অভিমানের মাঠে বৃত্তপূরণের ফাইনাল

এক দশক আগে, নিউইয়র্কের মেটলাইফ স্টেডিয়াম জেনেছিল, এক অতিমানবের ভেঙে পড়া ঠিক কেমন হয়।

২০১৬ সালের সেই অভিশপ্ত রাতে, নীল-সাদা জার্সির বুকপকেটে জমে থাকা এক মহাসমুদ্র অভিমান উছলে পড়েছিল এ মাঠের কোনায় কোনায়। পরপর তিন বছরে তিনটি ফাইনাল হার—প্রথমে ২০১৪ সালের মারাকানার সেই বিষাদসিন্ধু, যেখানে ট্রফিটার পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় সোনালি স্বপ্নটা কেবল ছুঁয়েও ছোঁয়া গেল না। তারপর ২০১৫ আর ২০১৬ সালে চিলির কাছে টাইব্রেকারে টানা দুটি কোপা আমেরিকার নির্মম প্রত্যাখ্যান। সব মিলিয়ে চারটি ফাইনাল হারের এক অলঙ্ঘ্য নিয়তি যেন আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছিল তাকে। সেদিন টাইব্রেকারে লিওনেল মেসির নেয়া শটটি যখন মেঘের দেশে হারিয়ে গেল, হাঁটু গেড়ে বসেছিলেন মেটলাইফের সবুজ ঘাসে। যার চোখের জলে লেখা হয়েছিল আধুনিক ফুটবলের সবচেয়ে করুণ ট্র্যাজেডি। যে মাঠ তাকে দিয়েছিল রিক্ত প্রস্থান, আজ এক দশক পর সময় তাকে ফিরিয়ে এনেছে ঠিক সেই চেনা বৃত্তের মোহনায়।

মেটলাইফের সেই ফাইনালে হারের পর ড্রেসিংরুমের করিডোরে দাঁড়িয়ে মেসি বলে উঠেছিলেন, ‘আমার জন্য আর জাতীয় দল নয়, আমি অনেক চেষ্টা করেছি, কিন্তু এটা আমার জন্য নয়।’ আজ সেই মাঠেই আবার নামবেন মেসি। অবশ্য বিশ্বকাপের মঞ্চে মাঠটির নাম এখন ‘নিউইয়র্ক-নিউ জার্সি স্টেডিয়াম’। এবার স্পেনের বিপক্ষে বিশ্বকাপ ফাইনালে। দশ বছরের ব্যবধানে একই মানুষ, একই আকাশ, একই স্টেডিয়াম; কিন্তু গল্পটি আর আগের মতো নেই। তখন তিনি ছিলেন এমন এক রাজা, যার মাথায় ক্লাব ফুটবলের সমস্ত মুকুট, অথচ দেশের জার্সিতে কেবল পরাজয়ের গ্লানি। কিন্তু এখন তিনি বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন, দুইবারের কোপা আমেরিকা ও ফিনালিসিমাজয়ী এক অধিনায়ক। তখন মেটলাইফ ছিল তার অভিমানের মাঠ। এবার সেটিই হতে পারে বৃত্তপূরণের মঞ্চ।

তখন বার্সেলোনার হয়ে তিনি পাঁচটি ব্যালন ডি’অর জিতেছেন, চারটি চ্যাম্পিয়নস লিগ ও আটটি লা লিগা তার নামের পাশে। কিন্তু আর্জেন্টিনার হয়ে সেই সাফল্য পুনরাবৃত্তি করতে না পারায় তাকে প্রতিনিয়ত কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হতো। বলা হতো, তিনি দেশের চেয়ে ক্লাবকে বেশি ভালোবাসেন। বলা হতো, জাতীয় দলে তিনি বার্সেলোনার মেসি নন। এমনকি তার বন্ধুদের নিয়ে তথাকথিত ‘মেসির ক্লাব’ বানানোর অভিযোগও ছিল।

কিন্তু ফুটবল, জীবনের মতোই, কখনো কখনো দ্বিতীয় সুযোগ দেয়। কয়েক সপ্তাহের নীরবতার পর মেসি ফিরে আসেন। সেপ্টেম্বরের এক সন্ধ্যায়, মেন্দোসার মালভিনাস আর্হেন্তিনাস স্টেডিয়ামে, রুপালি চুলে সজ্জিত মেসি উরুগুয়ের বিপক্ষে একমাত্র গোলটি করে আর্জেন্টিনাকে জিতিয়ে দেন। সেই প্রত্যাবর্তনই ছিল ভবিষ্যতের ভিত্তি। এর পরের বছরগুলো কেবলই ইতিহাস।

