ইউএস ওপেন

ফাইনালে মুখোমুখি জভেরেভ শেলটন

দুজনের জন্যই প্রথমবারের মতো গ্র্যান্ড স্লামের ফাইনালে ওঠার হাতছানি।

ফ্লাশিং মিডোয় দারুণ এক দৃশ্যের অবতারণা। ইউএস ওপেনের সেমিফাইনালে মুখোমুখি দুই আমেরিকান বেন শেলটন ও ফ্রান্সিস টিয়াফো। দুজনের জন্যই প্রথমবারের মতো গ্র্যান্ড স্লামের ফাইনালে ওঠার হাতছানি। গ্যালারি ভর্তি দর্শক, যার উল্লেখযোগ্যই ছিল হলিউডসহ নানা অঙ্গনের তারকা। তারা তাদের দুই পছন্দের খেলোয়াড়কেই সমান উদ্দীপনায় সমর্থন জানান। অবশেষে রোমাঞ্চকর এ ম্যাচে জয় পান শেলটন। ম্যাচে তিনি ৪-৬, ৬-৩, ৬-৩, ৭-৫ গেমের জয় তুলে নেন। ইউএস ওপেনের শিরোপার লড়াইয়ে তিনি শীর্ষ বাছাই জার্মানির আলেক্সান্ডার জভেরেভের মুখোমুখি হবেন। শেলটন প্রথম ও জভেরেভ দ্বিতীয় গ্র্যান্ড স্লাম শিরোপার লক্ষ্যে খেলবেন। বাংলাদেশ সময় আজ রাত ১২টায় ছেলেদের এককে শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচ শুরু হবে।

২০০৩ সালে ফ্লাশিং মিডোয় অ্যান্ডি রডিকের জয়ের পর আমেরিকান কোনো পুরুষ খেলোয়াড় শিরোপা জিততে পারেননি। এবার আশা জেগেছে শেলটনকে নিয়ে। তিনি আমেরিকান সমর্থকদের শিরোপার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ২৩ বছর বয়সী শেলটন বলেন, ‘আমি জয়ের জন্যই নামছি এবং কোর্টে নিজের সবটুকু উজাড় করে দেব। আশা করি আপনারা সবাই এসে আমাকে সমর্থন জানাবেন। চলুন আমেরিকার জন্য এটি করি।’

আর্থার অ্যাশের (১৯৭২ সাল) পর প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষ খেলোয়াড় হিসেবে ইউএস ওপেনের ফাইনালে উঠেছেন শেলটন, আর ২০০৮ সালের পর যেকোনো গ্র্যান্ড স্লামের ফাইনালে ওঠা প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষ খেলোয়াড়। সর্বশেষ ২০০৮ সালের অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের ফাইনালে হেরে গিয়েছিলেন ফ্রান্সের জো-উইলফ্রেড সোঙ্গা।

প্রথমবার ফাইনালে ওঠার আনন্দ চেপে রাখতে পারেননি শেলটন। তিনি বলেন, ‘অনেক আবেগের ফাইনাল। আজকের এ জায়গায় আসতে আমার মামা ও বাবা অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন। আমার বাবা তার মাকে হারিয়েছেন। তাকে (দাদি) ছাড়া আজকের বেন শেলটন এখানে আসতে পারত না। এ জয়টা তার জন্য।’

নিউইয়র্কের স্থানীয় সময় বুধবার রাত ৩টা ৩৩ মিনিটে শেষ হওয়া কোয়ার্টার ফাইনালে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন স্পেনের কার্লোস আলকারাজকে হারিয়ে দেন ৮ নম্বর বাছাই খেলোয়াড় শেলটন, যা ইউএস ওপেনের ইতিহাসে সবচেয়ে দেরিতে শেষ হওয়া ম্যাচ। এত দীর্ঘ লড়াইয়ের পরও সেমিফাইনালে তার শক্তিতে কোনো ঘাটতি ছিল না। এ অদম্য খেলোয়াড়ের সামনে এবার জীবনের সবচেয়ে বড় ম্যাচ। এখন তাকে থামাতে হবে ফরাসি ওপেন চ্যাম্পিয়নকে, যিনি প্রতিপক্ষের জন্য কতটা কঠিন প্রতিপক্ষ, সেটা টেনিস বিশ্ব জানে।

