লাতিন আমেরিকার অনেক উপন্যাসই ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে। ইংরেজি থেকে অন্য ভাষায়। বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। এর মধ্যে কিছু উপন্যাসকে ‘ম্যাজিক রিয়ালিজম’ তকমায় বিভূষিত করে তার ভেতরকার ‘ফ্যাক্ট’গুলো করে তোলা হয়েছে গৌন। গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের ‘ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ার্স অব সলিটিউড’ এ কাতারে সবার সামনে থাকে। উপন্যাসের মধ্যে কল্পিত জনপদ মাকোন্দোর মানুষ, যাপন ও ইতিহাসের মধ্যেই আছে লাতিন আমেরিকার মানুষ, তাদের যাপন ও ক্ষেত্রবিশেষে কলম্বিয়ার ইতিহাস। একটা সময় থেকে মার্কেজ ও তার বইকে এত বেশি মাহাত্ম্য দেয়া হয় যে তার ভাষা ও ম্যাজিক রিয়ালিজমের আড়ালেই পড়ে গিয়েছিল বিষয়গুলো। নেটফ্লিক্সের সিরিজে তা অনেকটা স্পষ্ট হয়ে ধরা দিয়েছে। দুই সিজনের এ সিরিজের প্রথম সিজন ছিল কবিতার মতো আর দ্বিতীয় সিজন যে পরিবর্তানের ইতিহাস।
কর্নেল অরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া মার্কেজের উপন্যাসের অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্র। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে তার উপস্থিতি ও প্রভাব ছাপিয়ে যায় হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া—মাকোন্দোর প্রতিষ্ঠাতা। বিশেষত প্রথম সিজনে চেস্টনাট গাছের নিচে বসে থাকা আর্কাদিও দর্শককে বিমূঢ় করেছিল। সে সিজনে অরেলিয়ানো ছিলেন বিপ্লবের স্বপ্ন, তারুণ্যের প্রতীক। কিন্তু আমরা হয়তো জানি, স্লোগানে যতই থাকুক ‘বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক’ বাস্তবে তা হয় না। বিপ্লবীরও তারুণ্য মরে যায়। নেটফ্লিক্সের ‘ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ার্স অব সলিটিউড’-এর দ্বিতীয় সিজন, অরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার বুড়িয়ে যাওয়ার মৌসুম। আমরা জানি সে ৩২টি গৃহযুদ্ধ লড়েছিল আর সবক’টাই হেরেছে। দ্বিতীয় সিজন সেই পরাজিত অরেলিয়ানোকে নিয়ে আসে।
উরসুলা তখনো আছেন, এক প্রাচীন বটবৃক্ষের মতো। কিন্তু সেই বটবৃক্ষের পাতা ঝড়ে গেছে। মূলত পরিবর্তিত সময়ের সঙ্গে ক্ষয়ে যায় অনেক কিছুই। পরিবারের যাপনও বদলে যায়, সঙ্গে বদলে যায় তাদের নীতি। দুনিয়ার পারিপার্শ্বিকতার সঙ্গেই ঘরের ভেতরেও পরিবর্তন আসে। বুয়েন্দিয়াদের তৃতীয় প্রজন্মে গিয়ে সেই পরিবর্তন আরো বড় পরিসরে ধরা পড়ে। কেউ সেটা বুঝতে পারে, কেউ পারে না। উরসুলা বোঝেন কিন্তু তিনি বাধা দেন না। যেন তিনি জানেন, বাধা দেয়ার কোনো সাধ্য তার নেই।
অরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া যুদ্ধেই থাকে। তার স্ত্রী মারা গেছে অনেক দিন আগে। সে যুদ্ধের মাঝেই ভিন্ন নারীর গর্ভে সন্তান জন্ম দেয়। সেই নারীরা মাকোন্দোয় এসে উরসুলার কাছ থেকে নিয়ে যায় সন্তানের পিতার পরিচয় চিহ্ন। মাকোন্দোয় ততদিনে সিনেমা এসে গেছে।
