সাইবর্গ হালান্ডে চূর্ণ ব্রাজিল

বিষাদেই বিদায় নেইমারের

মেটলাইফ স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে তখনো হলুদের বন্যা। ৭০ হাজার কণ্ঠে তখনো ব্রাজিল, ব্রাজিল ধ্বনি, বাতাসে সাম্বার সুর, চোখে-মুখে সেই পুরনো বিশ্বাস।

যে বিশ্বাস দশক পেরিয়ে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বাহিত হয়ে এসেছে। কিন্তু মাঠের ভেতরে ইতিহাস তখন অন্য এক কলম দিয়ে লিখছিল নতুন এক অধ্যায়, যেখানে নায়ক হলুদ জার্সির কেউ নন। নায়ক এক নরওয়েজিয়ান সাইবর্গ—আর্লিং হালান্ড। যাকে ম্যাচের বেশির ভাগ সময় মনেই হয় না মাঠে আছেন, কিন্তু যখন তিনি জেগে ওঠেন, ৯০ মিনিটের সব হিসাব এক মুহূর্তে ভেঙে পড়ে। সেই জেগে ওঠাই যেন ব্রাজিলের দীর্ঘ পতনের ইতিহাসে শেষ পেরেকটি ঠুকে দিল। কোনো বাড়তি দৌড়ঝাঁপ নেই, নান্দনিকতার ভান নেই। রক্ত-মাংসের মোড়কে নিখাদ সাইবর্গ; যখনই সুযোগ এসেছে, মানবীয় দ্বিধা ছাড়াই নির্ভুল অ্যালগরিদমের মতো বল জালে জড়িয়েছেন।

সাইবর্গ হালান্ডের নির্মমতার কাছে করুণ আত্মসমর্পণের ছবিটাই যেন পূর্ণতা পেল রেফারির শেষ বাঁশি বাজার পর। এক পাশে ভাইকিংদের উল্লাস, অন্য পাশে চোখের কোণে জল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা নেইমার। যে ছেলেটিকে একদিন ব্রাজিল নতুন পেলে, রাজপুত্র, হারানো সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী ভেবে বুকভরা স্বপ্ন দেখেছিল, সেই তিনিই শেষবারের মতো বিশ্বকাপের মঞ্চ ছেড়ে হাঁটছিলেন মাথা নিচু করে। তার পেনাল্টির গোলটি যেন বিদায়ের আগে রেখে যাওয়া শেষ স্বাক্ষর। তাই মেটলাইফের ম্যাচটি হালান্ডের মহিমার কাব্য নয়; ফুটবলের এক দুঃখী রাজপুত্রের নীরব প্রস্থানগাথা, অপূর্ণ স্বপ্নের শোকসংগীত, আর একসময় পৃথিবীকে সুন্দর ফুটবল শেখানো এক সাম্রাজ্যের দীর্ঘ বিষাদের আরেকটি অধ্যায়।

গারিঞ্চার বাঁকানো দৌড়, পেলের ছন্দময় নাচ, জিকোর শৈল্পিক পাস, সক্রেটিসের দার্শনিক পায়ের কাজ, রোনালদিনহোর জাদু ছিল জোগো বনিতোর প্রতিমূর্তি। ফুটবলকে ধর্মের মতো পালন করার এক জাতির ঐতিহ্য। মারাকানার সেই বিষাদের পরও প্রতিটি প্রজন্ম এ বিশ্বাসকে বহন করে এসেছে যে ব্রাজিল বল দখলে রাখবে, বল দিয়ে খেলবে, বল দিয়ে জিতবে। কিন্তু গতকাল নিউ জার্সিতে সেই ঐতিহ্যের মুখোশ যেন খুলে পড়ল জনসম্মুখে। আনচেলত্তির ব্রাজিল বল দখলে রাখতে চায়নি, দখল ছেড়ে দিয়েছিল প্রতিপক্ষের হাতে, গা বাঁচিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল রক্ষণে, আর অপেক্ষা করেছিল পাল্টা আক্রমণের ছুরি চালানোর জন্য।

