আর কিছুক্ষণের অপেক্ষা, এরপরই মাঠে গড়াবে বিশ্বকাপ ফাইনাল, মুখোমুখি হবে আর্জেন্টিনা ও স্পেন। গ্রেটেস্ট শো অন আর্থের এবারের আসরের এ ম্যাচে যদি নির্ধারিত ৯০ মিনিট এবং অতিরিক্ত সময়েও কোনো দল গোল দিতে না পারে, তবে শেষ পর্যন্ত পেনাল্টি শুটআউটই হবে চূড়ান্ত নির্ধারক। এ লড়াইয়ে লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল স্পেন এমন কিছু সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সের ইতিহাস নিয়ে হাজির হচ্ছে, যা তাদের পেনাল্টি শ্যুটারদের পছন্দ, কৌশল এবং একই সঙ্গে দুর্বলতা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দেয়।
স্পেনের খেলা সর্বশেষ দুটি পেনাল্টি ভাগ্য নির্ধারিত হয়েছিল ২০২৫ সালের উয়েফা নেশনস লিগে; যেখানে কোয়ার্টার ফাইনালে তারা নেদারল্যান্ডসকে বিদায় করলেও পরে পর্তুগালের কাছে টাইব্রেকারে হেরে শিরোপা হাতছাড়া করে।
নেদারল্যান্ডসের বিরুদ্ধে সেই সিরিজটি স্প্যানিশ খেলোয়াড়দের মানসিক দৃঢ়তার এক দারুণ দৃষ্টান্ত ছিল। নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময় মিলিয়ে ৩-৩ গোলে সমতা থাকার পর পেনাল্টিতে জয় ছিনিয়ে নেয় স্পেন। সেই দফায় একে একে সফলভাবে বল জালে পাঠান মিকেল মেরিনো, ফেরান তোরেস, অ্যালেক্স গার্সিয়া, অ্যালেক্স বায়েনা এবং পেদ্রি।
পুরো টাইব্রেকারে স্পেনের পক্ষে একমাত্র লামিন ইয়ামালই গোল করতে ব্যর্থ হন। অন্যদিকে স্প্যানিশ গোলরক্ষক উনাই সিমন ডনিয়েল মালেনের নেয়া চূড়ান্ত শটটি রুখে দিয়ে আবারও নিজেকে পেনাল্টি স্পেশালিস্ট হিসেবে প্রমাণ করেন, যার পরপরই পেদ্রি গোল করে দলের সেমিফাইনাল নিশ্চিত করেন।
ওই ম্যাচগুলোতে স্পেনের খেলোয়াড়দের শট নেয়ার একটি চিরচেনা ধরণ লক্ষ্য করা গেছে—তারা খুব বেশি দূর থেকে দৌড়ে না এসে নিখুঁত নিচু শটে বল জালের কোণায় জড়াতে পছন্দ করেন, যেখানে শক্তির চেয়ে সূক্ষ্মতার প্রাধান্যই বেশি থাকে।
এর ঠিক তিন মাস পর, পর্তুগালের বিপক্ষে ফাইনালে স্পেনকে আবারও পেনাল্টির মুখোমুখি হতে হয়, তবে এবার নাটকের শেষটা ছিল ভিন্ন ও বেদনাদায়ক। মিকেল মেরিনো, অ্যালেক্স বায়েনা এবং ইসকো তাদের সুযোগগুলো কাজে লাগালেও আলভারো মোরাতার নেয়া শটটি পর্তুগিজ গোলরক্ষক দিওগো কোস্তা আটকে দেন। মোরাতার এ ব্যর্থতাই শেষ পর্যন্ত ৫-৩ ব্যবধানে স্পেনের পরাজয় ডেকে আনে।
তবে এ জয়-পরাজয়ের হিসাবের বাইরে বর্তমান দলটির সামগ্রিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে একটি স্পষ্ট প্রবণতা দেখা যায়। ওইয়ারজাবাল, বোর্হা ইগলেসিয়াস, গ্রিমালদো, দানি ওলমো, পেড্রো পোরো, মিকেল মেরিনো এবং লামিন ইয়ামালদের ক্যারিয়ারে পেনাল্টি থেকে গোল করার সাফল্যের হার বেশ উঁচুতে। পাশাপাশি রদ্রি, পেদ্রি, নিকো উইলিয়ামস এবং ফেরান তোরেসকেও পেনাল্টি নেয়ার জন্য অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কোচ দে লা ফুয়েন্তে সাধারণত পেনাল্টি নেয়ার ক্ষেত্রে আগে থেকে কোনো নির্দিষ্ট ক্রম নির্ধারণ করে রাখেন না, বরং ম্যাচ শেষে মাঠের খেলোয়াড়দের শারীরিক ও মানসিক অবস্থা বুঝেই তিনি সিদ্ধান্ত নেন।