এবারের গল্পটা ছিল বুয়েন্দিয়াদের তৃতীয় ও চতুর্থ প্রজন্মের। হোসে আর্কাদিও সেগুন্দো ও অরেলিয়ানো সেগুন্দো দুই যমজ ভাইয়ের বিপরীত চরিত্র। একই নারীর প্রেমে পড়েছিল তারা। একটা সময় অরেলিয়ানোর জন্য সেগুন্দো ছেড়ে দেয় পেত্রা কোর্তেসের প্রতি তার দাবি। সে মেলকিয়াদেসের লাইব্রেরিতে সময় কাটায়। মাকোন্দোয় একটা বন্দর তৈরি করতে চায়। একটা ভেলা তৈরি করে কিছু মানুষকে আনেও সে, তবে এরপর সেই জেটিতে কখনো কোনো ভেলা আসেনি। হাল ছাড়ে না সেগুন্দো। সে নকশা করে, আনুষ্ঠানিক আবেদন করে মাকোন্দোয় নিয়ে আসে রেলগাড়ি। সেটাই বদলে দেয় মাকোন্দোর ভাগ্য। রেলগাড়িতে চড়ে আসা আমেরিকানরা মাকোন্দোকে উপনিবেশ বানিয়ে ফেলে।
সান্তা মার্তার উপকূলে কলা চাষ আর চাষীদের ওপর সেনাদের গুলিবর্ষণ আজও ইতিহাসে ‘বানানা ম্যাসাকার’ নামে পরিচিত। মার্কেজ সেই ইতিহাস নিয়ে গিয়েছিলেন মাকোন্দোয়। ম্যাজিক রিয়ালিজমের আদলে রেখেছিলেন নিহত ব্যক্তিদের সংখ্যার বিভ্রান্তি। নেটফ্লিক্স সেই হত্যাকাণ্ডের দৃশ্যায়নে কোনো ফাঁক রাখেনি। স্টেশনের সামনে জমায়েত হওয়া শ্রমিকদের ওপর চালানো গুলি প্রথম ১০ সেকেন্ড কারো গায়ে লাগেনি। তারপর এক এক করে পড়ে যেতে থাকে সবাই। ঘটনার শেষে শুরু হওয়া বৃষ্টি চলে ৪ বছর ১১ মাস ২ দিন। বদলে যেতে থাকে মাকোন্দো। ফারনান্দার একচ্ছত্র আধিপত্য, উরসুলার নীরব হয়ে যাওয়া ও সান্তা সোফিয়া দে লা পিয়েদাদের একনিষ্ঠ নিবেদন দর্শককেও ভুলিয়ে দেয় বানানা রিপাবলিকের কথা। মনে থাকে কেবল হোসে আর্কাদিও সেগুন্দোর। যমজ ভাইদের সঙ্গে একই দিনে মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত সে বলে যায়, সেদিন তিন হাজার মানুষ মারা গিয়েছিল।
বর্ষার চার বছর বুয়েন্দিয়াদের ঘরেই ছিল নেটফ্লিক্স। তাতে মাকোন্দোর পরিবর্তনের ইতিহাস থেমে থাকেনি। বৃষ্টি শুরুর আগেই দেখা গেছে ফারনান্দার একনায়কোচিত পারিবারিক শাসন। মেমের প্রেমিককে গুলি করে পঙ্গু করে দেয়া যেন সেনা শাসনেরই আরেক রূপ। আবার ফারনান্দার মধ্যে থেকে যায় খানিকটা মনুষ্যত্বও। বাবিলোনিয়ার ঔরসে আসা মেমের ছেলেটিকে সে বাথটাবে ডুবিয়ে মারতে গিয়েও পারে না। তাকে বাঁচিয়ে রাখে বন্দি করে। ফারনান্দা জানত না তার নাতিটিই তার সর্বশেষ কন্যার গর্ভে জন্ম দেবে একটি শিশু, যার কোমরে থাকবে শুয়োরের লেজ। উরসুলা বুঝেছিলেন।
এবারের সিজন পরিচালনা করেছেন তিনজন—লরা মোরা, কার্লোস মোরেনো ও অ্যালেক্স গার্সিয়া লোপেজ। প্রথম সিজনের তুলনায় এবারের সিজন তুলনামূলক কাঠখোট্টা এবং এ সময়ের সিরিজের ধারা অনুসরণ করে। সেটা এবারের সিজনের জন্য প্রয়োজনও ছিল। তবে মাকোন্দোর সেট, অভিনেতাদের কাজ আগের মতোই ভালো। পরিবর্তনের ধারাগুলো তারা ধরেছেন চমৎকার করে।
অভিনয়শিল্পীদের মধ্যে চরিত্র ধরে উরসুলার স্পেস এবার কম থাকলেও তিনি ভালো করেছেন। আমারান্তা তার ডিগনিটি ধরে রেখেছিলেন শেষ অবধি। এবারের সিজনে যমজ দুই ভাইয়ের চরিত্রের অভিনেতা চমৎকার কাজ করেছেন। আর অরেলিয়ানো বাবিলোনিয়া চরিত্রে সেবাস্তিয়ান ওসোরিও চমৎকার।
নেটফ্লিক্স তাদের দ্বিতীয় সিজনে মাকোন্দোর বদলের ইতিহাসেই গুরুত্ব দিয়েছে। তার মধ্যেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বুয়েন্দিয়া পরিবারও। উষ্ণ হাওয়ার সর্বশেষ ঝাঁপটা আসার আগে অরেলিয়ানো বাবিলোনিয়া যখন ধাঁধার উত্তরটা পেয়ে যায়, তখনকার চারপাশের দৃশ্যাবলি নিয়ে সাজানো সিনেমাটোগ্রাফি থেকে দর্শকও বিশ্বাস করতে বাধ্য হবে এ গল্প দ্বিতীবার তৈরি হয় না।