অথচ একসময় ব্রাজিল মানেই ছিল ধ্রুপদি কবিতা। বল পায়ে তাদের যে ছন্দ, তা যেন মার্কেজের জাদুবাস্তবতারই ফুটবলীয় রূপান্তর। গ্যালারিতে যখন সাম্বা বাজত, মাঠের হলুদ জার্সিগুলোকে মনে হতো মাকোন্দো গ্রামের সেই জাদুকরী হলুদ প্রজাপতির ঝাঁক যেন উড়ে বেড়াচ্ছে। এদুয়ার্দো গালিয়ানো আধুনিক ফুটবলের যান্ত্রিকতা নিয়ে যে আক্ষেপ করতেন, ব্রাজিল ছিল সেই যান্ত্রিকতার যুগে শিল্পের শেষ আশ্রয়। তাদের ফুটবল-দর্শনে গোল করাটা কেবল বলকে জালে জড়ানো নয়, ছিল ক্যানভাসে তুলির শেষ আঁচড়টি দেয়ার মতো সৌন্দর্যের উদযাপন।

যে জাতি বল দখলে রাখাকে অভ্যাসের মতো লালন করেছে দশকের পর দশক, সেই জাতির দল ম্যাচ শেষ করল মাত্র ৩৪ শতাংশ পজেশন নিয়ে। ব্রাজিল সম্পূর্ণ করেছিল ২৭৯ পাস ৩২৯ প্রচেষ্টায়। অথচ নরওয়ে সম্পন্ন করেছিল ৬১৭ পাস ৬৮০ প্রচেষ্টায়। বিশ্বব্যাপী কোটি কোটি ব্রাজিলিয়া সমর্থক তাকিয়ে রইল অবিশ্বাসে, যেন নিজেদেরই পুরনো আয়নায় অন্য কারো মুখ দেখছে।

কার্লো আনচেলত্তির পরিকল্পনা স্পষ্ট ছিল। বল নরওয়ের কাছে থাকুক, ব্রাজিল অপেক্ষা করবে। তারপর ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, মাতেউস কুনিয়া, মার্তিনেল্লি, রায়ান কিংবা এন্দ্রিকের গতিতে ছুরি চালাবে। কিন্তু ব্রাজিলের ইতিহাসে মাঝমাঠ কখনো শুধু যাতায়াতের রাস্তা ছিল না; ছিল ধ্রুপদি শিল্পের কারখানা। আনচেলত্তির এ ব্রাজিলে সেটিই যেন বদলে গেছে।

ম্যাচের শুরুতেই অবশ্য গল্প অন্য রকম হতে পারত। কুনহাকে ফেলে দিলে ভিএআরের সহায়তায় পেনাল্টি পায় ব্রাজিল। হলুদ গ্যালারি তখন উল্লাসে ফেটে পড়ার অপেক্ষায়। কিন্তু ব্রুনো গিমারায়েসের শট দুর্বল, দ্বিধাগ্রস্ত ও অনুমেয়। অরিয়ান নিল্যান্ড ঝাঁপিয়ে পড়ে সেটি ঠেকিয়ে দিলেন। ভিনিসিয়ুস নয়, কুনহা নয়—গিমারায়েস কেন? এ প্রশ্নও তখন ব্রাজিলের কপালে জমা অশুভ মেঘের মতো ভেসে উঠল। ১৯৮৬ সালের পর বিশ্বকাপে এই প্রথম কোনো পেনাল্টি হাতছাড়া করল ব্রাজিল। জিকোর সঙ্গে তুলনা হওয়া কখনো প্রশংসার, কিন্তু গিমারায়েসের জন্য তা হয়ে রইল লজ্জার এক অধ্যায়, যা তিনি বহুদিন মনে রাখবেন।

তার পরও ম্যাচ ছিল সমানে সমান, উত্তেজনায় ঠাসা, একবার এদিক একবার ওদিক। রাফিনহা আর পাকেতার অনুপস্থিতিতে আনচেলত্তি নামিয়েছিলেন রায়ান আর মার্তিনেল্লিকে দুই প্রান্তে, ভিনিসিউস আর কুনহাকে দিয়েছিলেন স্বাধীনতা। নরওয়ে রক্ষণে রাইয়ারসনকে ফিরিয়ে এনেও জুনিয়রকে আটকাতে পারেনি ঠিকমতো। ভিনির চুরি করা বল থেকে সপ্তম নম্বর জার্সিধারী সুযোগ পেয়েছিলেন, বাঁ পায়ের নিচু শট নিয়েছিলেন, কিন্তু নিল্যান্ড আবারো দেয়াল হয়ে দাঁড়ালেন। ওদিকে ওডেগার্ডের বাঁ পায়ের শট আলিসনের হাতে গিয়ে ঠেকল অবিশ্বাস্য দক্ষতায়। প্রথমার্ধ শেষ হলো গোলহীন, কিন্তু নিস্তব্ধ নয়। দুই গোলরক্ষকের নৈপুণ্যে ভরা এক নাটকীয় অর্ধ, যেখানে প্রতিটি আক্রমণই মনে হচ্ছিল গোলের কার্নিশে দাঁড়িয়ে।

