রেকর্ডে উজ্জ্বল রোনালদোর নীরব বিদায়

পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশনের সঙ্গে সাম্প্রতিক এক অনাকাঙ্ক্ষিত বিতর্কের পর গত বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন রোনালদো।

পর্তুগালের কিংবদন্তি ফরওয়ার্ড ও অধিনায়ক ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ২৩ বছরের আন্তর্জাতিক ফুটবল ক্যারিয়ারের ইতি টেনেছেন সম্প্রতি। ৪১ বছর বয়সী এ মহাতারকার আকস্মিক অবসরের সিদ্ধান্তের পেছনে পর্তুগাল কোচ জর্জ জেসুসকে দায়ী করছেন অনেকেই কিংবা পরোক্ষভাবে রোনালদো নিজেও। যদিও রোনালদোর অবসরের পেছনে নিজের কোনো দায় দেখছেন না পর্তুগাল জাতীয় দলের জেসুস। শুক্রবার এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি স্পষ্ট জানান, রোনালদোর বিদায়ের পেছনে তিনি কোনোভাবেই নিজেকে দোষী মনে করেন না এবং অধিনায়কের এমন সিদ্ধান্ত তার কাছে সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ছিল।

পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশনের সঙ্গে সাম্প্রতিক এক অনাকাঙ্ক্ষিত বিতর্কের পর গত বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন রোনালদো। পুরুষদের আন্তর্জাতিক ফুটবলে সর্বোচ্চ ২৩৪টি ম্যাচ খেলে এবং রেকর্ড ১৪৬টি গোল করে নিজের পর্তুগাল ক্যারিয়ারের ইতি টানলেন সাবেক রিয়াল মাদ্রিদ ও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড তারকা।

পর্তুগাল জাতীয় দলের ক্যাম্প ছেড়ে চলে যাওয়ার কারণে এক মাসেরও কম সময় আগে পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশন রোনালদোকে ৩০ দিনের জন্য নিষিদ্ধ করে, সঙ্গে জরিমানা করে ২৫৫ ইউরো। ঘটনার কারণ জানতে ফিরে যেতে হবে একটু পেছনে। গত ১ অক্টোবর নেশনস লিগে ডেনমার্কের বিপক্ষে ম্যাচের ঠিক আগে কোচ জর্জ জেসুসের সঙ্গে মতবিরোধের জেরে ক্যাম্প ছাড়েন রোনালদো।

নেশনস লিগে ডেনমার্ক ও ওয়েলসের বিপক্ষে আসন্ন ম্যাচের দল ঘোষণার পর শুক্রবার সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন রোনালদো সমর্থকদের তোপের মুখে থাকা জেসুস। রোনালদোর চলে যাওয়ার বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘না, আমি হয়তো কিছুটা তাড়াহুড়ো করে ফেলেছিলাম, কিন্তু এটা আমার কারণে হয়নি। নিয়মিত ডাক পাওয়া বা না পাওয়া নিয়ে বিষয়টি তার মাথায় আগে থেকেই কাজ করছিল। আমরা এ বিষয়ে কয়েকবার কথাও বলেছি। তবে তার চলে যাওয়ার পেছনে আমি কোনো অপরাধবোধে ভুগছি না। আমি তার সিদ্ধান্তকে সম্মান জানাই।’

বর্তমানে সৌদি আরবের ক্লাব আল নাসরে খেলেন রোনালদো। গত ২৪ সেপ্টেম্বর লিসবনে নেশনস লিগে ওয়েলসের বিপক্ষে ১-০ গোলে জেতা ম্যাচটিতে পর্তুগালের হয়ে শেষবার মাঠে নামেন রোনালদো। এরপর ২৮ সেপ্টেম্বর নরওয়ের বিপক্ষে ২-১ গোলে জেতা ম্যাচটিতে ১৮ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো পর্তুগাল দলের হয়ে সাইড বেঞ্চে বসে থাকতে হয় পাঁচবারের ব্যালন ডি’অরজয়ীকে। ম্যাচে তাকে বদলি হিসেবেও নামাননি জেসুস। কোচের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে ডেনমার্ক ম্যাচের আগে তিনি ক্যাম্প ছেড়ে চলে যান।

রোনালদো অবশ্য ক্যাম্প ছেড়ে যাওয়ার পর সতীর্থদের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন এবং জাতীয় দলের হয়ে খেলা চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। যদিও তিনি হেড কোচ জেসুসের সঙ্গে সরাসরি কোনো কথা বলেননি বা ক্ষমা চাননি। তা সত্ত্বেও জেসুস তাকে নতুন স্কোয়াডে রাখার জন্য প্রস্তুত ছিলেন বলে জানান।

শুক্রবারের সংবাদ সম্মেলনে জেসুস বলেন, ‘আমি ভেবেছিলাম সে ফিরবে। তাকে দলে ডাকার সম্পূর্ণ ইচ্ছা আমার ছিল। তবে সে মনে করেছে এটাই চলে যাওয়ার সঠিক সময়, আর সেটিকে অবশ্যই সম্মান জানাতে হবে। পর্তুগালের জন্য সে যা করেছে, দেশের প্রতি তার যে অবদান, কিংবা তরুণ খেলোয়াড়দের কাছে সে যে একটি আদর্শ, তা আমরা কখনই ভুলতে পারি না।’