অন্যদিকে পরিসংখ্যানই বলে দেয় কেন এমিলিয়ানো মার্টিনেসকে পেনাল্টি ঠেকাতে বিশ্বের অন্যতম সেরা বিশেষজ্ঞ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তার বিরুদ্ধে নেয়া মোট ৬৫টি পেনাল্টি শটের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রতিপক্ষরা মাত্র ৬৩ শতাংশ শটে গোল করতে পেরেছে, তিনি নিজে ঠেকিয়েছেন ২৯ শতাংশ এবং বাকি ৮ শতাংশ শট লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে। এই সংখ্যাগুলো প্রতিপক্ষের গোল না করতে পারার সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে ৩৭ শতাংশে নিয়ে যায়।
টাইব্রেকারের সময় তার পারফরম্যান্স আরো বেশি উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। এ পর্বে তার বিপক্ষ দল ২৩টি শটের মধ্যে প্রতিপক্ষ গোল করতে পেরেছে মাত্র ৫২ শতাংশ, যেখানে তিনি নিজে আটকে দিয়েছেন ৪৩ শতাংশ এবং মাত্র ৪ শতাংশ শট পোস্টের বাইরে গেছে।
পাশাপাশি, শট গ্রহণকারীর প্রোফাইল বা ধরন পড়ার ক্ষমতা তার অন্যতম বড় একটি শক্তি। ডানহাতি কিঁকারদের ক্ষেত্রে তিনি সাধারণত নিজের বাম দিকে ঝাঁপিয়ে পড়েন—যেহেতু এই গ্রুপের ৫১ শতাংশ শট এই দিকেই এসেছিল। অন্যদিকে, বাঁহাতি কিঁকারদের মুখোমুখি হওয়ার সময় তিনি নিজের ডান দিকে একটি স্পষ্ট প্রবণতা লক্ষ্য করেন, যেখানে মোট শটের ৭৫ শতাংশ নেয়া হয়েছিল। প্রতিপক্ষের এই ধরনের প্যাটার্ন বা কৌশল বোঝার এবং তাদের সিদ্ধান্তের পূর্বাভাস পাওয়ার ক্ষমতাই পেনাল্টি শ্যুটআউটে তার সাফল্যের মূল রহস্য।
২০২২ কাতার বিশ্বকাপের মতো ২০২৬ বিশ্বকাপ ফাইনালেও আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেসের বোতলে প্রতিপক্ষ স্পেনের পেনাল্টি টেকারদের শট নেয়ার প্রবণতার চিরকুট বা ডাটা স্টিকার লাগানো থাকবে। যেমন স্পেনের বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ পেনাল্টি টেকার চাপের মুখে গোলপোস্টের বাঁ দিকে নিচু শট মারতে পছন্দ করেন। আবার তাদের তরুণ ও টেকনিক্যাল দলটির বিরুদ্ধে মার্টিনেজের চিরচেনা 'মাইন্ড গেমস' এবং মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করার কৌশলটি বেশ কার্যকর হতে পারে, কারণ লুইস দে লা ফুয়েন্তের এই দলটির অনেকেই অনূর্ধ্ব-২১ পর্যায় থেকে উঠে আসা এবং বড় আন্তর্জাতিক ফাইনালের চরম মানসিক চাপ সামলানোর অভিজ্ঞতা তাদের তুলনামূলক কম।
ব্যক্তিগত পরিসংখ্যান দিয়ে হয়তো কোনো দলের প্রবণতা বোঝা সম্ভব, তবে টাইব্রেকারের ভাগ্য কখনোই কেবল সংখ্যাতত্ত্ব দিয়ে মেলানো যায় না। ম্যাচের পরিস্থিতি, মাঠের ক্লান্তি আর চরম মানসিক চাপ যেকোনো পূর্বাভাসকেই মুহূর্তে বদলে দিতে পারে। তা সত্ত্বেও স্পেনের সাম্প্রতিক এ দুটি পেনাল্টি শুটআউটের অভিজ্ঞতা থেকে তাদের পেনাল্টি বিশেষজ্ঞদের চিনে নেয়া অসম্ভব নয়, যা বিশ্বকাপের মতো আসরের ফাইনালে ১২ গজ দূর থেকে ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে এক মূল্যবান রেফারেন্স হিসেবে কাজ করবে।