বিরতির পর সলবাক্কেন করলেন সাহসী জুয়া। দুই উইঙ্গার সরলথ আর নুসাকে তুলে নামালেন শেলডেরুপ আর ববকে। প্রথম দর্শনে মনে হয়েছিল ঝুঁকিপূর্ণ, কিন্তু পরে প্রমাণিত হলো মাস্টারস্ট্রোক। এ বদলই যেন খুলে দিল দরজা।

ম্যাচের প্রথমার্ধে হালান্ডকে অনেকক্ষণ দেখা যায়নি। তিনি বল ছুঁয়েছেন কম, খেলায় ছিলেন ছায়ার মতো। কিন্তু এটাই হালান্ডের সবচেয়ে ভয়ংকর রূপ। তিনি মাঠে সর্বক্ষণ খেলেন না; তিনি শেষ বাক্যটি লেখেন। তাকে থামানো গেছে বলে মনে হয়, ঠিক তখনই তিনি বেরিয়ে আসেন। ৭৯ মিনিটে শেলদেরুপের নিখুঁত ক্রসে গ্যাব্রিয়েল মাগালিয়াইসকে পেছনে ফেলে হালান্ড যখন মাথা ছোঁয়ালেন, আলিসন তাকিয়ে রইলেন, বল জালে। নরওয়ে এগিয়ে গেল ১-০।

মিনিট এগারোর ব্যবধানে আবার শেলডেরুপের সাজানো বল, বাঁ পায়ের বিদ্যুৎগতির শটে আলিসনকে পরাস্ত করলেন তিনি। বল বাঁক খেয়ে ঢুকল গোলরক্ষকের বাঁ দিকের পোস্ট ঘেঁষে। পুরো ম্যাচে ৩০ বারের বেশি বল স্পর্শ করেননি হালান্ড, মাত্র চারটি শট নিয়েছিলেন, তার দুটিই জালে জড়াল। ব্রাজিলের রক্ষণ তাকে গোটা ম্যাচে বন্দি করে রেখেছিল, নিষ্প্রভ, নিরুপায়। অথচ যে দুবার তিনি জেগে উঠলেন, তাতেই ছিটকে গেল সেলেসাওরা।

এ বিশ্বকাপে এটি ছিল হালান্ডের সপ্তম গোল, মেসি আর এমবাপ্পের পাশে বসিয়ে দিল তাকে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে। জাতীয় দলের হয়ে গত ১৪টি প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচের প্রতিটিতে গোল করেছেন তিনি। ৫৪ ম্যাচে ৬২ গোল। ক্লাব ফুটবলে তার ৩১৭টি গোল থাকা সত্ত্বেও এ বিশ্বকাপ হয়তো তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অর্জন হয়ে থাকবে। পাঁচ মিলিয়ন মানুষের এক ছোট্ট দেশকে তিনি একা কাঁধে তুলে নিয়ে গেলেন ইতিহাসের প্রথম কোয়ার্টার ফাইনালে।

যোগ করা সময়ে পেনাল্টি থেকে গোল করলেন নেইমার। অস্টিগার্ডের বেপরোয়া ট্যাকলের পর পাওয়া সুযোগ, তার নিজের বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচে শেষ গোল, ২০২৩ সালের পর জাতীয় দলের জার্সিতে প্রথম। কিন্তু গোলটা এল বড় দেরিতে, এল কেবল সান্ত্বনার জন্য। এল এমন এক মুহূর্তে যখন ম্যাচের ফলাফল আগেই লেখা হয়ে গেছে। মাঠ ছাড়ার সময় নেইমারের চোখে জল, আর সেই কান্না যেন প্রতীকী হয়ে রইল গোটা এক প্রজন্মের বিদায়ের। এক প্রজন্ম যারা রোনালদিনহো-কাকার হাত ধরে বড় হয়েছিল, কিন্তু শেষ পরিণতি হলো প্রতিপক্ষের কাছে নতমস্তক বিদায়ে।

