আইচি-নাগোয়া এশিয়ান গেমস শেষ হচ্ছে আজ। বাংলাদেশ সময় বেলা ৩টায় শুরু হওয়া সমাপনী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে পর্দা নামবে ‘এশিয়ার অলিম্পিক’খ্যাত এ ক্রীড়াযজ্ঞের। ২০তম এশিয়াডে যথারীতি শ্রেষ্ঠত্ব দেখিয়েছে চীন। এ গেমসে ৪৩টি ক্রীড়ার ৭১টি ডিসিপ্লিনে ৪৬৯টি স্বর্ণপদকের জন্য লড়াই করেছেন এশিয়ার ৪৬টি জাতির ১০ হাজারেরও বেশি অ্যাথলেট। এর মধ্যে গতকাল রাত ৮টা পর্যন্ত চীন একাই জিতে নেয় ১৬৯টি স্বর্ণসহ মোট ৩৪১টি পদক। অ্যাথলেট ও কর্মকর্তা মিলিয়ে মোট ২৬০ জনের বিশাল কন্টিনজেন্ট নিয়ে জাপানে যাওয়া বাংলাদেশের অর্জন মাত্র একটি ব্রোঞ্জ পদক!
২০২২ সালে চীনের হাংঝুতে আগের এশিয়ান গেমসে ক্রিকেট থেকে দুটি ব্রোঞ্জ পদক জিতেছিল বাংলাদেশ। এবার পুরুষ ও নারী উভয় ক্রিকেটেই ফ্লপ করেছে বাংলাদেশ। ফলে জাপান থেকে শূন্য হাতে ফেরার উপক্রম হয়েছিল। যদিও উশুর কল্যাণে একটি পদক পেয়েছে বাংলাদেশ।
গতকাল নিশিনে ব্রোঞ্জ ম্যাচে শ্রীলংকার কাছে ৬৩ রানে হেরেছে লিটন কুমার দাসের দল। আগে ব্যাট করতে নেমে ৯ উইকেটে ১৬৫ রান তোলে সিংহলিজরা। জবাব দিতে নেমে লিটনরা ১৭.৩ ওভারে ১০২ রানে অলআউট।
অথচ শ্রীলংকার দলটি একেবারেই নতুন মুখে গড়া। দলটিতে পরিচিত ও অভিজ্ঞ খেলোয়াড় বলতে ছিলেন কেবল নুয়ান তুষারা। বিপরীতে বাংলাদেশ দল গড়ে সাইফ হাসান, তানজিদ হাসান, পারভেজ হোসেন ইমন, লিটন দাস, তাওহীদ হৃদয়, রিশাদ হোসেন, শেখ মেহেদী হাসান, নাসুম আহমেদ ও মুস্তাফিজুর রহমানের মতো অভিজ্ঞদের নিয়ে। এশিয়াডের ক্রিকেট হলেও মূল দল নিয়েই খেলতে যায় বাংলাদেশ। অথচ পূর্ণশক্তির দলটিকে হেসেখেলে হারাল শ্রীলংকার ‘বি’ টিম।
শেখ মেহেদী হাসান ১২ রানের মধ্যেই শ্রীলংকার দুই ওপেনারকে ফেরান। পরে আরেক ধাক্কায় ২১ রানের মধ্যে নেই সিংহলিজদের ৪ উইকেট। সেখান থেকে দুর্দান্ত লড়াইয়ে তারা ১৬৫ রানের লড়াকু পুঁজি গড়ে নেয়। ৩২ বলে ৭ বাউন্ডারি ও ৫ ছক্কায় ৬৫ রানের ঝড়ো ইনিংস খেলে শ্রীলংকাকে ভালো সংগ্রহ এনে দেন থারিন্ডু রত্নায়েকে। এছাড়া সাহান আরাচ্চিগে ৩৭ বলে ৩৩ রান করেন। মুস্তাফিজ, সাইফ ও মেহেদী উভয়ই দুটি করে উইকেট নেন। যদিও বেশ ব্যয়বহুল ছিলেন মুস্তাফিজ। তিনি চার ওভারে খরচ করেন ৪৩ রান।
১৬৬ রান তাড়া করতে নেমে শূন্য রানে বিদায় নেয় বাংলাদেশের টপ অর্ডারের তিন ব্যাটার—সাইফ, তানজিদ ও লিটন। তাতে একটি পর্যায়ে স্কোর দাঁড়ায় ৪/৩। এ ধকল আর কাটিয়ে উঠতে পারেনি বাংলাদেশ। মিডল অর্ডারে পারভেজ (২০), তাওহীদ (১১) ও ইয়াসির আলী (২১) এবং শেষ দিকে নাসুম (২৬) ও রিশাদ (১০) চেষ্টা করলেও তাতে লাভ হয়নি, বিপর্যস্ত তরীকে আর টেনে তোলা যায়নি। তুষারা, থারিন্ডু, বিজয়কান্ত ও ওয়ানুজা সাহান দুটি করে উইকেট শিকার করেন।
২০১০ সালে গুয়াংজুতে এশিয়ান গেমস ক্রিকেটের প্রথম আসরে স্বর্ণপদক জিতেছে বাংলাদেশের ছেলেরা। এরপর সর্বশেষ দুটি আসরে (২০১৪ ও ২০২৩) ছেলেদের ক্রিকেটে ব্রোঞ্জ জিতেছে টাইগাররা। এবার তারা দেশে আসছে খালি হাতে।
হকিতেও পদকের আশা সুদূরপরাহত। বাংলাদেশের ছেলেরা সপ্তম ও মেয়েরা নবম হয়েছে। শুক্রবার নবম স্থান নির্ধারণী ম্যাচে নির্ধারিত সময়ের খেলা ১-১ গোলে সমতায় শেষ হওয়ার পর পেনাল্টি শুটআউটে সিঙ্গাপুরকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়ে দেয় বাংলাদেশের মেয়েরা। তারা পুল পর্বে পাঁচ ম্যাচ খেলে চারটিতেই হেরেছে, ড্র করেছে একটি ম্যাচ। লাল-সবুজ জার্সিধারীরা হেরেছে চীন, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও চাইনিজ তাইপের কাছে। তারা ড্র করে কাজাখস্তানের মেয়েদের সঙ্গে।
