প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ, বিশৃঙ্খলা বা ‘কালো জাদু’

যেভাবে বিশ্বকাপে পৌঁছানোর আগেই ভেঙে গেল ‘সুপার ঈগলের’ ডানা

ফাইনালে শেলের একাধিক সিদ্ধান্ত ছিল ব্যাপক সমালোচিত।

বিশ্বকাপ বাছাই অভিযানে নাইজেরিয়া বদলেছে তিনজন কোচ। খেলোয়াড়দের বকেয়া পরিশোধ না হওয়ায় মরক্কোয় অনুষ্ঠিত প্লে-অফের আগেই অনুশীলন বয়কট করে তারা। ক্যাপ্টেন ট্রুস্ট-একংয়ের নেতৃত্বে এনএফএফকে বেশ কয়েকবার আলোচনায় বসতে বাধ্য করা হয়।

নাইজেরিয়ার ফুটবল ভক্তদের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ভেঙে গেছে। রাবাতে অনুষ্ঠিত কনফেডারেশন অব আফ্রিকান ফুটবলের (সিএএফ) প্লে-অফ ফাইনালে ডিআর কঙ্গোর কাছে টাইব্রেকারে হেরে ২০২৬ বিশ্বকাপের টিকেট হাতছাড়া করেছে তিনবারের আফ্রিকান চ্যাম্পিয়নরা। পরপর দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপের বাইরে পড়ে ২৩ কোটি নাইজেরীয়ের হৃদয়ে নেমে এসেছে হতাশা— ১৯৯০ সালের পর এটিই তাদের সবচেয়ে বড় ধাক্কা।

টাইব্রেকারের শেষ শটটি নেয়ার সময় কঙ্গোর অধিনায়ক শ্যানসেল এমবেম্বাকে দেখছিলেন না নাইজেরিয়ার স্ট্রাইকার আদেমোলা লুকমান—দৃষ্টিহীনতার সেই মুহূর্তই যেন ফুটবল ইতিহাসে তাদের দুঃস্বপ্নের প্রতীক হয়ে থাকবে। বল স্ট্যানলি নোয়াবালির হাত ছুঁয়ে জালে জড়ালে কঙ্গোর খেলোয়াড়রা উল্লাসে প্রদক্ষিণ করে গোটা মাঠ। আর নাইজেরিয়ানরা ভেঙে পড়েন আবেগে। ভিক্টর ওসিমহেন হতবিহ্বল, উইলিয়াম ট্রুস্ট-একং ও আকর অ্যাডামস চোখ ঢেকে ফিরে যান ড্রেসিংরুমে। কোচ এরিক শেলে তো প্রতিপক্ষের বেঞ্চের দিকে ক্ষোভে ছুটে যান। তার দাবি, প্রতিপক্ষ নাকি টাইব্রেকারের সময় ‘ভুডু’ বা কালো জাদুর চর্চা করেছিল। কঙ্গো অবশ্য এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

পরাজয়ের পর নাইজেরিয়া ফুটবল ফেডারেশন (এনএফএফ) দেশটির প্রেসিডেন্ট বোলা টিনুবু ও সমগ্র জাতির কাছে ক্ষমা চেয়ে বিবৃতি দেয়। বিবৃতিতে বলা হয়, সুপার ঈগলস শুধুই একটি দল নয়—এটি দেশের ঐক্য, আশা ও গৌরবের প্রতীক। টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ মিস করায় হতাশার গভীরতা আরো বেড়েছে।

এ ব্যর্থতার শুরু অনেক আগে। বিশ্বকাপ বাছাই অভিযানে নাইজেরিয়া বদলেছে তিনজন কোচ। খেলোয়াড়দের বকেয়া পরিশোধ না হওয়ায় মরক্কোয় অনুষ্ঠিত প্লে-অফের আগেই অনুশীলন বয়কট করে তারা। ক্যাপ্টেন ট্রুস্ট-একংয়ের নেতৃত্বে এনএফএফকে বেশ কয়েকবার আলোচনায় বসতে বাধ্য করা হয়। সরকারের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ খেলোয়াড়দের ক্ষোভ আরো বাড়িয়ে দেয়। আফকন–২০২৩ শেষে প্রেসিডেন্টের প্রতিশ্রুত বাড়ি ও জমির বরাদ্দ আজও বাস্তবায়িত হয়নি। কারণ এই কাজে দায়িত্বপ্রাপ্ত দপ্তরই যে বিলুপ্ত হয়ে গেছে!