লিওনেল স্কালোনির ডানার নিচে একদল তরুণ তুর্কি। যে একা লড়াইয়ের বোঝা তাকে এতদিন পিষে ফেলেছিল, সেই বোঝা ভাগ করে নেয়ার জন্য পাশে এসে দাঁড়াল নতুন পরিবার। ২০২১ সালের মারাকানায় ব্রাজিলের বিপক্ষে কোপা আমেরিকা জয় দিয়ে বৃত্তপূরণের যাত্রা শুরু। এরপর ২০২২ সালের ফিনালিসিমা পার হয়ে কাতারের লুসাইল স্টেডিয়ামে গিয়ে এক পূর্ণতা পেল। কাতার বিশ্বকাপের সেই ফাইনাল ছিল ফুটবল ঈশ্বরের নিজের হাতে লেখা এক অমর কাব্য, যেখানে সব বাধা চূর্ণ করে ট্রফিটা উঁচিয়ে ধরলেন লিওনেল মেসি। এর মাঝে আরো একটি কোপা আমেরিকা এসে জমা হলো তার মুকুটে। একে একে সব জয়, সব না-পাওয়া যেন এক জাদুকরী ছোঁয়ায় পরম প্রাপ্তিতে রূপ নিল।

আজ দশ বছর পর, ২০২৬ সালের এ জুলাইয়ের তপ্ত বিকালে সময় যেন আবার একটা চাকা ঘুরে ঠিক আগের জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে। কাকতালীয়ভাবে, সেই মেটলাইফ স্টেডিয়ামেই আজ বিশ্বকাপের ফাইনাল, মুখোমুখি আর্জেন্টিনা আর স্পেন। ৩৯ বছর বয়সী এ মহানায়ক যখন আজ বুট জোড়া পরে টানেল দিয়ে মাঠে ঢোকার অপেক্ষায়, তখন মাঠের বাতাসও যেন তার ফেলে আসা দীর্ঘশ্বাসের কথা মনে করিয়ে দেবে। যে মাঠে তিনি একদিন নিঃস্ব হয়ে, কেঁদে কেঁদে বিদায় নিয়েছিলেন, সেই মাঠেই তিনি পা রাখছেন বিশ্বজয়ী সম্রাট হিসেবে। তার কপালে এখন আর কোনো বলিরেখা নেই, চোখে নেই কোনো সংশয়ের ছায়া। এখন তিনি মুক্ত, আনন্দিত এবং পরিপূর্ণ।

যে মেটলাইফ স্টেডিয়াম তার অশ্রুবিন্দু লুফে নিয়েছিল, আজ হয়তো অবধারিতভাবেই মহাসমাপ্তির খসড়া লিখছে। এ মঞ্চে জয় কিংবা পরাজয় কোনোটারই আর সাধ্য নেই তার মহিমাকে নতুন করে পরিমাপ করার। ক্লাব থেকে জাতীয় দল, ফুটবলীয় ঈশ্বরের সমস্ত সিংহাসন তো তিনি বহু আগেই আরোহণ করেছেন। তবু বাতাস ভারী করে যে বিদায়ের সুর বাজছে, তা ট্রফির চেয়েও পরম আবর্তের। যে মাটি একদিন তাকে দিয়েছিল কান্নাভেজা এক রিক্ত প্রস্থান, আজ সেই মাটিতেই জীবনের শেষ বিশ্বমঞ্চের ফাইনাল। হেরে গেলে তিনি সম্রাট, জিতে গেলেও তিনি অধীশ্বর। কিন্তু নাটকের শেষ দৃশ্যে দাঁড়িয়ে জাদুকর নিশ্চয়ই চাইবেন না তার ফেলে আসা দীর্ঘশ্বাসের ঋণ এভাবে বাকি রাখতে। বিষাদের চাদর মুড়ে আজ যখন তিনি শেষবারের মতো বুটজোড়া বাঁধবেন, তখন কোটি চোখের জল আর প্রার্থনার একটাই আকুতি থাকবে যেখান থেকে শুরু হয়েছিল এক বুক অভিমানের মহাকাব্য, ঠিক সেখানেই আরেকটি বিশ্বকাপ ছুঁয়ে যেন পূর্ণ হয় নিয়তির সেই চেনা বৃত্ত, আর ট্রফির আলোয় ধুয়েমুছে যায় এক দশকের পুঞ্জীভূত সবটুকু নীল বেদনা।

আরও