ব্রাজিলের এ হার শুধু নরওয়ের কাছে নয়। এটি দীর্ঘ এক অভিশাপের আরেক অধ্যায়। ২০০২ সালে জার্মানিকে হারিয়ে পঞ্চম বিশ্বকাপ জয়ের পর থেকে নকআউটে ইউরোপ যেন ব্রাজিলের ভাগ্যের নিষ্ঠুর লেখক। ২০০৬ সালে ফ্রান্স প্রথম অধ্যায়টি লিখেছিল। তারপর একে একে নেদারল্যান্ডস, জার্মানি, বেলজিয়াম, ক্রোয়েশিয়া—আর এবার নরওয়ে। নিজেদের ফুটবলীয় আত্মপরিচয় ভুলে গিয়ে ছন্দহীন এক অচেনা ফুটবলের পেছনে ছোটার যে চড়া মূল্য আজ ব্রাজিলকে চোকাতে হলো, তা ফুটবল ইতিহাসে লেখা থাকবে বিষাদময় অধ্যায় হিসেবে। বিষাদেই বিদায় হলো ফুটবল রাজপুত্রের, আর সেই বিষাদের বাঁশিতে সুর তুললেন নরওয়ের এক নির্দয় সাইবর্গ—আর্লিং হালান্ড।

এন্ড্রিকের গল্পটাও কম করুণ নয়। কাসেমিরোর দুর্দান্ত বল কেড়ে নেয়া, ভিনিসিয়ুসের অসাধারণ পাস, আর তারপর গোলরক্ষকের সামনে একা এন্ড্রিক। কিন্তু নিয়ন্ত্রণ ছিল কম, শট গেল পোস্টের পাশ দিয়ে বাইরে। ফুটবলে প্রতিটি সুযোগ একবারই আসে, আর এন্দ্রিক সেই একবারের মূল্য বুঝলেন বড্ড দেরিতে।

নরওয়ের জয় প্রাপ্য ছিল। ওডেগার্ড মাঝমাঠে শান্ত শাসকের মতো খেলা নিয়ন্ত্রণ করেছেন। প্যাট্রিক বার্গ ও সান্দের বের্গে পরিশ্রম ও পাসের ভারসাম্য দিয়েছেন। শেলডেরুপ ও বব বদলি নেমে ম্যাচের ছক বদলে দিয়েছেন। সোলবাক্কেনের সিদ্ধান্তগুলো যেখানে নরওয়েকে ধারালো করেছে, আনচেলত্তির বদলিগুলো সেখানে ব্রাজিলকে অস্থির করেছে। হলুদ জার্সি মানে ছিল গ্রীষ্মের দুপুরে টেলিভিশনের সামনে বসে থাকা, রোনালদোর দৌড়, রিভালদোর বাঁ পা, রোনালদিনহোর দাঁত বের করা হাসি, কাকার মসৃণ গতি, নেইমারের চোখে স্বপ্ন। সেই ব্রাজিলকে যখন নরওয়ের পাসের পেছনে ক্লান্ত হতে দেখা যায়, তখন পরাজয় শুধু স্কোরলাইনে আটকে থাকে না; তা হয়ে ওঠে নস্টালজিয়ার শোকসভা।

মাঠ ছেড়ে যাওয়ার সময় নরওয়ের সমর্থকরা গাইছিলেন ভাইকিং ঐতিহ্যের সেই বিখ্যাত দাঁড় বাওয়ার গান, হালান্ড নিজেই ড্রাম বাজিয়ে তাল মেলাচ্ছিলেন, আর গ্যালারিতে বেজে উঠেছিল সেই বিখ্যাত সুর। হাজার বছর আগে ভাইকিংরা পাড়ি দিয়েছিল এ মহাদেশের উপকূলে, আর এ শতাব্দীতে তাদেরই উত্তরসূরিরা আমেরিকার মাটিতে চূর্ণ করে দিল ফুটবলের সবচেয়ে জাঁকজমকপূর্ণ সাম্রাজ্যকে। যাদের নাম আগে কেউ বিশ্বকাপের শেষ আটে খুঁজে পায়নি—নরওয়ে, যারা এ শতাব্দীর কোনো বিশ্বকাপেই এতদিন খেলার সুযোগ পায়নি, তারাই এখন স্বপ্ন দেখছে সেমিফাইনালের, হয়তো তারও বেশি কিছুর।

বিপরীতে সাম্বার দেশে বাজছে কেবলই বিষাদের এক করুণ সুর। ব্রাজিল কি আদৌ আর কখনো ফিরে পাবে তাদের সেই হারানো কবিতা? নাকি একদিন ‘জোগো বনিতো’ও মাকোন্দোর হলুদ প্রজাপতির মতোই কেবল পরাবাস্তবতার কিংবদন্তি হয়ে থাকবে? সাইবর্গদের নির্মম যান্ত্রিক যুগে এ আশঙ্কাই ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে গাঢ় বিষাদ।

আরও