নাইজেরিয়া কোচ এরিক শেলে কঙ্গোর বিরুদ্ধে টাইব্রেকারের সময় কালো জাদু চর্চার অভিযোগ এনেছেন। ছবি- রয়টার্স

এদিকে কোচিং সেটআপ নিয়েও ধারাবাহিক অস্থিরতা ছিল নাইজেরিয়া ফুটবলে। আফকন–পরবর্তী সময়ে ফিনিদি জর্জের অধীনে খারাপ ফলাফল, এরপর তার সঙ্গে ওসিমহেনের প্রকাশ্য বিরোধ—সব মিলিয়ে এনএফএফ পড়ে জটিল অবস্থায়। পরবর্তীতে জার্মান কোচ ব্রুনো লাবাদিয়ার সঙ্গে চুক্তি চূড়ান্ত হলেও ট্যাক্স জটিলতার কারণে তিনি দায়িত্ব নেননি। শেষে দায়িত্ব পড়ে অগাস্টিন এগুয়াভোনের ওপর। পরে ফেব্রুয়ারিতে নিয়োগ পান মালির সাবেক কোচ এরিক শেলে।

তার অধীন নাইজেরিয়া কিছুটা স্থিতি পেলেও ক্লান্তিকর যাত্রা ও অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তাদের পিছু ছাড়েনি। লিবিয়ায় এক ম্যাচের আগে দলটি ১২ ঘণ্টা বিমানবন্দরে আটকে ছিল খাদ্য–পানি কোনোকিছু ছাড়াই। পরে কনফেডারেশন তদন্ত করে নাইজেরিয়ার পক্ষে জয় ঘোষণা করলেও দলের ওপর শারীরিক ও মানসিক প্রভাব ছিল গভীর।

ফাইনালে শেলের একাধিক সিদ্ধান্ত ছিল ব্যাপক সমালোচিত। ভিক্টর ওসিমহেন আহত হয়ে বেরিয়ে যাওয়ার পরই শেলে লুকমানকেও তুলে নেন। ফলে বাড়তি সময় ও টাইব্রেকারের পুরোটাই তারা খেলেছেন আক্রমণভাগের সেরা দুই খেলোয়াড় ছাড়া। অ্যালেক্স আয়োবি ও ক্যালভিন বাসেকে সরানোর সিদ্ধান্তেও দল হারায় বল নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা। সবচেয়ে বিস্ময়ের ছিল—গত আফকনে তিনটি সফল পেনালটি নেয়া ট্রুস্ট-একংকে বাদ রেখে ডিফেন্ডার বাসেকে প্রথম শট নিতে পাঠানো।

পরাজয়ের পর থেকেই শুরু হয়েছে আত্মসমালোচনা। কোচ থেকে শুরু করে ফুটবল প্রশাসন—সবাইকে নিয়েই উঠছে প্রশ্ন। পরবর্তী আফ্রিকান কাপ অব নেশন্স শুরুর বাকি মাত্র ৩৩ দিন। এই দলে প্রতিভা কম নয়, কিন্তু তাদের সেরা সময় দ্রুতই ফুরিয়ে আসছে। লুকমান, ওসিমহেন, আয়োবি, বাসে—২০৩০ বিশ্বকাপের আগেই তারা সবাই পৌঁছে যাবেন ত্রিশের ঘরে।

নাইজেরিয়ার স্বপ্ন শেষ হয়েছে টাইব্রেকারের এক শটে, কিন্তু প্রকৃত কারণ লুকিয়ে আছে দীর্ঘদিনের বিশৃঙ্খলা, অপেশাদার প্রশাসন ও অস্থিরতার মধ্যে। নাইজেরিয়ার এ প্রজন্মকে ধরা হয় 'সোনালী প্রজন্ম' হিসেবে। তবে ভেঙে যাওয়া প্রতিশ্রুতি, অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা এবং বোর্ডের অব্যবস্থাপনার বেড়াজাল পেরিয়ে বিশ্বকাপে পৌঁছানোর আগেই ভেঙে গেল ‘সুপার ঈগলের’ ডান।

আরও