কোথায় হারিয়ে গেল ‘‌ইচিং বিচিং চিচিং চা’

দুই দশক আগেও বিকাল হলেই গ্রামাঞ্চলের শিশু-কিশোররা জড়ো হতো খোলা প্রান্তরে। স্কুল শেষে তাদের অবাধ স্বাধীনতা। বয়স ও সখ্য ভেদে ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে অবিরাম চলত নানান ধরনের খেলাধুলা ও দুরন্তপনা। অবশ্য গ্রাম থেকে শহর—চেনা সে দৃশ্যপট এখন বদলে গেছে

‘আতাবতি আয় আয়, কাক ডাকে কাকা’, ‘রাম দুই সাড়ে তিন, অমাবস্যার ঘোড়ার ডিম’—ছড়ার ছন্দে হাত এপিঠ-ওপিঠ করে দুজন চোর নির্ধারণ করা হয়। এবার দুই চোর মুখোমুখি বসে পা লাগিয়ে রাখে। অন্যরা ছড়া বলতে বলতে পা ও হাত স্পর্শ না করে লাফিয়ে তাদের পার হয়। পা ও হাতের উচ্চতা ধীরে ধীরে বাড়াতে থাকে। লাফানোর সময় কারো পা বা হাত ছুঁয়ে গেলে সে হয় নতুন ‘চোর’। নতুন চোরকে নিয়ে আবার খেলা শুরু হয়। লাফানোর সময় ছড়া কাটতে থাকে ‘‌ইচিং বিচিং চিচিং চা, প্রজাপতি উড়ে যা’...

দুই দশক আগেও বিকাল হলেই গ্রামাঞ্চলের শিশু-কিশোররা জড়ো হতো খোলা প্রান্তরে। স্কুল শেষে তাদের অবাধ স্বাধীনতা। বয়স ও সখ্য ভেদে ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে অবিরাম চলত নানান ধরনের খেলাধুলা ও দুরন্তপনা। অবশ্য গ্রাম থেকে শহর—চেনা সে দৃশ্যপট এখন বদলে গেছে। কালক্রমে হারাচ্ছে অনেক কিছু, হারাচ্ছে গ্রামীণ খেলাধুলাও।

বর্তমান প্রজন্মের শিশুদের কাছে কানামাছি, বউচি, হা-ডু-ডু, গোল্লাছুট, ডাংগুলি, মার্বেল, রশিটানা, ইচিং-বিচিং, ওপেন টু বায়োস্কোপ, দাড়িয়াবান্ধা, কুতকুত কিংবা চড়ুইভাতির মতো নামগুলো কেমন যেন দুর্বোধ্য। অথচ একসময় ঋতু ও লিঙ্গভেদে গ্রামীণ খেলার রূপ ছিল বৈচিত্র্যময়। ছেলেরা মেতে উঠত হা-ডু-ডু, ডাংগুলি, কাবাডি, সাতগুটি, ষোলগুটি, লাটিম, ঘুড়ি ওড়ানো, গাদন, মার্বেল, কপালটোকাতে। গ্রীষ্মে যখন পুকুর বা ডোবা শুকিয়ে কাদা বেরিয়ে আসত, সেখানে পোক্ত লাঠি সজোরে পুঁতে রেখে চলত দখলের লড়াই; যার লাঠি সবার শেষে টিকত, সে-ই হতো ‘রাজা’।

অন্যদিকে মেয়েদের রাজত্ব ছিল গোল্লাছুট, দাঁড়িয়াবান্ধা, এক্কাদোক্কা, কুতকুত, কড়িখেলা, ইচিং-বিচিং, পুতুলখেলা, ওপেন টু বায়োস্কোপ কিংবা রান্নাবাটিতে। মাটির পাত্রের চারা দিয়ে এক পায়ে ভর দিয়ে ঘর অতিক্রমের এক্কাদোক্কা কিংবা ঘর কেটে মাটিতে কড়ি গড়িয়ে পয়েন্ট সংগ্রহের লড়াই ছিল মেয়েদের নিজস্ব আনন্দের জগৎ। আবার ওপেন টু বায়োস্কোপ, কুতকুত, বউচি খেলায় ছেলেরাও সুযোগ বুঝে অংশ নিত।

গ্রামবাংলার এসব খেলার উপকরণগুলো ছিল অত্যন্ত সহজলভ্য। ইট, পাথর, গাছের ডাল, ভাঙা টালি আর কাচের চুড়ি দিয়েই তৈরি হতো খেলার রসদ। ছেঁড়া কাপড়ের বল বানিয়ে আর ভাঙা টালি সাজিয়ে ‘পিট্টু’ খেলার মজাই ছিল আলাদা। আর শীতকালে ধান কেটে নেয়ার পর সার সার খড়ের পালুইয়ে চলত লুকোচুরি। খোলা মাঠে চলত ‘‌হাডুডু’, ‘দাঁড়িয়াবান্ধা’। কিছু খেলা ছিল পুরোপুরি শারীরিক শক্তির ও কৌশলের—যেমন ৮ থেকে ১০ জন নিয়ে ঘর ভাগ করে বউকে মুক্ত করার ‘বউচি’ কিংবা ৫০ ফুট লম্বা কোটে আড়াআড়ি লাইন টপকে প্রতিপক্ষকে ফাঁকি দেয়ার ‘দাঁড়িয়াবান্ধা’। এছাড়া নদীপ্রধান অঞ্চলে চলত রোমাঞ্চকর নৌকাবাইচ, আর হাটে-বাজারে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে আয়োজন করা হতো ষাঁড়ের লড়াই ও ঐতিহ্যবাহী লাঠিখেলা।

শুধু বাইরের মাঠ নয়, অলস দুপুর কিংবা নিঝুম সন্ধ্যায় ঘরোয়া বা ‘ইনডোর’ খেলার চর্চাও ছিল চোখে পড়ার মতো। মেঝেতে খড়ি দিয়ে ঘর কেটে ছোট ঘুঁটি বা তেঁতুলবীজ দিয়ে খেলা হতো বাঘ-ছাগল, ছাতপাত, অষ্টচৌকা ও কড়িখেলা। এসব খেলায় শুধু বিনোদনই হতো না, প্রয়োগ করতে হতো তীক্ষ্ণ বুদ্ধিও। আট থেকে আশি—বাড়ির বৌ-ঝিঁ’দের সঙ্গে ছোটরাও এতে মেতে উঠত।

যে খেলাগুলো একসময় শৈশবের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল, সেগুলো এখন কালেভদ্রে বিশেষ কোনো দিবস উপলক্ষেই শুধু দেখা মেলে। সীমিত পরিসরে এখন হয়তো কোথাও কেবল নৌকাবাইচ বা বলিখেলা টিকে আছে। বাকি খেলাগুলো হারিয়ে গেছে আমাদের জীবন থেকে। প্রযুক্তি এগিয়েছে সত্য, কিন্তু সব আনন্দ ও দুরন্তপনা যেন এখন শুষে নিয়েছে চারদেয়ালের ভেতরের স্ক্রিন আর স্মার্টফোন।

আরও