জভেরেভ বলেন, ‘আশা করি, রোববার (আজ) আমেরিকান স্বপ্ন পূরণ হতে দেব না।’

শেলটনের আগেই ফাইনালের টিকিট কাটেন জভেরেভ। তিনি প্রথম সেমিফাইনালে রাশিয়ার কারেন খাচানভকে হারান ৬-৩, ৭-৬ (৭), ৭-৬ (৬) গেমে।

শেলটন ও টিয়াফোর ম্যাচ দেখতে তারকাদের ঢল নেমেছিল। তাদের মধ্যে ছিলেন টেনিস কিংবদন্তি সেরেনা উইলিয়ামস, জ্যালেন ব্রানসন, শেলটনের প্রেমিকা আমেরিকান ফুটবল তারকা ট্রিনিটি রডম্যান, অভিনেতা সালমা হায়েক, বেন স্টিলার, রামি মালেক প্রমুখ।

রডিক শিরোপা জেতার সময় শেলটনের বয়স ছিল এক বছরেরও কম। জর্জিয়া থেকে উঠে আসা ২৩ বছর বয়সী শেলটন সেমিফাইনাল নিয়ে বলেন, ‘আমরা এ টুর্নামেন্টের শেষ ধাপেই পৌঁছতে চেয়েছিলাম। এটি আমাদের দুজনেরই বিশ্বের সবচেয়ে প্রিয় টুর্নামেন্ট, সবচেয়ে প্রিয় কোর্ট এবং এ দর্শকদের সামনে খেলাটিকে মহিমাময় করে তোলার চেয়ে দারুণ অনুভূতি আর হতে পারে না।’

কাছের বন্ধু টিয়াফোকে নিয়ে তিনি বলেন, ‘ফ্রান্সিস (টিয়াফো) আমার কাছে বড় ভাইয়ের মতো। যখনই তার সঙ্গে কোর্টে একত্রে খেলি কিংবা মুখোমুখি হই, সেটা হয়ে ওঠে বিশেষ আনন্দের।’

ইউএস ওপেনের সেমিফাইনালে এটি ছিল টিয়াফোর তৃতীয় পরাজয় (০-৩), যার শেষ দুটি ছিল স্বদেশী খেলোয়াড়দের বিপক্ষে। ২০২৪ সালে তাকে হারিয়ে ফাইনালে উঠেছিলেন টেইলর ফ্রিটজ। আরেকবার হেরেছেন ইতালির ইয়ান্নিক সিনারের কাছে। শেলটনের কাছে হারের পর তিনি বলেন, ‘আমি গ্র্যান্ড স্লামের ফাইনালে উঠতে চেয়েছিলাম। স্পষ্টতই এটি অনেক বড় ম্যাচ ছিল। বেন (শেলটন) অসাধারণ খেলেছে। বিশেষ করে খুব ভালো সার্ভ করেছে, যা আমার জন্য কাজটা বেশ কঠিন করে তুলেছিল।’

প্রথম সেটে বেশ পরিচ্ছন্ন টেনিস খেলেন টিয়াফো। তিনি মাত্র তিনটি আনফোর্সড ভুল করেন, যেখানে শেলটনের ভুল ছিল ১৪টি। ৪-৪ পয়েন্টে শেলটনের ডাবল-ফল্টের সুবাদে প্রয়োজনীয় ব্রেকটি পেয়ে যান টিয়াফো। তবে পিছিয়ে পড়ার পর শেলটন আরো দুর্দান্ত সব সার্ভ করতে থাকেন এবং পুরো ম্যাচে মোট ২০টি এস মারেন।