২০২৬ সালের বিশ্বকাপে পর্তুগাল ‘শেষ ১৬’ রাউন্ড থেকে বিদায় নেয়ার পর জাতীয় দলের দায়িত্ব নেন জর্জ জেসুস। এর আগে সৌদি ক্লাব আল-নাসরে জেসুসের অধীনে খেলেছেন রোনালদো এবং সেখানে তারা একসঙ্গে সৌদি প্রো লিগ শিরোপাও জেতেন। জেসুস জানান, সেপ্টেম্বরে প্রথম দল ঘোষণার আগেই রোনালদোর ভবিষ্যৎ নিয়ে তাদের কথা হয়েছিল। জেসুস তাকে পাশে থাকার অনুরোধ করেছিলেন। সাবেক শিষ্যর বিদায়ের পর তাকে ‘গ্লোবাল আইকন’ এবং পর্তুগাল ফুটবলের চিরন্তন প্রতীক হিসেবে আখ্যা দিয়ে শ্রদ্ধা জানান এ কোচ। তিনি বলেন, ‘আল নাসরে তার সঙ্গে এক বছর কাজ করার সুযোগ হয়েছিল আমার।’

পর্তুগালের জার্সিতে কীর্তিই রোনালদোকে অমর করে রাখবে। রোনালদোর অধিনায়কত্বেই পর্তুগাল ২০১৬ সালে তাদের প্রথম ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ জয় করে। এরপর ২০১৯ সালে প্রথম উয়েফা নেশনস লিগ ও ২০২৫ সালেও নেশনস লিগের ট্রফির স্বাদ পান সিআর সেভেন। যদিও দেশকে বিশ্বকাপ শিরোপা এনে দিতে পারেননি রোনালদো, যা তার ক্যারিয়ারের একমাত্র অপূর্ণতা।

২০০৩ সালে রোনালদোর অভিষেকের আগে পর্তুগাল মাত্র তিনবার বিশ্বকাপ ও সমান তিনবার ইউরোতে কোয়ালিফাই করে। অথচ তার সময়ে একবারো বিশ্বকাপ কিংবা ইউরোতে দর্শক হয়ে থাকতে হয়নি পর্তুগালকে। এ সময় দেশটি ছয়বার করে বিশ্বকাপ ও ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপে খেলেছে। এ সময় বড় আসরগুলোতে তিনিই পর্তুগালকে কাঁধে বয়ে নিয়েছেন।

আন্তর্জাতিক ফুটবলের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি গোলের মালিক হিসেবে তিনি বিদায় নিলেন। তার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী লিওনেল মেসি মাস দুয়েক আগেই অবসর নেন। আর্জেন্টিনার সাবেক অধিনায়ক রোনালদোর চেয়ে ২০ গোল কম করে অবসর নিয়েছেন। বর্তমানে যারা খেলছেন তাদের কেউই একশ গোলও করতে পারেননি। বেলজিয়ামের রোমেলু লুকাকু ৯৪ গোল, পোল্যান্ডের রবার্ট লেভাডনভস্কি ৯২ ও ইংল্যান্ডের হ্যারি কেন ৯১ গোল করেছেন জাতীয় দলের হয়ে।

রোনালদোর ২৩৪ ম্যাচও আন্তর্জাতিক ফুটবলে রেকর্ড। এত বেশি ম্যাচ আগে কেউ খেলেনি। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২০৮ ম্যাচ খেলেছেন লিওনেল মেসি। ক্রোয়েশিয়ার আইকনিক খেলোয়াড় লুকা মডরিচ (২০৬) কিংবা কাতারের হাসান আল হায়দোসকে (১৯৩) রোনালদোর রেকর্ড ভাঙতে অন্তত তিন-চার বছর খেলতে হবে।

বর্তমান পর্তুগাল দলে বহু মেধাবী খেলোয়াড় উঠে এসেছেন। যেমন ব্রুনো ফার্নান্দেজ, বার্নার্দো সিলভা, হোয়াও নেভেস, পেদ্রো নেতো, ভিতিনিয়া ও নুনো মেন্দেস পর্তুগালকে ভয়ংকর এক দলে পরিণত করেছেন। এখন হয়তোবা তাদের রোনালদোকে প্রয়োজন হবে না। রোনালদোর সময় বিশ্বকাপে অন্যতম ফেভারিট থাকত পর্তুগাল। যদিও জর্জ মেন্দেস ধরে নিয়েছেন, ‘বুড়ো রোনালদো’ আর কোনোভাবেই ‘মহান রোনালদো’ নেই।

একটি সময় তো থামতেই হয়। থেমেছেন রোনালদোও। তবে পর্তুগাল দল থেকে বিদায়টা মধুর হলো না এ কিংবদন্তি ফুটবলারের। গত ৬ অক্টোবর বুয়েন্স আয়ার্সে লাখ লাখ সমর্থকের ভালোবাসায় আর্জেন্টিনার জার্সিতে ঘরের মাঠে শেষ ম্যাচ খেলে বিদায় নেয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছেন মেসি। যদিও রোনালদোর বেলায় তেমনটি ঘটার সম্ভাবনা ক্ষীণ। পর্তুগাল ফুটবল ফেডারেশন তার জন্য বিদায়ী ম্যাচ আয়োজনের প্রস্তাব দিলেও তাতে রোনালদো ইতিবাচক সাড়া দেননি বলে জানিয়েছে দেশটির সংবাদমাধ্যম। নীরবেই বিদায় ঘটল ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফুটবলারের।

আরও