প্রিমিয়ার লিগের আর্থিক দাপট, লাগাম টানার উপায় খুঁজছে ইউরোপের জায়ান্টরা

রিয়াল মাদ্রিদ বিশ্বের সর্বোচ্চ রাজস্ব উপার্জনকারী ক্লাব (গত মৌসুমে প্রায় ১ বিলিয়ন পাউন্ড) হলেও তাদের বর্তমান ব্যয় অতীতের মতো বিলাসবহুল নয়। বরং সাতটি ইংলিশ ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদের চেয়ে বেশি খরচ করেছে। যার মধ্যে নটিংহাম ফরেস্ট এবং টটেনহ্যাম হটস্পারও রয়েছে।

ইউরোপীয় প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে ট্রান্সফার মার্কেটে অনেক বেশি আধিপত্য দেখানোয় নিজেদের পিঠ চাপড়াতেই পারে প্রিমিয়ার লিগের ক্লাবগুলো। অন্যদিকে,ইউরোপের অন্যান্য শীর্ষ লিগগুলো, বিশেষ করে স্পেন, ইতালি, জার্মানি এবং ফ্রান্স এখন প্রিমিয়ার লিগের এই ক্রমবর্ধমান আর্থিক শক্তির লাগাম টানার কৌশল আঁটছে। খবর দ্য টাইমস।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গ্রীষ্মের দলবদলে প্রিমিয়ার লিগ ক্লাবগুলো খরচ করেছে ৩ বিলিয়ন পাউন্ড— যা স্পেন, ইতালি, জার্মানি এবং ফ্রান্সের শীর্ষ লিগগুলোর সম্মিলিত খরচের চেয়েও বেশি। অন্য চারটি লিগ মিলে খরচ করেছে ২ দশমিক ৯ বিলিয়ন পাউন্ড।

এই ব্যবধান যে ক্রমাগত বাড়ছে, তার একটি প্রমাণ হলো— গত পাঁচটি গ্রীষ্মকালীন ট্রান্সফার উইন্ডোতে প্রিমিয়ার লিগের ব্যয় ছিল শীর্ষ পাঁচটি লিগের মোট ব্যয়ের ৪৬ শতাংশ। এখন তা বেড়ে ৫১ শতাংশে পৌঁছেছে। তবে ইউরোপের বড় ক্লাব এবং লিগগুলো এই ক্রমবর্ধমান বৈষম্যকে সহজে মেনে নেবে না, এমন ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

কোনো সন্দেহ নেই যে, প্রিমিয়ার লিগের বিশ্বব্যাপী আবেদন এবং আর্থিক শক্তিই রিয়াল মাদ্রিদ, জুভেন্টাস এবং বার্সেলোনার মতো ক্লাবগুলোকে ইউরোপীয় সুপার লিগ চালু করতে প্ররোচিত করেছিল। ছয়টি ইংলিশ ক্লাব সরে আসার পর সেই প্রকল্প ভেস্তে যায়। কিন্তু রিয়াল মাদ্রিদ এবং অন্যান্য ক্লাব তাদের পরবর্তী পদক্ষেপের পরিকল্পনা চালিয়ে যাচ্ছে।

ইউরোপীয় শীর্ষ একটি ক্লাবের এক কর্মকর্তা জানান, প্রিমিয়ার লিগের আধিপত্য নিয়ে তাদের অনুভূতি মিশ্র। একদিকে যেমন সেরা খেলোয়াড়রা ইংল্যান্ডে চলে যাচ্ছে, অন্যদিকে ইউরোপীয় ক্লাবগুলো সাধারণ মানের খেলোয়াড়দেরও অবিশ্বাস্য দামে বিক্রি করে ভালো অর্থ উপার্জন করতে পারছে।

সূত্রটির ধারণা, প্রিমিয়ার লিগের ক্রমবর্ধমান আধিপত্যের কারণে আরেকটি সুপার লিগের সম্ভাবনা নেই। কারণ, একদিকে যেমন ইংলিশ ক্লাবগুলোর এর প্রয়োজন নেই, তেমনি অন্যদিকে এমন একটি প্রকল্পে যোগ দেয়া তাদের জন্য ক্ষতিকরও হতে পারে। তবুও সুপার লিগের ভূত ইংলিশ ক্লাবগুলোকে মনে করিয়ে দেবে যে, আর্থিক বৈষম্য নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে।

