত্যশিল্পী অর্থী আহমেদের মনে হয়েছিল, শহুরে জীবনে বর্ষা মানে যেন ভোগান্তির আরেক নাম—জলাবদ্ধতা ও যানজট। কিন্তু এর বাইরেও বর্ষার নিজস্ব রূপ, আবেদন রয়েছে। সেই চিরাচরিত বর্ষার চেতনাকে সামনে আনার চেষ্টা থেকেই সবাই একত্রিত হয়েছেন চারুকলার বকুলতায়। পাশাপাশি যোগ হয়েছে মানবিক সাহায্যের লক্ষ্যও।

জানা যায়, ‘ঘনঘটা ২’-এর প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল মাস চারেক আগে। এরই মধ্যে চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন অঞ্চলে টানা বৃষ্টি থেকে সৃষ্ট বন্যা, জলাবদ্ধতায় অসংখ্য মানুষ আটকে পড়ে। বন্যা ও পাহাড়ধসের কারণে মারা গেছে অনেকে। বহু ঘরবাড়ি তলিয়ে গেছে, হারিয়ে গেছে এ দুর্যোগের কারণে। আয়োজকদের মনে হয় বন্যার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো প্রয়োজন।

অর্থী আহমেদের প্রতিষ্ঠান অর্থী আহমেদ ড্যান্স একাডেমি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের যৌথ আয়োজন ঘনঘটা তাই একাধারে হয়ে ওঠে বর্ষা উদযাপন, নাচ ও মানবিক সাহায্যের প্রতীক। অর্থী আহমেদের ভাষায়, শিল্পীদেরও সমাজের প্রতি একটা দায়বদ্ধতা থাকে। তাই বর্ষা উদযাপনের পাশাপাশি বন্যাদুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর একটা পথও খুঁজে নিয়েছেন তারা। সে ভাবনা থেকেই এ আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ত্রাণ তহবিল সংগ্রহের উদ্যোগ। তহবিল সংগ্রহে ভেন্যুতে বসানো হয়েছিল জাগো ফাউন্ডেশনের দুটি বুথ। সব মিলিয়ে ঘনঘটা তার নিজস্ব ছাপ রেখে গিয়েছে; আগামীতে হয়তো আরো বড় পরিসরে ফিরে আসবে দর্শকের মনে সে প্রত্যাশাও জাগিয়েছে।

উল্লেখ্য, গত বছর অনুষ্ঠিত হয়েছিল ঘনঘটার প্রথম পর্ব। সে সময় পাওয়া ব্যাপক সাড়া থেকে এবার আরো বড় পরিসরে আয়োজকরা ফিরে এসেছেন। প্রথমবার ১২০ জন শিল্পী নিয়ে শুরু হওয়া ঘনঘটায় এবার প্রায় ৩০০ জন শিল্পী অংশ নিয়েছেন। তাদের স্বপ্ন, উৎসাহ ও উদ্দীপনা ছিল পুরো প্রযোজনার কেন্দ্রে। তাই তাদের শেষ পরিবেশনা ছিল ‘আমরা সবাই রাজা আমাদের এই রাজার রাজত্বে, নইলে মোদের রাজার সনে মিলব কী স্বত্বে?’

আরও