মেসিকে ঘিরে বিশ্বকাপের সবচেয়ে আবেগঘন লড়াই

এ লড়াইয়ের কেন্দ্রে রয়েছেন ৩৯ বছর বয়সী লিওনেল মেসি। আর্জেন্টিনা যেন শুধু দেশের জন্য নয়, মেসির জন্যও খেলছে। ড্রেসিংরুম থেকে শুরু করে সমর্থকদের আবেগ—সবখানেই মেসিকে ঘিরে এক ধরনের ‘ব্যক্তিপূজা’র পরিবেশ তৈরি হয়েছে। বিশ্বকাপ জয়ের মাধ্যমে তার বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে আরেকটি স্মরণীয় অধ্যায় যোগ করার স্বপ্ন দেখছে পুরো আর্জেন্টিনা

লিওনেল মেসির ক্যারিয়ারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ হতে যাচ্ছে বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনাল। শুধু ফাইনালে ওঠার লড়াই নয়, ইতিহাস, রাজনীতি, জাতীয় আবেগ ও ফুটবল—সবকিছু মিলিয়ে এই ম্যাচকে বিশ্বকাপের অন্যতম বড় দ্বৈরথ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

আর্জেন্টিনা–ইংল্যান্ড ম্যাচের গুরুত্ব শুধু মাঠের ৯০ মিনিটে সীমাবদ্ধ নয়। ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড (মালভিনাস) যুদ্ধের স্মৃতি এখনো আর্জেন্টিনার জাতীয় চেতনায় গভীরভাবে রয়ে গেছে। ফলে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে প্রতিটি ম্যাচই দেশটির কাছে বিশেষ আবেগের। অন্যদিকে ইংল্যান্ডের কাছে এটি মূলত একটি ঐতিহাসিক ফুটবল প্রতিদ্বন্দ্বিতা।

এ লড়াইয়ের কেন্দ্রে রয়েছেন ৩৯ বছর বয়সী লিওনেল মেসি। আর্জেন্টিনা যেন শুধু দেশের জন্য নয়, মেসির জন্যও খেলছে। ড্রেসিংরুম থেকে শুরু করে সমর্থকদের আবেগ—সবখানেই মেসিকে ঘিরে এক ধরনের ‘ব্যক্তিপূজা’র পরিবেশ তৈরি হয়েছে। বিশ্বকাপ জয়ের মাধ্যমে তার বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে আরেকটি স্মরণীয় অধ্যায় যোগ করার স্বপ্ন দেখছে পুরো আর্জেন্টিনা।

তবে ফুটবলে কোনো কিংবদন্তির জন্য আলাদা নিয়ম নেই। মেসি সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার হলেও শেষ পর্যন্ত ফল নির্ধারণ হবে মাঠের খেলায়। যদি আর্জেন্টিনা হেরে যায়, তাহলে ইংল্যান্ডের মতো ঐতিহাসিক প্রতিদ্বন্দ্বীর বিপক্ষে বিদায় নিতে হবে তাকে। আর যদি জয় আসে, তাহলে আরেকটি বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলার সুযোগ পাবেন তিনি।

মেসিকে ঘিরে বিশ্বকাপে নানা ষড়যন্ত্র তত্ত্বও ছড়িয়ে পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ কেউ দাবি করছেন, দর্শকসংখ্যা, বাণিজ্যিক স্বার্থ ও বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়তার কথা বিবেচনা করে ফিফা চায় মেসি যত দূর সম্ভব এগিয়ে যাক। তবে এসব দাবির পক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। ফিফার অতীতের নানা বিতর্ক, অস্বচ্ছ সিদ্ধান্ত এবং ক্ষমতা প্রয়োগের ধরন মানুষের মধ্যে অবিশ্বাস তৈরি করেছে বলেই এমন সন্দেহ সহজেই ছড়িয়ে পড়ছে।

মাঠের লড়াইয়ে ইংল্যান্ডের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে মেসিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা। পরিসংখ্যান বলছে, ২০০৯ সালের চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালের পর থেকে ইংলিশ ক্লাবগুলোর বিপক্ষে ২৬ ম্যাচে ২৭ গোল করেছেন তিনি। ম্যানচেস্টার সিটি ও টটেনহামের বিপক্ষে তার কয়েকটি পারফরম্যান্স এখনো আধুনিক ফুটবলের সেরা ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

তবে মেসিকে থামানোর পথও দেখিয়েছে কিছু দল। উচ্চগতির ফুটবল, মাঝমাঠে নিরবচ্ছিন্ন চাপ এবং শারীরিক লড়াইয়ের মাধ্যমে তার প্রভাব কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে কয়েকবার। সাম্প্রতিক সময়ে কেপ ভার্দেও আর্জেন্টিনার বিপক্ষে একই ধরনের কৌশল নিয়ে মেসির কাছে বল পৌঁছানোর পথ অনেকটা বন্ধ করে দিয়েছিল। ইংল্যান্ডও যদি শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক প্রেসিং করে এবং মাঝমাঠে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তাহলে মেসিকে স্বাভাবিক ছন্দে খেলতে দেয়া হবে না।

ইংল্যান্ডের ভরসা ডেকলান রাইস, যার দৌড় ও শারীরিক সক্ষমতা মাঝমাঠে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। হ্যারি কেইনের বড় ম্যাচে জ্বলে ওঠার সামর্থ্যও ইংল্যান্ডের অন্যতম আশা। আর জুড বেলিংহামের আত্মবিশ্বাস, নেতৃত্বগুণ এবং চাপের মুহূর্তে দায়িত্ব নেয়ার মানসিকতা ইংল্যান্ডকে বাড়তি শক্তি দিতে পারে।

অন্যদিকে আর্জেন্টিনা শুধু মেসিনির্ভর দল নয়। তাদের আক্রমণভাগে এমন একাধিক ফুটবলার রয়েছেন, যারা প্রতিপক্ষের সামান্য ভুলও কাজে লাগাতে সক্ষম। ফলে পুরো মনোযোগ শুধু মেসির দিকে দিলে অন্যদের জন্য জায়গা তৈরি হওয়ার ঝুঁকিও থাকবে।

বিশ্লেষকদের মতে, এ সেমিফাইনাল শুধু কৌশল, পরিসংখ্যান বা তারকাদের লড়াই নয়। এটি দুই দেশের ইতিহাস, দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা, জাতীয় আবেগ এবং একজন কিংবদন্তির শেষ বিশ্বকাপ অভিযানের এক অসাধারণ মিলনমঞ্চ। শেষ পর্যন্ত ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারে মানসিক দৃঢ়তা, চাপ সামলানোর ক্ষমতা এবং সেই বিশেষ মুহূর্তে কে নিজের সামর্থ্যের সর্বোচ্চটা বের করে আনতে পারে।

তাই এই ম্যাচকে অনেকেই শুধু বিশ্বকাপের আরেকটি সেমিফাইনাল নয়, বরং লিওনেল মেসির উত্তরাধিকার, ইংল্যান্ড–আর্জেন্টিনা বৈরিতার নতুন অধ্যায় এবং আধুনিক ফুটবলের সবচেয়ে আলোচিত দ্বৈরথগুলোর একটি হিসেবে দেখছেন। মাঠে শেষ বাঁশি বাজার পরই জানা যাবে, মেসির বিশ্বকাপ স্বপ্ন আরও এক ধাপ এগোবে, নাকি ইতিহাস অন্য কোনো গল্প লিখবে।

দ্য গার্ডিয়ান অবলম্বনে

আরও