এশিয়ান গেমসে ছেলেদের হকিতে সপ্তম হয়েছে বাংলাদেশ। গতকাল সপ্তম স্থান নির্ধারণী ম্যাচে থাইল্যান্ডকে ৩-০ গোলে হারিয়ে দেয় পিটার গেরহার্ডের দল। গিফু প্রিফেকচারাল গ্রিন স্টেডিয়ামে ম্যাচের শুরুতেই ফিল্ড গোলে এগিয়ে যায় বাংলাদেশ। তৃতীয় মিনিটে দলকে উল্লাসে মাতান রোমান সরকার। প্রথম কোয়ার্টারেই পাওয়া এ গোলের পর আরো আক্রমণাত্মক খেলে পিটার গেরহার্ডের দল। দ্বিতীয় কোয়ার্টারে ২৭তম মিনিটে পেনাল্টি কর্নার থেকে আমিরুল ইসলাম জাল খুঁজে নেন (২-০)। শেষ কোয়ার্টারে ফের গোলের উল্লাসে মাতে লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। ৫৩তম মিনিটে পেনাল্টি স্ট্রোক থেকে আশরাফুল ইসলাম লক্ষ্যভেদ করেন। থাইল্যান্ড গোলের নিশানা ভেদ করতে পারেনি বলে ৩-০ গোলের জয় নিয়েই মাঠ ছাড়েন আমিরুল-জিমিরা।
গ্রুপ পর্বে ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের কাছে হারলেও শ্রীলংকা ও ইন্দোনেশিয়াকে হারিয়ে দেয় বাংলাদেশ দল। লাল-সবুজ জার্সিধারীরা পাঁচ ম্যাচে ৬ পয়েন্ট নিয়ে চতুর্থ হয়ে পা রাখে স্থান নির্ধারণী নকআউটে। চীনের সঙ্গে নকআউটের লড়াইয়ে ৭-১ গোলের বড় ব্যবধানে হেরেছেন জিমিরা। ওই হারে তাদের অংশ নিতে হয় সপ্তম স্থান নির্ধারণী ম্যাচে।
ফুটবলেও হতাশা। ছেলেদের ফুটবলে এবার খেলার সুযোগ পায়নি বাংলাদেশ। মেয়েদের ফুটবলে ১২টি দল অংশ নেয়, যার অন্যতম ছিল বাংলাদেশ। যদিও ঋতুপর্ণা চাকমা, মারিয়া মান্দারা এবার যারপরনাই হতাশ করেন দেশকে। উত্তর কোরিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও মিয়ানমারের গ্রুপে পড়া পিটার বাটলারের দল তলানিতে থেকে শেষ করে, কোয়ার্টার ফাইনালে উঠতে ব্যর্থ হয়। উত্তর কোরিয়ার কাছে ১০-০ ও দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে ৬-০ গোলে হারের পর শেষ ম্যাচে মিয়ানমারের সঙ্গে গোলশূন্য ড্র করে মেয়েরা। মেয়েদের ফুটবলে জাপান স্বর্ণ, উত্তর কোরিয়া রৌপ্য ও দক্ষিণ কোরিয়া ব্রোঞ্জ পদক জিতেছে।
পদকের হাতছানি ছিল কাবাডিতে। যদিও পদক ধরা দেয়নি। মেয়েদের কাবাডিতে সেমিফাইনালে উঠতে ব্যর্থ হওয়ায় পদক পায়নি বাংলাদেশ। ৮ দলের ইভেন্টে ‘এ’ গ্রুপে ভারত, ইরান ও জাপানের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন শ্রাবণী দত্তরা। ভারত ও ইরানের কাছে টানা হেরে যাওয়ায় শেষ ম্যাচে জাপানকে হারিয়েও লাভ হয়নি। ভারত ও ইরান উঠে যায় সেমিফাইনালে। পরিশেষে ফাইনালে ইরানকে হারিয়ে স্বর্ণ জিতে নেয় ভারত। ছেলেদের ইভেন্টে পদক জয়ের দারুণ সম্ভাবনা ছিল। দক্ষিণ কোরিয়া ও চাইনিজ তাইপেকে হারানোর পর জাপানকে হারালেই সেমির টিকিটে পদক নিশ্চিত হতো। যদিও অপেক্ষাকৃত দুর্বল জাপানের কাছে হেরেই বসে লাল-সবুজ জার্সিধারীরা। ছেলেদের কাবাডির ফাইনালেও ইরানকে হারিয়ে স্বর্ণ জিতে নেয় ভারত।
এছাড়া আরচারি, সুইমিং ও অ্যাথলেটিকসেও শুধুই হতাশা উপহার দিয়েছেন বাংলাদেশের অ্যাথলেটরা।
বাংলাদেশের জন্য চরম এক ব্যর্থ আসরে যথারীতি উজ্জ্বল চীনসহ অন্যরা। গত আসরে ২০১টি স্বর্ণসহ মোট ৩৮৩টি পদক জিতেছিল চীন। ৫২টি স্বর্ণসহ ১৮৮টি পদক জিতে দ্বিতীয় স্থানে ছিল জাপান। এবার জাপানের পদক বেড়েছে, কিছুটা কমেছে চীনের।