গত মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগের চ্যাম্পিয়ন লিভারপুল দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক টেলিভিশন স্বত্ব থেকে প্রায় ১৭৫ মিলিয়ন পাউন্ড পেয়েছিল। এর বিপরীতে বায়ার্ন মিউনিখ ৭২ মিলিয়ন, নাপোলি ৬৯ মিলিয়ন এবং প্যারিস সেন্ট-জার্মেই পেয়েছে ৪২ মিলিয়ন পাউন্ড। প্রিমিয়ার লিগের প্রতি বৈশ্বিক আগ্রহ যখন বাড়ছেই, জার্মানির বুন্দেসলিগা তখন তাদের শুক্রবার রাতের ম্যাচের ইংরেজি স্বত্ব বিনামূল্যে দিচ্ছে। তাদের আশা, এতে যদি তাদের লিগের প্রতি ফুটবলপ্রেমীদের আগ্রহ কিছুটা তৈরি হয়।

মহাদেশীয় ক্লাব ও লিগগুলো আয়ের বিকল্প উৎস খোঁজার দিকে আরো বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। ফিফার নতুন ক্লাব বিশ্বকাপ চেলসি জিতলেও রিয়াল, পিএসজি এবং অন্যান্য ক্লাব সে আসর থেকে আয় করেছে ৪০ মিলিয়ন থেকে ৮০ মিলিয়ন পাউন্ড। এখন ক্লাবগুলোর পক্ষ থেকে এই টুর্নামেন্টে ইউরোপীয় দলের সংখ্যা ১২ থেকে বেশি করার জন্য চাপ আসতে পারে।

ডেলয়েট স্পোর্টস বিজনেস গ্রুপের সহকারী পরিচালক মার্কো ডি’এলিয়া বলেন, লা লিগার যুক্তরাষ্ট্রে তাদের ম্যাচ খেলার পরিকল্পনা এসব ‘ভিন্ন ভিন্ন কৌশলগুলোর একটি ভালো উদাহরণ।‘ এর মধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক সম্প্রসারণ এবং স্টেডিয়াম অবকাঠামোতে বিনিয়োগ।

রিয়াল মাদ্রিদ বিশ্বের সর্বোচ্চ রাজস্ব উপার্জনকারী ক্লাব (গত মৌসুমে প্রায় ১ বিলিয়ন পাউন্ড) হলেও তাদের বর্তমান ব্যয় অতীতের মতো বিলাসবহুল নয়। বরং সাতটি ইংলিশ ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদের চেয়ে বেশি খরচ করেছে। যার মধ্যে নটিংহাম ফরেস্ট এবং টটেনহ্যাম হটস্পারও রয়েছে। রিয়াল ও অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ ছাড়া ইউরোপের শীর্ষ দশ ব্যয়বহুল ক্লাবই ছিল ইংলিশ। বার্সেলোনা লা লিগার আর্থিক কঠোরতার কারণে বড় খরচ করতে পারছে না।

স্পেনের পত্রিকা 'এল পাইস' এর এক কলামে বলা হয়েছে, লা লিগা নতুন তারকা এবং খেলোয়াড়দের আকৃষ্ট করার ক্ষমতা হারিয়েছে। তারা উল্লেখ করেছে, এই মৌসুমে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে থাকা ভিয়ারিয়াল তাদের ট্রান্সফার রেকর্ড ভেঙেছে মাত্র ৩০ মিলিয়ন ইউরো (২৬ দশমিক ১ মিলিয়ন পাউন্ড) দিয়ে। যেখানে ইউরোপীয় প্রতিযোগিতায় খেলতে না পারা বোর্নমাউথ এবং ব্রাইটনের মতো ক্লাবও এর চেয়ে বেশি অর্থ দিতে প্রস্তুত।

লা লিগা সংশ্লিষ্টদের দাবি, ইংলিশ মডেলটি ক্রমাগত ঋণ ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যয়কে উৎসাহিত করে। তাছাড়া মডেলটি দীর্ঘস্থায়ীও নয়। তবে ১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই প্রিমিয়ার লিগের 'বুদবুদ' ফেটে যাবে— এমন ভবিষ্যদ্বাণী করা হলেও তা বরাবরই ভুল প্রমাণিত হয়েছে।

আরও