দ্বিতীয় সেটে ৩-৩ পয়েন্টে নতুন বলে সার্ভিস করার সময় শেলটন ১২৫ মাইল বেগে সার্ভ করেন—টিয়াফো তার রÅাকেট দিয়ে কোনোমতে বলটি ঠেকানোর চেষ্টা করতে গিয়ে উল্টে পেছনে পড়ে যান। এরপর শেলটন যথাক্রমে ১৪৪, ১৩৯ ও ১৪০ মাইল বেগে সার্ভ করেন, যার শেষ দুটি ছিল এস। ম্যাচের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তটি আসে তৃতীয় সেটের শেষ গেমটিতে, যখন টিয়াফো তার সার্ভিস ধরে রাখার জন্য মরিয়া হয়ে চেষ্টা করছিলেন। গেমটি প্রায় ১৫ মিনিট ধরে চলে। শেষ পর্যন্ত টিয়াফোর একটি ফোরহ্যান্ড নেটে লাগলে গেমটির সমাপ্তি ঘটে এবং শেলটন ২-১-এ লিড নেন। এরপর ৭-৫-এ জিতে নেন চতুর্থ সেটটি।

ছেলেদের টেনিসে অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হয়েও দীর্ঘদিন গ্র্যান্ড স্লাম শিরোপাবিহীন ছিলেন জভেরেভ। অবশেষে এ বছর ফরাসি ওপেন জিতে সেই অপবাদ ঘোচান তিনি। জার্মান তারকা এরপর উইম্বলডন ফাইনালেও ওঠেন (যেখানে তিনি সিনারের কাছে হারেন)। এ বছর গ্র্যান্ড স্লাম ম্যাচে তার জয়ের রেকর্ড ২৪-২। আরেকবার তিনি ফাইনালে জায়গা করে নিলেন।

জয় শেষে জভেরেভ বলেন, ‘কখনো কখনো জিনিসগুলো আপনার অনুকূলে চলে আসে। মেজর টুর্নামেন্টগুলোয় আমাকে অনেক লড়াই করতে হয়েছে, অনেকবার খুব কাছে গিয়েও পারিনি। হয়তো ঈশ্বর এবার ভেবেছেন যে এ বছরটা তোমার এবং কোর্টে শুধু সময়টা উপভোগ করো।’

এখন তিনি সেই শিরোপাটি জয়ের চেষ্টা করবেন, যা ২০২০ সালে অল্পের জন্য হাতছাড়া হয়েছিল তার। ডমিনিক থিমের বিপক্ষে প্রথম দুই সেট জয়ের পরও শেষ পর্যন্ত পঞ্চম সেটের টাইব্রেকারে হেরে যান জভেরেভ। ১৯৪৯ সালের পর থিমই প্রথম পুরুষ খেলোয়াড়, যিনি প্রথম দুই সেট হেরেও ইউএস ওপেন শিরোপা জিতেছিলেন।

জভেরেভ কোনো গ্র্যান্ড স্লামে প্রথম দুই রাউন্ডেই পাঁচ সেটের ম্যাচ খেলা প্রথম ১ নম্বর বাছাই খেলোয়াড়, যিনি টানা ১৩টি সেট জিতেছেন। এবার তিনি হারালেন খাচানভকে, যিনি প্রথম গ্র্যান্ড স্লাম ফাইনালে ওঠার চেষ্টা করছিলেন। এ মৌসুমে জয়ের চেয়ে পরাজয়ের রেকর্ড বেশি নিয়ে এলেও তিনি তার ক্যারিয়ারের তৃতীয় গ্র্যান্ড স্লাম সেমিফাইনালে পৌঁছেন। ৫০ নম্বর বাছাই খাচানভ ১৯৭৩ সালে এটিপি র‍্যাংকিং শুরুর পর থেকে ইউএস ওপেনের সবচেয়ে নিম্ন র‍্যাংকিংধারী হিসেবে ফাইনালে ওঠার চেষ্টা করছিলেন।

আরও