দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে প্রথম জয়ের খোঁজে টাইগাররা

ওয়ানডেতে ২৫ বারের মোকাবেলায় ছয়টি জয় পেলেও টেস্ট কিংবা টি-টোয়েন্টিতে এখনো দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারাতে পারেনি বাংলাদেশ।

ওয়ানডেতে ২৫ বারের মোকাবেলায় ছয়টি জয় পেলেও টেস্ট কিংবা টি-টোয়েন্টিতে এখনো দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারাতে পারেনি বাংলাদেশ। ১৪ টেস্টের মুখোমুখিতে ১২টিই হেরেছে তারা। এর মধ্যে ড্র করেছে দুটি টেস্ট। এছাড়া নয়টি টি-টোয়েন্টি ম্যাচের সবগুলোতেই জুটেছে হার। টেস্টে বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত দুটি দেশকে হারাতে পারেনি—ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকা। সম্প্রতি ভারত সফরে ২-০-তে হেরেছে বাংলাদেশ। এবার ঘরের মাঠে দক্ষিণ আফ্রিকাকে কি হারাতে পারবে নাজমুল হোসেন শান্তর দল? ১৫তম লড়াইয়ে কি ছিঁড়বে টাইগারদের ভাগ্যের শিঁকে?

দুই দল অষ্টমবারের মতো টেস্ট সিরিজে মুখোমুখি হচ্ছে। আগামীকাল মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় স্টেডিয়ামে শুরু হবে দুই টেস্টের সিরিজের প্রথম ম্যাচ। এরপর ২৯ অক্টোবর থেকে চট্টগ্রাম জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে সিরিজের দ্বিতীয় ও শেষ ম্যাচ।

টেস্টে দক্ষিণ আফ্রিকা ও বাংলাদেশের লড়াইটা বড্ড একপেশে। ২০১৫ সালে ঢাকা ও চট্টগ্রামের দুটি টেস্ট বাদে প্রোটিয়াদের সামনে স্রেফ খড়কুটোর মতো উড়ে গেছে বাংলাদেশ দল। ২০২২ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে হারের ব্যবধান একটু কমিয়ে আনলেও ফল পাল্টানো যায়নি।

২০০২ সালের অক্টোবরে লাল বলের ফরম্যাটে প্রথম দেখা হওয়ার পর টানা চার টেস্টে ইনিংস ব্যবধানে হেরেছে বাংলাদেশ। ২০০২ সালে ইস্ট লন্ডন টেস্টে ইনিংস ও ১০৭ রানে এবং পচেফস্ট্রুম টেস্টে ইনিংস ও ১৬০ রানে পরাজিত হয় সফরকারী বাংলাদেশ। ২০০৩ সালে ফিরতি সিরিজেও ফল পাল্টায়নি। সেবার চট্টগ্রাম টেস্টে ইনিংস ও ৬০ রানে এবং ঢাকা টেস্টে ইনিংস ও ১৮ রানে হেরে যায় তখন টেস্টের নবাগত দলটি।

পাঁচ বছরের বিরতি দিয়ে ২০০৮ সালে আবার দুটি সিরিজ খেলেছে বাংলাদেশ ও দক্ষিণ আফ্রিকা। সে বছর ফেব্রুয়ারিতে মিরপুর টেস্টে ৫ উইকেটে ও চট্টগ্রাম টেস্টে ইনিংস ও ২০৫ রানে হেরেছে বাংলাদেশ। নভেম্বরে দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে আরো বিবর্ণ বাংলাদেশ। ব্লুমফন্টেইনে ইনিংস ও ১২৯ রানে এবং সেঞ্চুরিয়নে ইনিংস ও ৪৮ রানে পরাজিত মোহাম্মদ আশরাফুলের দল।

টানা আট টেস্টে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হওয়ার পর নবম ও দশম টেস্ট ড্র করতে সমর্থ হয় বাংলাদেশ। সেবার চট্টগ্রাম টেস্টে মুস্তাফিজুর রহমান ৪ উইকেট শিকার করলে দক্ষিণ আফ্রিকাকে প্রথম ইনিংসে ২৪৮ রানে অলআউট করে দেয় স্বাগতিকরা। এরপর তামিম ইকবাল, মাহমুদউল্লাহ ও লিটন দাসের ফিফটিতে ভর করে তারা তুলে নেয় ৩২৬ রান। দ্বিতীয় ইনিংসে প্রোটিয়ারা বিনা উইকেটে ৬১ রান নিয়ে তৃতীয় দিন মাঠ ছাড়ার পর চতুর্থ ও পঞ্চম দিন বৃষ্টিতে কোনো খেলা হয়নি। ঢাকায় পরের টেস্টেও অঝোর ধারায় বৃষ্টি হলে প্রথম চারদিনের খেলা পণ্ড হয়। পঞ্চম দিন ৮৮.১ ওভারে ৮ উইকেটে ২৪৬ রান সংগ্রহ করে বাংলাদেশ। ডেল স্টেইন ও জঁ-পল ডুমিনি নিয়েছিলেন তিনটি করে উইকেট। মুশফিক ম্যাচসেরা হন ৬৫ রান করে।

এরপর দক্ষিণ আফ্রিকায় টানা দুটি সিরিজ খেলেছে বাংলাদেশ। ২০১৭ সালে পচেফস্ট্রুমে ৩৩৩ রানে ও ব্লুমফন্টেইনে ইনিংস ও ২৫৪ রানে এবং ২০২২ সালে ডারবানে ২২০ রানে ও গেবেরহায় ৩৩২ রানে জয় পায় প্রোটিয়ারা। ২০২২ সালে ডারবান টেস্টে বোলাররা ভিত গড়ে দিলেও ব্যাটিং ব্যর্থতায় জেতা হয়নি। ২৭৪ রানের টার্গেটে নেমে ৫৩ রানে অলআউট মুমিনুল হকের বাহিনী। গেবেরহায় দ্বিতীয় টেস্টে ৪১৩ রানের টার্গেটে নেমে বাংলাদেশ গুটিয়ে যায় ৮০ রানে। ১০৮ রান করার পাশাপাশি ১৬ উইকেট নিয়ে সেবার প্রোটিয়াদের জয়ের নায়ক ছিলেন কেশব মহারাজ।

টেস্টে দলগত কিংবা ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সেও দক্ষিণ আফ্রিকার দাপট। দুই দল মিলিয়ে শীর্ষ ১১টি স্কোরই প্রোটিয়াদের। তালিকার ১২তম স্কোরটা বাংলাদেশের গড়া (৩২৬)। দক্ষিণ আফ্রিকার সর্বোচ্চ স্কোর ৭ উইকেটে ৫৮৩ রান। পাঁচশোর্ধ্ব তিনটি ও ছয়শোর্ধ্ব ছয়টি স্কোর রয়েছে তাদের। আবার ছোট স্কোরের দিক থেকে শীর্ষ ১০টিই বাংলাদেশের! ১১তমটি (১৭০) দক্ষিণ আফ্রিকার। ৫৩, ৮০, ৯০—একশর নিচে এ তিনটি স্কোর বাংলাদেশের।

দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে আসন্ন দুই টেস্টের সিরিজে প্রথম টেস্ট খেলে অবসর নিতে চেয়েছিলেন দেশের ইতিহাসে সেরা ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান। যদিও তার সেই চাওয়া পূরণ হচ্ছে না। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তার নামে হত্যা মামলা হওয়ায় দেশে ফেরা নিয়ে সংকট তৈরি হয়। আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন নিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ায় তিনি বহু মানুষের তোপের মুখে পড়েছেন এবং তাকে মিরপুর টেস্টে খেলতে দিতে চান না তারা। এমনকি এ ব্যাপারে বিসিবি সভাপতির কাছে বৃহস্পতিবার স্মারকলিপিও পাঠিয়েছেন তারা। এমন পরিস্থিতিতে সাকিব দুবাই থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে গেছেন।

সাকিবের জায়গায় ডাক পেয়েছেন বামহাতি স্পিনার হাসান মুরাদ। ২০২১ সালে অভিষেকের পর থেকে এখন পর্যন্ত ৩০টি ফার্স্ট ক্লাস ম্যাচে ১৩৬ উইকেট নিয়েছেন ২৩ বছর বয়সী মুরাদ। তিনি প্রথম টেস্টের একাদশে থাকবেন কিনা, সেটি নিশ্চিত নয়।

তবে সাকিবের অভাব যে শিগগিরই পূরণ করা সম্ভব নয়, সেটি জানিয়ে দিলেন বিসিবির নির্বাচক প্যানেলের চেয়ারম্যান গাজী আশরাফ হোসেন লিপু। তিনি বলেছেন, ‘আমাদের জানানো হয়েছে যে প্রথম টেস্টে সাকিব আল হাসানকে পাওয়া যাবে না। সাকিব আল হাসান ক্যারিয়ারের শেষ দিকে চলে এলেও ব্যাট-বল হাতে তার মতো দক্ষতাসম্পন্ন কাউকে আমরা খুঁজে পাইনি। অবশ্য হাসান মুরাদ ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটে ধারাবাহিকভাবে পারফর্ম করে এসেছে এবং সে আমাদের সিস্টেমের মধ্যেই ছিল। সে ঘরের মাঠে আমাদের বোলিংয়ে ভারসাম্য নিয়ে আসবে। আমাদের বিশ্বাস রয়েছে, এ পর্যায়ে পারফর্ম করার সামর্থ্য তার রয়েছে।’

এখন দেখার বিষয় বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি টেস্ট উইকেট শিকারি সাকিবের অভাব কতটা পূরণ করতে পারেন ২৩ বছর বয়সী মুরাদ। সাকিব ৭১ টেস্টে নিয়েছেন ২৪৬ উইকেট। প্রোটিয়াদের বিপক্ষে ৬ টেস্টে নিয়েছেন ১৩ উইকেট। রান করেছেন ২০৩। এছাড়া দেশের ইতিহাসে তৃতীয় সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক সাকিব। তিনি করেছেন ৪ হাজার ৬০৯ রান।

প্রথম টেস্টের স্কোয়াড: নাজমুল হোসেন শান্ত (অধিনায়ক), সাদমান ইসলাম, মাহমুদুল হাসান জয়, জাকির হাসান, মুমিনুল হক সৌরভ, মুশফিকুর রহিম, লিটন দাস (উইকেটকিপার), জাকের আলী, মেহেদী হাসান মিরাজ, তাইজুল ইসলাম, নাঈম হাসান, তাসকিন আহমেদ, হাসান মাহমুদ, নাহিদ রানা ও হাসান মুরাদ।

দক্ষিণ আফ্রিকা স্কোয়াড: তেম্বা বাভুমা (অধিনায়ক), কেশব মহারাজ, ডেন পিয়েত, ডেভিড বেডিংহ্যাম, এইডেন মার্করাম (প্রথম টেস্টের অধিনায়ক), কাগিসো রাবাদা, ম্যাথিউ ব্রিটজকে, উইয়ান মুল্ডার, ট্রিস্টান স্টাবস, নান্দ্রে বার্গার, সেনুরান মুথুস্বামী, রায়ান রিকেলটন (উইকেটকিপার), টনি ডি জর্জি, ডেন পিটারসন ও কাইল ভেরেইন (উইকেটকিপার)।

আরও